মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সংকটের প্রভাব এবার বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপরও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা। হুতিদের সাম্প্রতিক হুমকি, ইরানের কঠোর অবস্থান এবং মিসরের দামিয়েত্তা বন্দরে ড্রোন হামলার পর সুয়েজ খাল ও বাব আল-মানদেব প্রণালিকে ঘিরে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি পরিবহন ও বিমা ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
জ্বালানি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভোর্টেক্সার তথ্য অনুযায়ী, লোহিত সাগর থেকে তেল বহনকারী ট্যাংকারগুলোর সুয়েজ খালের দিকে যাত্রার প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষক জর্জ মরিস বলেন, বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদি আরবের তেল পরিবহন বন্ধের হুতি হুমকির পর এই পরিবর্তন দেখা গেছে।
অন্যদিকে কেপলারের তথ্য বলছে, বাব আল-মানদেব হয়ে এশিয়ামুখী দক্ষিণমুখী রুটে তেল পরিবহন অব্যাহত থাকলেও চলতি মাসের শুরু থেকে এর পরিমাণ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। জুনে সৌদির ইয়ানবু বন্দর থেকে রপ্তানি হওয়া তেলের ৮১ শতাংশ দক্ষিণমুখী পথে গেলেও জুলাইয়ে সেই হার কমে ৪৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হামলার ঝুঁকি এড়াতে অনেক ট্যাংকার অবস্থান শনাক্তকারী ট্র্যাকার বন্ধ রেখে চলাচল করছে। জর্জ মরিস জানান, বিশেষ করে দক্ষিণমুখী ঝুঁকিপূর্ণ রুটে এই প্রবণতা দ্রুত বাড়ছে। যদিও অনেক জাহাজ বাব আল-মানদেব প্রণালি এড়িয়ে যাচ্ছে, চীনের মালিকানাধীন কয়েকটি ট্যাংকার হুতিদের বিশেষ অনুমতি নিয়ে ওই পথ ব্যবহার করছে।
মিসরের দামিয়েত্তা বন্দরে ড্রোন হামলার পরও সুয়েজ খাল তাৎক্ষণিকভাবে সরাসরি হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করেন না এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল এনার্জির আটলান্টিক এলএনজি বিভাগের প্রধান অ্যালি ব্লেকওয়ে। তার মতে, বাজারে এখনো এমন কোনো ইঙ্গিত দেখা যায়নি, যা সুয়েজ খালের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করে। এ বিষয়ে সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষের প্রতিক্রিয়া জানতে চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার আটক করে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে কোনো জ্বালানি রপ্তানি হতে দেওয়া হবে না। একই সময়ে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের সব ধরনের জাহাজ চলাচলের ওপর অবরোধ ঘোষণা করেছে। এর আওতায় ইয়ানবু বন্দর থেকে ভূমধ্যসাগরের উদ্দেশে যাওয়া তেলবাহী জাহাজও পড়তে পারে।
হুতিরা ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে যে তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র সুয়েজ খাল অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম। যদিও দীর্ঘ দূরত্বের কারণে এসব হামলা প্রতিহত করার সুযোগ তুলনামূলক বেশি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি মূল্য নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান আর্গাসের এলএনজি মূল্য নির্ধারণ বিভাগের প্রধান মার্টিন সিনিয়র বলেন, দামিয়েত্তা বন্দরের হামলার পর সুয়েজমুখী জাহাজগুলোর জন্য যুদ্ধঝুঁকির বিমা প্রিমিয়াম বাড়তে পারে। তার মতে, এ অঞ্চলে জাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোর ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় বিমা প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত যুদ্ধঝুঁকি প্রিমিয়াম আরোপ করতে পারে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, ইরান এখনো সুয়েজ খালকে কেন্দ্র করে সরাসরি কোনো হুমকি দেয়নি।
একটি সামুদ্রিক নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, সুয়েজ খালের কাছাকাছি মিসরের ভূমধ্যসাগরীয় বন্দরগুলোয় চলাচলকারী জাহাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নতুন করে মূল্যায়ন করছে বিভিন্ন শিপিং কোম্পানি। তবে সুয়েজ খাল কর্তৃপক্ষের সাবেক বোর্ড সদস্য ওয়ায়েল কাদ্দুরের মতে, খালটি কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার আওতায় পরিচালিত হচ্ছে এবং বর্তমানে এটি সরাসরি হুমকির মুখে রয়েছে বলে মনে করার কারণ নেই।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্ববাজারে তেল পরিবহন এখন আগের তুলনায় আরও দীর্ঘ, জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে। জর্জ মরিস জানান, জুনে এশিয়ায় সমুদ্রপথে আমদানি হওয়া অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেটের প্রায় ১৫ শতাংশ এসেছে ইয়ানবু বন্দর থেকে। এই সরবরাহ দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে এশিয়ার পরিশোধনাগারগুলো বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, বাব আল-মানদেবের পরিবর্তে সুয়েজ খাল ব্যবহার করলে উত্তর-পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছাতে সময় দ্বিগুণেরও বেশি লাগে। এতে গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রায় ১ মাস অতিরিক্ত সময় লাগছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেলবাহী ট্যাংকারগুলোও সুয়েজ খাল ব্যবহারে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়ে। গভীর ড্রাফটের কারণে এসব জাহাজকে প্রথমে সুমেদ পাইপলাইনের মাধ্যমে কিছু তেল খালাস করতে হয়। পরে ভূমধ্যসাগরে পৌঁছে সেই তেল আবার জাহাজে তোলা হয়। এতে পরিবহনের সময় ও ব্যয় দুটোই বৃদ্ধি পায়।
ড্রায়াড গ্লোবালের প্রধান নির্বাহী কোরি র্যান্সলেম বলেন, সুয়েজ খাল অঞ্চলের যেকোনো স্থানে হামলা হলে যুদ্ধঝুঁকির বিমা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা মূল্যায়ন বদলে যাবে।
অন্যদিকে কেপলারের প্রধান পণ্য পরিবহন বিশ্লেষক ম্যাথিউ রাইটের মতে, সুয়েজ খালের কার্যক্রমে কোনো বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্ববাজারে তেলের দামে পড়বে। দীর্ঘ সমুদ্রপথ, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহে বিলম্বের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ দ্রুতই ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে।