ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে উত্তর কোরিয়া ক্ষেপণাস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম ও সেনা সহায়তা জোরদার করেছে বলে বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য ও আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সহযোগিতার মাধ্যমে পিয়ংইয়ং শুধু মস্কোকে সহায়তাই করছে না, একই সঙ্গে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও সামরিকভাবে নিজস্ব অবস্থানও শক্তিশালী করছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়া সম্প্রতি কেএন-২৩ ও কেএন-২৪ মডেলের কৌশলগত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং মোবাইল লঞ্চার রাশিয়ায় পাঠানো পুনরায় শুরু করেছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৩০ হাজার সেনা মোতায়েনের প্রস্তুতিও চলছে বলে দাবি করা হয়েছে। ইউক্রেনের গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব সেনাকে রাখার জন্য রাশিয়ার ভোরোনেজ অঞ্চলে প্রয়োজনীয় আবাসন সুবিধাও প্রস্তুত করা হয়েছে।
একই সময়ে উত্তর কোরিয়া আগামী পাঁচ বছরে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় আড়াই গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি দেশটির সামরিক রপ্তানি বৃদ্ধির কৌশলেরই অংশ।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের দাবি, ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের অভিজ্ঞতা দেশটির অস্ত্র প্রযুক্তি উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। যুদ্ধের শুরুতে কেএন-২৩ ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভ্রষ্টতার হার প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিটার পর্যন্ত থাকলেও রুশ প্রকৌশলীদের সঙ্গে যৌথ কারিগরি উন্নয়নের পর তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। বর্তমানে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের নির্ভুলতা অনেক বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্র উত্তর কোরিয়ার জন্য কার্যত একটি বাস্তব সামরিক পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটির সেনারা আধুনিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা অর্জনের পাশাপাশি অস্ত্রব্যবস্থার উন্নয়নেও সুযোগ পাচ্ছে। কেএন-২৩ ক্ষেপণাস্ত্র প্রায় ৬০০ কিলোমিটার এবং কেএন-২৪ প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়েছে। এ কারণে ভবিষ্যতে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তায়ও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
রাশিয়ার নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং ইউক্রেনের হামলার কারণে চাপের মুখে পড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে ইস্কান্দার-এম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় সেই ঘাটতি পূরণে মস্কো উত্তর কোরিয়ার সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ সহযোগিতার বিনিময়ে উত্তর কোরিয়া উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুবিধাও পাচ্ছে। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত রাশিয়াকে অস্ত্র ও সেনা সহায়তা দিয়ে দেশটি প্রায় ৭ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন থেকে ১৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থ দেশটির অবকাঠামো উন্নয়ন, আবাসন প্রকল্প এবং নতুন শিল্প খাতে বিনিয়োগে ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক লাভের পাশাপাশি রাশিয়ার কাছ থেকে উন্নত সামরিক প্রযুক্তিও পাচ্ছে উত্তর কোরিয়া। উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, পারমাণবিক চালিকাশক্তি প্রযুক্তি এবং আধুনিক ড্রোন ব্যবহারের অভিজ্ঞতা দেশটির সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে ফিরে আসা উত্তর কোরীয় সেনাদের একটি অংশ এসব অভিজ্ঞতা দেশের অন্য সেনাদের প্রশিক্ষণে কাজে লাগাচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, রাশিয়ার সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সামরিক-শিল্প সহযোগিতার ফলে উত্তর কোরিয়া অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষা খাতে চীনের ওপর একক নির্ভরতা কমাতে সক্ষম হচ্ছে। এর ফলে মস্কো-পিয়ংইয়ং সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও গভীর হওয়ার পাশাপাশি উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত অবস্থানও আরও শক্তিশালী হতে পারে।