আন্দোলন-সংগ্রামে পাশে থাকা মিত্র রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে ৪১টি শরিক দল ও জোটের নেতাদের নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকে শরিক দলগুলোর নেতারা অবহেলা ও অসন্তোষের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি সরকারে অংশীদার হওয়ার প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের বক্তব্য শুনে মূল্যায়নের আশ্বাস দেন। তবে শরিকদের বিভিন্ন প্রত্যাশা পূরণ এবং জোটের ভারসাম্য রক্ষা আগামী দিনে সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গত সোমবার রাতে রাজধানীর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত নৈশভোজ ও আলোচনায় ৪১টি শরিক দল ও জোটের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
নৈশভোজে উপস্থিত একাধিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর ক্ষমতার সমীকরণে শরিকদের যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় তাদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। বৈঠকে নেতারা খোলামেলাভাবে সেই অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন।
শরিকদের অভিযোগ, দুর্দিনের সঙ্গীদের যথাযথ গুরুত্ব না দিয়ে বিএনপির এককভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রবণতা রাজনৈতিক অঙ্গনে নেতিবাচক বার্তা দিচ্ছিল। জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবাইকে ধৈর্যসহকারে শোনেন এবং পর্যায়ক্রমে শরিকদের প্রাপ্য মূল্যায়নের আশ্বাস দেন। তিনি বলেন, সরকার ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক শক্তিকে সঙ্গে নিয়েই এগোতে চায়। এ লক্ষ্যে প্রতি দুই মাস পরপর শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের নিয়ে সমন্বয় সভা আয়োজনের বিষয়েও ইতিবাচক অবস্থান জানান।
নৈশভোজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলাম- আপনাদের এই ডাক কি ফেয়ারওয়েল ডিনার, নাকি নতুন কোনো যাত্রার সূচনা? জবাবে উনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, এটি কোনো বিদায়ী আয়োজন নয়, বরং আমাদের ওয়েলকামিং ডিনার। এখান থেকেই নতুন করে পথচলা শুরু।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুর্দিনে যারা পাশে ছিল, তাদের সঙ্গে নিয়ে চলার শৈলীটি বিএনপি নেতৃত্বের রপ্ত করা জরুরি। প্রধানমন্ত্রী খুবই আন্তরিক ছিলেন এবং তাঁর বক্তব্যে অধিকাংশ দলই আশ্বস্ত হতে পেরেছে বলে মনে করি।’
একই ধরনের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরও কয়েকটি শরিক দলের নেতারা। ভাসানী জনশক্তি পার্টির চেয়ারম্যান শেখ রফিকুল ইসলাম বাবলু বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করতে এই আয়োজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ন্যাশনাল পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদের মতে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযাত্রীদের মধ্যে যে মান-অভিমান তৈরি হয়েছিল, এই পুনর্মিলনীর মাধ্যমে তার অনেকটাই দূর হয়েছে।
তবে ইতিবাচক পরিবেশের মধ্যেও রাজনৈতিক বাস্তবতার বিষয়টি সামনে এনেছেন কয়েকজন শরিক নেতা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, দীর্ঘদিনের ক্ষোভ কিছুটা কমলেও দুর্দিনের সঙ্গীদের যথাযথ মূল্যায়ন, চাটুকারিতা পরিহার এবং শরিকদের প্রত্যাশা সামলে জোটের ঐক্য ধরে রাখা বিএনপির জন্য সহজ হবে না।
তাদের ভাষ্য, নৈশভোজে অংশ নেওয়া কয়েকটি শরিক দলের চাওয়া-পাওয়া বাস্তবতার তুলনায় অনেক বেশি। এমনকি রাজপথে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা বা সাংগঠনিক সক্ষমতা না থাকা কিছু দলও বিভিন্ন পদ-পদবির দাবি তুলছে।
বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত করে নেতা-কর্মীদের নিয়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়া এবং ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হওয়া সৈয়দ এহসানুল হুদাও শরিক হিসেবে নৈশভোজে আমন্ত্রিত ছিলেন।
তিনি বলেন, ‘শরিকদের সঙ্গে দূরত্বের যে আভাস ছিল, আমি মনে করি, প্রধানমন্ত্রীর নৈশভোজের মধ্য দিয়ে সেই দূরত্ব কমে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর কথায় সবাই আশ্বস্ত হয়েছেন। বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে পথচলার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। শরিকদের মূল্যায়নের বিষয়েও তিনি আশ্বস্ত করেছেন।’