Ridge Bangla

হামলা অব্যাহত রেখে কীভাবে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষয়ক্ষতি করছে ইরান?

জর্ডানে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন হামলায় তিন মার্কিন সেনার নিহত হওয়ার ঘটনা ওয়াশিংটনের জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি নতুন করে সংঘাত শুরুর পর এই প্রথম সরাসরি ইরানি হামলায় কোনো মার্কিন সামরিক স্থাপনায় সেনা নিহত হলেন। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, ধারাবাহিক মার্কিন বিমান হামলার পরও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে ইরান।

বিশ্লেষকদের দাবি, পেন্টাগন ইরানের সামরিক শক্তিকে যতটা দুর্বল হিসেবে তুলে ধরেছিল, বাস্তবে পরিস্থিতি ততটা নয়। ‘ডিফেন্স প্রায়োরিটিস’-এর সামরিক বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জেনিফার কাভানাঘ বলেন, ‘ইরানের সামরিক সক্ষমতা এখনো বেশ শক্তিশালী। ধারণা করা হয়েছিল তারা ভেঙে পড়বে, কিন্তু তারা প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, রাশিয়া ও চীনের গোয়েন্দা তথ্যের সহায়তায় ইরান আগের তুলনায় আরও নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারছে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মোতায়েন প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা নির্দিষ্ট ও উন্মুক্ত ঘাঁটিতে অবস্থান করায় তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের নাগালের মধ্যে রয়েছেন। কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেয়াস ক্রিয়েগ বলেন, এসব ঘাঁটির অনেক স্থাপনাই ছোট আকারের হামলা ঠেকাতে সক্ষম হলেও বড় ও নির্ভুল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের জন্য যথেষ্ট নয়। ফলে হামলায় সেনারা গুরুতর আহত হচ্ছেন।

উপলব্ধ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে এ পর্যন্ত ১৮ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১ মার্চ কুয়েত ও সৌদি আরবে ইরানি হামলায় ৭ জন এবং সর্বশেষ জর্ডানে ৩ জন নিহত হন। বাকি নিহতদের মৃত্যু সরাসরি ইরানি হামলায় হয়নি বলে মার্কিন বাহিনীর দাবি। এ ছাড়া প্রায় ৫০০ সেনা আহত হয়েছেন এবং ২২০টি সামরিক অবকাঠামো ও সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্যাট্রিয়ট ও থাডের মতো উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন করেছে। আন্দ্রেয়াস ক্রিয়েগ বলেন, ইরান এখন একই সঙ্গে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি বিভিন্ন গতিপথ ও গতিতে উড়তে সক্ষম ড্রোন ব্যবহার করছে। এর সঙ্গে নকল লক্ষ্যবস্তু যুক্ত হওয়ায় মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বিভ্রান্ত হচ্ছে।

কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক গবেষণা কেন্দ্রের মোনা ইয়াকুবিয়ান বলেন, যুদ্ধের শুরুতে তুলনায় ইরান এখন অনেক বেশি আক্রমণাত্মক কৌশল গ্রহণ করেছে।

তার মতে, সাম্প্রতিক হামলায় ক্ষয়ক্ষতি বাড়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে আরও নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত, মার্কিন প্রতিরক্ষা ও রাডার ব্যবস্থার দুর্বলতা কিংবা ব্যাপক হামলার মধ্যে কয়েকটি অত্যন্ত সফল আঘাত। তিনি বলেন, এসব কারণ একসঙ্গেও কাজ করে থাকতে পারে।

ইরানের সেনাবাহিনীর দাবি, সর্বশেষ হামলায় জর্ডানের প্রিন্স হাসান ও কিং ফয়সাল ঘাঁটিতে থাকা এফ-১৫ যুদ্ধবিমান, ড্রোন প্রস্তুতকরণ কেন্দ্র এবং হেলিকপ্টার সংরক্ষণ স্থাপনাকে লক্ষ্য করা হয়েছে। অন্যদিকে বাহরাইনের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের কয়েকটি হামলা প্রতিহত করেছে।

গত বুধবার মার্কিন সিনেটে শুনানিতে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে এ বিষয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। যুদ্ধের দ্বিতীয় সপ্তাহে ইরানের সামরিক সক্ষমতা ‘কার্যত ধ্বংস’ হয়ে গেছে বলে দেওয়া তার বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এটি ছিল একটি ‘ঐতিহাসিক সামরিক বিজয়’।

তবে তিনি স্বীকার করেন, ‘আমরা কখনোই আশা করিনি যে তারা পুরোপুরি আক্রমণ করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে। আসল প্রশ্ন হলো- যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে তারা এই বড় আকারের হামলা কত দিন ধরে রাখতে পারবে।’

মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জেসন ক্যাম্পবেলের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ইরানের প্রকৃত সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে সঠিক মূল্যায়ন দেননি। তিনি বলেন, যুদ্ধের শুরুতে ইরান তাদের অনেক উন্নত অস্ত্র ব্যবহার করেনি। এখন তারা আরও নির্ভুল ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে, যা মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে যেতে সক্ষম।

বাথ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক প্যাট্রিক বুরি বলেন, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় চ্যালেঞ্জ হলো ব্যয়ের বৈষম্য। ইরানের স্বল্প ব্যয়ে তৈরি ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক বেশি ব্যয়বহুল প্রতিরোধ ব্যবস্থা ব্যবহার করতে হচ্ছে।

আন্দ্রেয়াস ক্রিয়েগের মতে, যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিকভাবে পরাজিত করাই ইরানের লক্ষ্য নয়। বরং বারবার মার্কিন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভেদ করে ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারলেই তা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর মানবিক, সামরিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়াবে। তার ভাষায়, ইরানের মূল লক্ষ্য হলো এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতিকে আরও ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।

This post was viewed: 3

আরো পড়ুন