Skip to main content

Ridge Bangla

সুন্দরবনে মধু আহরণ: ​মধুর আড়ালে লুকিয়ে থাকা রক্তঝরা উপাখ্যান

সুন্দরবন; নামের মাঝেই যেন চিরকাল লুকিয়ে আছে এক বন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর আদিম রহস্যের হাতছানি। পৃথিবীর বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বন তার অসামান্য জীববৈচিত্র্যের জন্যই শুধু বিশ্ববিখ্যাত নয়, বরং এখানকার খাঁটি মধুর খ্যাতিও রয়েছে বেশ। সুন্দরবনের গভীরে ফোটা খলসি, গরান, পশুর, বাইন বা কেওড়া ফুলের প্রাকৃতিক নির্যাস থেকে তৈরি হওয়া এই মধু স্বাদে, গন্ধে ও ভেষজ গুণে অনন্য। কিন্তু এই অমৃতসম সুমিষ্ট মধু আমাদের শহরের আরামদায়ক ডাইনিং টেবিল পর্যন্ত পৌঁছানোর পেছনের গল্পটা মোটেও মধুর বা সহজ নয়। বরং তা ঘাম, রক্ত, সীমাহীন মৃত্যুভয় আর পদে পদে ওঁত পেতে থাকা বিভীষিকাময় বিপদের এক জীবন্ত উপাখ্যান। সুন্দরবনে মধু আহরণের এই রোমাঞ্চকর অভিযান ঘিরেই যুগ যুগ ধরে আবর্তিত হয়ে আসছে উপকূলীয় অঞ্চলের শত শত বনজীবী মানুষের সংগ্রামী জীবন।

​মৌয়ালদের যাত্রা: অনিশ্চিত জীবনের রোমাঞ্চকর প্রস্তুতি

সুন্দরবনের গহিন ও দুর্গম অরণ্য থেকে যারা নিজেদের অমূল্য জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে মধু সংগ্রহ করে আনেন, স্থানীয় ভাষায় তাদের বলা হয় ‘মৌয়াল’। সাধারণত প্রতি বছর বসন্তের শেষ দিকে, অর্থাৎ চৈত্র মাস থেকে শুরু হয় মধু সংগ্রহের মূল মৌসুম, যা চলে আষাঢ়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত। বন বিভাগের কাছ থেকে নির্দিষ্ট রাজস্ব দিয়ে অনুমতি বা ‘পাস’ গ্রহণ করার পর তারা ডিঙি নৌকায় করে রওনা হন বনের দিকে।

একেকটি মধু সংগ্রাহক দলে সাধারণত ৭ থেকে ১০ জন মৌয়াল থাকেন, যাদের নেতৃত্বে থাকেন একজন অভিজ্ঞ ‘বহদ্দার’ বা ‘সর্দার’। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে তারা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নানা ধর্মীয় রীতি পালন করেন। কারণ তারা জানেন, একবার বনের ভেতর প্রবেশ করলে জীবন ও মৃত্যুর মাঝের ব্যবধান কেবল একটি ভুল পদক্ষেপ বা একটি হিংস্র প্রাণীর থাবার সমান। বিদায় নেওয়ার সময়টি হয়ে ওঠে আবেগঘন, কারণ সবার সুস্থ শরীরে ঘরে ফিরে আসার কোনো নিশ্চয়তা থাকে না।

​বাঘের আতঙ্ক: প্রতি পদে মৃত্যুর ছায়া

মধু আহরণ অভিযানের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক এবং মূর্তিমান বিভীষিকার নাম রয়েল বেঙ্গল টাইগার। এ অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে ফেরা চিরচেনা প্রবাদ “জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ”, যা মৌয়ালদের জীবনের প্রতিদিনের রূঢ় বাস্তবতা। তারা যখন জঙ্গলে বড় গাছের মগডালে উঠে সতর্ক দৃষ্টিতে মৌচাক খুঁজতে থাকেন, তখন তাদের চোখ স্বভাবতই থাকে ওপরের দিকে। আর ঠিক এই সুযোগটাই নেয় বনের মাটিতে ঘাপটি মেরে থাকা হিংস্র বাঘ।

