Skip to main content

Ridge Bangla

রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার প্রথম সড়ক সংযোগ চালুর পথে, সামরিক ব্যবহার নিয়ে বাড়ছে পশ্চিমাদের উদ্বেগ

রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে ইতিহাসের প্রথম সরাসরি সড়ক সংযোগ চালুর প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। তুমেন নদীর ওপর নির্মিত নতুন সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও পর্যটন সহজ হবে বলে দাবি করা হলেও, এটি সামরিক সহযোগিতা জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডোরে পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন গবেষক ও বিশ্লেষক।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন সেতুটি রাশিয়ার দূরপ্রাচ্যের খাসান শহরের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার তুমানগাং অঞ্চলকে যুক্ত করবে। এতদিন দুই দেশের মধ্যে একমাত্র স্থল সংযোগ ছিল ‘ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ’ নামে পরিচিত একটি রেলসেতু।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়া তাদের অংশের নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ করেছে। সেখানে কাস্টমস ও কোয়ারেন্টিনসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও প্রস্তুত রয়েছে। গত ১৯ জুন সেতুটির উদ্বোধনের পরিকল্পনা থাকলেও রাশিয়ার অংশের কাজ শেষ না হওয়ায় তা স্থগিত করা হয়। নতুন উদ্বোধনের তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়া বলছে, সেতুটি নির্মাণের উদ্দেশ্য দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, পর্যটন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানো।

তবে ইউক্রেনের মানবাধিকার সংস্থা ট্রুথ হাউন্ডসের অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, সেতুটির প্রকৃত উদ্দেশ্য অর্থনৈতিক নয়; বরং এটি সামরিক সরঞ্জাম, সেনা এবং প্রযুক্তি আদান-প্রদানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক করিডোর হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।

সংস্থাটির ওপেন-সোর্স গবেষণা বিভাগের প্রধান নাজার মিহুনের মতে, সড়কপথে পরিবহন রেলপথের তুলনায় পশ্চিমা দেশগুলোর স্যাটেলাইট নজরদারি এড়িয়ে চলা সহজ। তাঁর ভাষ্য, ট্রাকে কী ধরনের মালামাল পরিবহন করা হচ্ছে তা শনাক্ত করা রেলপথের তুলনায় অনেক বেশি কঠিন।

নতুন সেতুটি প্রায় ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৭ মিটার প্রশস্ত। এতে দুই লেনের সড়ক থাকবে। সংযোগ সড়কসহ পুরো প্রকল্পের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ দশমিক ৭ কিলোমিটার। স্যাটেলাইট চিত্রে রাশিয়ার অংশে একটি হেলিকপ্টার অবতরণস্থলসহ অতিরিক্ত অবকাঠামো নির্মাণেরও তথ্য পাওয়া গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যমান রেলপথে দুই দেশের রেললাইনের প্রস্থ ভিন্ন হওয়ায় সীমান্তে ট্রেনের চাকা পরিবর্তন করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ। নতুন সড়ক সেতু চালু হলে এ জটিলতা থাকবে না।

ট্রুথ হাউন্ডসের প্রতিবেদনে প্রকল্পটির অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সেতু নির্মাণে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় হলেও ২০২৪ সালে রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৪ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া ২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়ায় প্রায় ১০ হাজার রুশ নাগরিক ভ্রমণ করলেও তাঁদের অধিকাংশই সরকারি তত্ত্বাবধানে নির্ধারিত সফরে অংশ নেন।

এসব তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকদের ধারণা, সেতুটির মূল লক্ষ্য বাণিজ্য সম্প্রসারণ নয়; বরং দুই দেশের সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা আরও সহজ করা।

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সড়ক চালু হলে উত্তর কোরিয়ার সেনা, নির্মাণ ব্রিগেড ও সামরিক কর্মকর্তাদের দ্রুত রাশিয়ায় পাঠানো সহজ হবে। একইভাবে রাশিয়ার সামরিক প্রযুক্তি, অস্ত্র ও অন্যান্য সরঞ্জাম উত্তর কোরিয়ায় স্থানান্তরও দ্রুততর হবে।

নাজার মিহুন বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সক্ষমতা ধরে রাখতে উত্তর কোরিয়ার সহায়তা এখন গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত হয়েছে। তাঁর মতে, দুই দেশের ক্রমবর্ধমান সামরিক সম্পর্ক অস্ত্র ও প্রযুক্তি বিনিময়কে আরও সহজ এবং কম স্বচ্ছ করে তুলছে, যা উত্তর কোরিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

ট্রুথ হাউন্ডসের এসব দাবির বিষয়ে মন্তব্য জানতে ক্রেমলিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

২০২৪ সালের জুনে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন একটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর পরপরই সেতুটির নির্মাণকাজ শুরু হয়।

এর পর থেকে দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। পশ্চিমা ও ইউক্রেনীয় সূত্রের দাবি, উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে সেনাসদস্য, গোলাবারুদ এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের কুরস্ক অঞ্চলে রাশিয়ার পক্ষে ১৪ হাজারের বেশি উত্তর কোরীয় সেনা মোতায়েন রয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি সম্প্রতি দাবি করেছেন, রাশিয়া আরও প্রায় ৩০ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এর আগে ২০২৩ সালে বার্তা সংস্থা রয়টার্স স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে জানায়, উত্তর কোরিয়ার রাসন বন্দর থেকে প্রায় ২ হাজার কনটেইনার রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। ধারণা করা হয়, সেগুলোতে কামানের গোলা ও স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছিল।

এদিকে কিম জং উন রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত উত্তর কোরীয় সেনাদের প্রশংসা করেছেন এবং তাঁদের পরিবারের জন্য নতুন আবাসনও উদ্বোধন করেছেন।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে অন্তত ২ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা নিহত হয়েছেন। এছাড়া গুরুতর আহত দুই সেনাকে ইউক্রেনীয় বাহিনী জীবিত আটক করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, তুমেন নদীর ওপর নির্মিত নতুন এই সড়ক সেতু কেবল দুই দেশের ভৌগোলিক সংযোগ নয়; এটি রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার ক্রমবর্ধমান সামরিক অংশীদারত্বেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক, যার প্রভাব ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিতেও পড়তে পারে।

This post was viewed: 1

আরো পড়ুন