Skip to main content

Ridge Bangla

সোমালিয়া: আফ্রিকার সুইজারল্যান্ড কেন হয়ে উঠল দারিদ্র্যের প্রতীক?

আফ্রিকার মানচিত্রের সবচেয়ে পূর্বদিকের অংশ হর্ন অব আফ্রিকা (Horn of Africa)। এই মহাদেশের বৃহত্তম উপকূল এখানে। এই উপদ্বীপেই অবস্থিত সোমালিয়া, যার সীমান্ত পড়েছে ইথিওপিয়া, কেনিয়া আর জিবুতির সঙ্গে।

ভারত মহাসাগর আর গালফ অব এডেনের সাথে সংযুক্ত বলে হর্ন অব আফ্রিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক নৌপথ। কয়েকশো বছর ধরে এখানকার সওদাগরী জাহাজ ভ্রমণ করত দূরদূরান্তে। মধ্যপ্রাচ্য আর এশিয়ার সাথে বাণিজ্য চলত জমজমাট। মোগাদিশু ছিল এক জমকালো শহর। ধনসম্পদ, জ্ঞানচর্চা আর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। এমনকি বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগেও সোমালিয়া ছিল স্থিতিশীল এবং অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসরমান একটি দেশ। আফ্রিকার সুইজারল্যান্ড খেতাব জুটেছিল কপালে।

অথচ আজ? দারিদ্র্য, নিত্য সংঘাত আর বিধ্বস্ত এক দেশে পরিণত হয়েছে এই সোমালিয়া। এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশক ধরে চলা রাজনৈতিক গণ্ডগোল। এর ফলে ভেঙে পড়েছে অর্থনীতি, দেখা দিয়েছে সামাজিক অবক্ষয়।

ঔপনিবেশিক সোমালিয়া

উনবিংশ শতকের শেষভাগ থেকে বিংশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত ইউরোপীয়দের উপনিবেশ ছিল সোমালিয়াতে। দক্ষিণাঞ্চল ইতালি আর উত্তরদিকে যুক্তরাজ্যের নিয়ন্ত্রণে। লুটপাটেই ব্যস্ত ছিল বিদেশী শাসকেরা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছিল শূন্যের কোঠায়। শিক্ষাব্যবস্থা আর প্রশাসনও ছিল জরাজীর্ণ।

১৯৬০ সালে সোমালিয়া যখন স্বাধীন হয় তখন তাদের সামনে ছিল অনেক সুযোগ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, দেশপ্রেমিক জনগণ তাদের শক্তি। বাণিজ্যিকভাবে কৌশলগত অবস্থানের কারণে অনেকেই আন্তর্জাতিক বিনিয়োগে আগ্রহী। সুখী-সমৃদ্ধ একটি রাষ্ট্র নির্মাণের সমস্ত উপকরণই মজুদ ছিল সোমালিয়াতে। কিন্তু অবকাঠামো, শিক্ষা আর প্রশাসনিক সংস্কারে ব্যর্থতা পিছিয়ে দেয় তাদের।

ক্ষমতার পালাবদল

গণতন্ত্র বেশি দিন টিকতে পারেনি। ১৯৬৯ সালে মেজর জেনারেল সিয়াদ বার (Siad Barre) সোভিয়েত পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষমতা দখল করেন। সোমালিয়া পরিণত হয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে। মেজর জেনারেল প্রাথমিকভাবে নানা উন্নয়নমূলক প্রকল্প হাতে নেন। রাস্তাঘাট, কারখানা ইত্যাদি তৈরি হয়। শিক্ষাদীক্ষার জন্য গ্রহণ করা হয় পরিকল্পনা। কৃষি আর শিল্পে আধুনিক প্রযুক্তিও আমদানি করেন তিনি। বিদেশী বিনিয়োগ আসতে থাকে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় উন্নয়নের মহাসড়কে উঠে পড়েছে দেশ। সবকিছু খুব শান্ত, যা ছিল ঝড়ের পূর্বাভাস!

ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে

তবে ভেতরে ভেতরে দুর্বল হয়ে পড়ছিল রাষ্ট্রের কাঠামো। অর্থনীতির ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণতার বদলে বিদেশী অর্থের ওপর অতিনির্ভরতা ছিল। বার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একনায়কতন্ত্র। তিনি নিজ গোত্রের (Marehan) হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে অন্য সবাইকে বিচ্ছিন্ন করে দেন। সব বিরোধী দল নিষিদ্ধ করে দেন তিনি। পান থেকে চুন খসলেই নেমে আসতো জেল-জুলুম।

বিশাল এক জনগোষ্ঠীর মধ্যে পুঞ্জীভূত হয় ক্ষোভ, বিস্ফোরণ ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। ১৯৭৭ সালে প্রতিবেশী ইথিওপিয়ার ওগাডেন অঞ্চল দখল করতে যুদ্ধ শুরু করেন বার। সোমালি অধ্যুষিত এলাকাগুলোকে একত্র করাই ছিল তার মুখ্য উদ্দেশ্য। প্রথমদিকে ভালোই সাফল্য অর্জন করে বারের সেনারা।

কিন্তু বহুদিনের মিত্র সোভিয়েত ইউনিয়ন সমর্থন পাল্টে ইথিওপিয়ার দিকে ঝুঁকে গেলে সর্বনাশ হয়ে যায় বারের। বিপুল পরিমাণে সোভিয়েত আর কিউবান যুদ্ধাস্ত্র হাতে পেয়ে পাল্টা আক্রমণে যায় ইথিওপিয়া। যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে ধুঁকতে থাকে সোমালিয়া।

১৯৮০’র দশকে অর্থনৈতিক দুর্দশা এবং তারল্য সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে সোমালিয়া। যুদ্ধের ফলে উদ্বাস্তু বহু মানুষের চাপ সামলাতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠে যায় দেশের। স্থিতিশীলতার দোহাই দিয়ে যারা এতদিন বারকে সমর্থন করেছিলেন তারাও বুঝতে পারেন ঠিক পথে নেই দেশ। একপর্যায়ে বিদেশী ঋণ পরিশোধে অসমর্থ হয়ে পড়ে সোমালিয়া। বহু কোম্পানি কর্মচারীদের বেতন দিতেও হিমশিম খেতে থাকে। স্কুল, হাসপাতাল, আদালতের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হয়।

সামরিক জান্তার পতন

বারের বিপক্ষে সংগঠিত হয় অন্য সব গোত্র, সক্রিয় হয়ে ওঠে সোমালি ন্যাশনাল মুভমেন্টের/এসএনএম (Somali National Movement) মতো নানা সশস্ত্র গোষ্ঠী। তাদের কার্যক্রমের খবর পেয়ে দমনমূলক পথ বেছে নেন মেজর জেনারেল। তার সেনারা নির্বিচার হত্যা, লুণ্ঠন আর অগ্নিসংযোগে মেতে ওঠে। ১৯৮৮ সালে এসএনএম নির্মূলের অজুহারে বেসামরিক এলাকায় গোলাবর্ষণ করে সেনাবাহিনী, হতাহত হয় বহু সাধারণ মানুষ। এরপর বারের সাথে সংলাপের পথ বন্ধ হয়ে যায়। দেশের অধিকাংশ জনগণ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় ।

পূর্ণোদ্যমে গৃহযুদ্ধ আরম্ভ হয় সোমালিয়াতে। মোগাদিশুর দিকে দ্রুত এগিয়ে আসে বিদ্রোহীরা। জেনারেল মোহাম্মেদ ফারাহ আইদাদ (Mohamed Farah Aideed) আর জেনারেল আলি মাহদির (Ali Mahdi Moha) নেতৃত্বাধীন দল সক্ষম হয় রাজধানীতে প্রভাব বিস্তার করতে। এক পর্যায়ে বারের বিশ্বস্ত সেনারাও পক্ষ পাল্টে ভিড়ে যায় বিদ্রোহীদের দলে। ১৯৯১ সালের জানুয়ারিতে প্রচণ্ড গোলাগুলির ভেতর প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে যান মেজর জেনারেল।

ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে

সোমালিয়ার পরের কাহিনী আরো করুণ। সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ক্ষমতার ভাগ নিয়ে কাড়াকাড়িতে জড়িয়ে পড়ে। সোমালিয়া তখন ভস্মীভূত এক দেশ। সেনা আর পুলিশ বাহিনী ভেঙ্গে গেছে। ব্যাংক, আদালত, হাসপাতাল, স্কুল কার্যত বন্ধ। সরকারি সমস্ত সেবা অচল। বিভিন্ন জায়গায় চলছে উগ্রপন্থী মিলিশিয়া আর তাদের নেতাদের দৌরাত্ম্য। শুরু হয় দুর্ভিক্ষ, খরা, সংঘাত আর সীমাহীন দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র। আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপও ব্যর্থ হয় পরিস্থিতি উন্নত করতে।

সোমালিয়ার অর্থনীতি এখন ফিরে গেছে কৃষিনির্ভর যুগে। মানুষ বেঁচে আছে গবাদি পশু পালন, ছোট ব্যবসা আর প্রবাসী আয়ের ওপর। একসময়ের সুইজারল্যান্ড এখন খণ্ডবিখণ্ড কয়েকটি অংশে। সোমালিল্যান্ড স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে। পুন্টল্যান্ড আছে স্বায়ত্বশাসিত এলাকা হিসেবে। দক্ষিণাঞ্চল যখন যে মিলিশিয়া শক্তিশালী হয় তারা রাজত্ব করে। রাজধানী মোগাদিশু ভাগ হয়ে গেছে প্রতিদ্বন্দ্বী যুদ্ধবাজ নেতাদের মাঝে।

কেন এই দুর্দশা?

সোমালিয়ার বর্তমান বিপর্যয়ের কারণ অনেক। প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের অভাব, কৃষি আর বিদেশী অর্থের ওপর অতিনির্ভরতা এবং দীর্ঘদিনের একনায়কতান্ত্রিক শাসন এর অন্যতম। বারের সময় স্থিতিশীল দেখালেও বিরোধী মতের দমনপীড়ন এবং শাসন ব্যবস্থা থেকে জনগোষ্ঠীর গুরুত্বপূর্ণ একটা অংশকে দূরে রাখায় ভেতর থেকে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল সোমালিয়া। সবকিছুর অন্যতম প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে ওগাডেন যুদ্ধ।

বিদ্রোহী দলগুলোও প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। সমঝোতার বদলে হানাহানির পথ বেছে নিয়েছে তারা, পুনরাবৃত্তি করছে বারের ভুলগুলোরই। এখন অবধি কার্যকর কেন্দ্রীয় সরকার নেই সোমালিয়ায়। রাষ্ট্রযন্ত্র একেবারেই নিষ্ক্রিয়। ফলে নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচার ইত্যাদি মৌলিক চাহিদা অনুপস্থিত।

ভবিষ্যৎ

অন্ধকার সময়েও দূরে একটু হলেও দেখা যাচ্ছে আলোর রেখা। বিভিন্ন গোষ্ঠী কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছতে আলাপ করছে। কিছুটা হলেও অগ্রগতি হয়েছে আলোচনায়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করতে একমত হয়েছে সব পক্ষ, চেষ্টা করা হচ্ছে বিদেশী বিনিয়োগ আনার উপযোগী পরিবেশ তৈরির। প্রবাসী আয় বেড়েছে, টেলিযোগাযোগ এবং আর্থিক খাতের ব্যবসাও যথেষ্ট টেকসই হয়ে উঠেছে।

তবে এখনো বহু পথ বাকি। সোমালিয়াকে আবার সুইজারল্যান্ড হয়ে উঠতে গেলে শূন্য থেকে শুরু করতে হবে সব। অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি শাসনব্যবস্থা অন্যতম শর্ত। এরপর মনোযোগ দিতে হবে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিচার পদ্ধতির সংস্কারে। ঢেলে সাজাতে হবে সেনা ও পুলিশবাহিনীকে, মূলোৎপাটন করতে হবে দুর্নীতির। অর্থনীতিকে বের করে আনতে হবে কৃষিনির্ভরতা থেকে।

হর্ন অব আফ্রিকার কারণে সোমালিয়া এখনো বিদেশিদের কাছে আকর্ষণীয়। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে অনেকেই সেখানে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে। সোমালিয়া আবার উঠে দাঁড়াবে, যদি আবার একতাবদ্ধ হতে পারে তারা।

This post was viewed: 41

আরো পড়ুন