একদম নিঃশব্দে পেছন থেকে আচমকা আক্রমণ করে বসে সে। শুধু বনের ভেতরেই নয়, সারাদিনের খাটুনি শেষে নৌকায় ফেরার পথে বা রাতের বেলায় ঘুমানোর সময়ও বাঘের হামলার শিকার হন নিরীহ মৌয়ালরা। প্রতি বছরই বেশ কয়েকজন মৌয়াল বাঘের নির্মম আক্রমণে প্রাণ হারান অথবা চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন। বাঘের হাত থেকে বাঁচতে তারা বনের ভেতর মাথার পেছনে মুখোশ পরার মতো নানা অভিনব কৌশল গ্রহণ করেন। কিন্তু ধূর্ত ও ক্ষুধার্ত বাঘের সামনে তা সবসময় কাজে আসে না।

​কুমির, সাপ ও প্রকৃতির বিরূপ আচরণের সাথে লড়াই

মৌয়ালদের বিপদের তালিকা শুধুমাত্র বাঘের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়। সুন্দরবনের অসংখ্য ছোট-বড় নদী আর খাড়িগুলো ভয়ংকর কুমির পরিপূর্ণ। এক বন থেকে আরেক বনে যাওয়ার জন্য যখন মৌয়ালদের বুক বা কোমর সমান কাদাপানি ভেঙে পায়ে হেঁটে এগোতে হয়, তখন যেকোনো মুহূর্তেই কুমিরের শিকারে পরিণত হওয়ার প্রবল ভয় থাকে। এর পাশাপাশি গহীন বনে পদে পদে রয়েছে বিষধর সাপের তীব্র উপদ্রব। বিশেষ করে গোখরার মতো প্রাণঘাতী সাপের ছোবল থেকে বাঁচার কোনো চিকিৎসা ব্যবস্থা বনের ভেতর থাকে না। এসব বন্যপ্রাণীর পাশাপাশি মৌয়ালদের লড়াই করতে হয় প্রকৃতির বিরূপ আচরণের সাথেও। সাগরের জোয়ার-ভাটার খেয়ালখুশি, হঠাৎ ধেয়ে আসা সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস বা কালবৈশাখী ঝড়ে নৌকা ডুবে সর্বস্বান্ত হওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনা এই পেশায় অহরহ ঘটে থাকে।

​দাদনের জাল ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার নির্মম শিকার

বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতির এই নির্মমতার বাইরেও মউয়ালদের জন্য অন্যতম প্রধান বাধা হলো অর্থনৈতিক শোষণ। জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে যে মধু তারা সংগ্রহ করেন, তার ন্যায্য বাজারমূল্য তারা কখনোই পান না। মূলধনের অভাবে তারা স্থানীয় মহাজনদের দাদন বা ঋণের জালে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকেন। পাস নেওয়া থেকে শুরু করে নৌকার খরচ- সবকিছুর জন্যই তারা মহাজনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বাজারদর যতই চড়া হোক, মহাজনদের নির্ধারিত নামমাত্র মূল্যেই তাদের মধু বিক্রি করতে হয়। মধ্যস্বত্বভোগীরাই লাভের বড় অংশটি লুটে নেয়, আর প্রকৃত মৌয়ালরা থেকে যান চরম দারিদ্র্যের অন্ধকারে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে আরও বাড়িয়েছে। লবণাক্ততা বাড়ার কারণে গাছে পর্যাপ্ত ফুল ফুটছে না, ফলে মধুর উৎপাদন কমে গিয়ে মৌয়ালদের জীবিকাকে করে তুলেছে চরম অনিশ্চিত।

​জীবন বাজি রাখা এক নিরন্তর বেঁচে থাকার সংগ্রাম

সব মিলিয়ে, সুন্দরবনে মধু আহরণ যেন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে টিকে থাকার এক নিরন্তর লড়াই। সুন্দরবন থেকে আগত এক বয়াম খাঁটি মধুর প্রতিটি ফোঁটায় মিশে থাকে মৌয়ালদের ঘাম, দীর্ঘশ্বাস আর হার না মানা অদম্য সাহস। আমরা যখন নিশ্চিন্তে এই সুমিষ্ট মধুর স্বাদ নিই, তখন আড়ালেই থেকে যায় গহীন অরণ্যে লড়াই করা এই প্রান্তিক মানুষগুলোর রক্তঝরা গল্প। পদে পদে এত বাধা, বঞ্চনা আর মৃত্যুঝুঁকি থাকার পরও তারা বারবার ফিরে যান সেই চিরচেনা ভয়ংকর সুন্দরবনে। কারণ সুন্দরবন শুধু তাদের রুজি-রুটির একমাত্র অবলম্বনই নয়, বরং তাদের অস্তিত্ব আর আত্মপরিচয়ের সাথে মিশে থাকা এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

This post was viewed: 39

আরো পড়ুন