Skip to main content

Ridge Bangla

শহীদ ডা. সজীবের চলে যাবার এক বছর

ডা. সজীব, ত্রিশ বছর বয়সী এক টগবগে তরুণ চিকিৎসকের নাম। চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজের প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। আজ থেকে এক বছর আগে, ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানে প্রাণ হারান তিনি। একটি বুলেট কেড়ে নেয় তার স্বপ্ন, আশা-ভরসা, আর অসহায় করে তোলে তার পরিবারকে।

ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই রাজধানীর উত্তরার আজমপুর এলাকায়। পুলিশের গুলিতে সজীবের হৃদপিণ্ড বিদ্ধ হয়, গুলি ডান দিকের স্কাপুলারের (কাঁধের হাড়) নিচ দিয়ে বেরিয়ে যায়। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের সাহসী কর্মীরা তাকে উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু ততক্ষণে নিভে গেছে প্রাণপ্রদীপ। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ছোট ভাইকে আনতে ঢাকায় এসেছিলেন সজীব। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় অসুস্থ মায়ের কপালে শেষবারের মতো চুমু এঁকে দিয়েছিলেন। ঢাকায় ঠিকই পৌঁছেছিলেন, কিন্তু ছোট ভাই আব্দুল্লাহকে নিয়ে আর মায়ের কোলে ফেরা হয়নি তার। একটি বুলেট থামিয়ে দেয় তার জীবন।

পরিবারের বড় এবং একমাত্র কর্মক্ষম সন্তান হিসেবে ছোট ভাই-বোনের পড়াশোনা ও মায়ের চিকিৎসার খরচ সবই বহন করতেন তিনি। বাবা হালিম সরকার সরকারি চাকরিজীবী, বর্তমানে অবসরের অপেক্ষায়। সজীবের মৃত্যুর দশ দিন পর পুরনো বাসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় তার পরিবার। সজীবের উপর নির্ভরশীল পরিবারটি যেন দিন পার করছে বুকের মধ্যে পাথর চেপে।

সন্তান হারিয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছেন শহীদ জননী ঝর্ণা বেগম। সবসময় নাকে অক্সিজেন লাগানো থাকে। বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছেলের জন্য বিলাপ করতে থাকেন, মোবাইলের স্ক্রিনে ছেলের ছবির দিকে চেয়ে থাকেন, আর দোয়া করতে থাকেন আল্লাহর কাছে।

মৃত্যুর অল্প কিছু আগে ছোট বোন সুমাইয়া সরকার স্বর্ণার সঙ্গে দেখা হয়েছিল সজীবের। ১৭ জুলাই ছিল স্বর্ণার জন্মদিন। মৃত্যুর আগে চাচাতো ভাই অনিকুর রহমানকে পাঠিয়েছিলেন একটি ক্ষুদে বার্তা, “পুলিশ খুব কাছাকাছি চলে এসেছে, দোয়া কইরো।”

পরিবারের ভাষ্যমতে, সজীব সেদিন গ্রামের বাড়ি নরসিংদী থেকে ঢাকায় এসেছিলেন উত্তরার একটি মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত ছোট ভাই আব্দুল্লাহকে নিতে। সন্ধ্যা ছয়টার দিকে আজমপুর এলাকায় পৌঁছালে সেখানে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলছিল। ঠিক তখনই পুলিশ শিক্ষার্থীদের উপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। একপর্যায়ে পুলিশ ডা. সজীবকে ঘিরে ফেলে। প্রথমে তার পেটে লাথি মারা হয়। আঘাত সইতে না পেরে তিনি বসে পড়েন। এরপর খুব কাছ থেকে উপর দিক থেকে নিচে অ্যাঙ্গেলে একটি গুলি করা হয়, যা হৃদপিণ্ডে লেগে কাঁধের নিচ দিয়ে বের হয়ে যায়। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, গুলি লাগার এক মিনিটের মধ্যেই মৃত্যু হয় তার।

ডা. সজীব রাজধানীর মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে গাজীপুরের তাইরুন্নেছা মেমোরিয়াল মেডিকেল কলেজ থেকে ২০২০ সালে এমবিবিএস পাশ করেন। ডাক্তার বানাতে গিয়ে বাবা হালিম সরকার জমানো টাকা খরচ করেন, জমিও বিক্রি করেন। স্নাতক শেষে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। কিন্তু পরিবারের হাল বেশিদিন বইতে পারেননি।

তার মৃত্যুর একদিন পর, ১৯ জুলাই, মরদেহ গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার মেঝের কান্দিতে আনা হয়। সেখানেই পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।

This post was viewed: 55

আরো পড়ুন