Ridge Bangla

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যে বড় যুদ্ধের আশঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা পাল্টাপাল্টি হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। উভয় দেশই গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের শর্ত আর মানবে না বলে জানিয়েছে। একই সঙ্গে ইরান সতর্ক করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র আরও ২-৩ দিন হামলা অব্যাহত রাখলে তারা ‘সর্বাত্মক অভিযান’ শুরু করবে। রয়টার্স, আলজাজিরা ও এএফপির প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকের শর্ত আর অনুসরণ করবে না। শনিবার ইরানও একই ধরনের অবস্থান প্রকাশ করে। এদিন টানা সপ্তম দিনের মতো যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় হামলা চালায়। এর পাল্টা জবাবে পারস্য উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট দেশের বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালায় ইরান।

গত ১৭ জুন দুই দেশ যুদ্ধ স্থায়ীভাবে বন্ধের উদ্দেশ্যে একটি সমঝোতা স্মারকে সই করে। এতে সব ফ্রন্টে সংঘাত বন্ধ, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করা, ইরানের বন্দরে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার এবং ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তির লক্ষ্যে নতুন আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল।

এর ধারাবাহিকতায় ২২ জুন সুইজারল্যান্ডে কাতার ও পাকিস্তানের শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে দুই দেশের প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে ওই বৈঠকের পরই নতুন করে হামলা-পাল্টা হামলা শুরু হয়। মাঝেমধ্যে থেমে থাকলেও শনিবার টানা সপ্তম দিনের মতো ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র।

ইরানের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র এখন শুধু সামরিক লক্ষ্যবস্তু নয়, বিমানবন্দর, রেলস্টেশন, সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোকেও লক্ষ্য করছে। নতুন দফার সংঘাত শুরুর পর থেকে মার্কিন হামলায় দেশটিতে অন্তত ৫০ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে, জর্ডানে শুক্রবার ইরানের হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার তথ্য দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

গত মঙ্গলবার ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরান আলোচনায় না ফিরলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালানো হতে পারে। এরপর থেকেই ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে অবকাঠামোকেন্দ্রিক হামলা বাড়িয়েছে মার্কিন বাহিনী।

সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে লিখিত বিবৃতিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বারবার সমঝোতা স্মারকের শর্ত ভঙ্গ করেছে। এতে প্রমাণ হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর ‘মূল্যহীন ও অকার্যকর’।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জ্যেষ্ঠ সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা আরও ২-৩ দিন চলতে থাকলে তেহরান আবারও সর্বাত্মক অভিযান শুরু করবে।

টানা হামলা ও পাল্টা জবাব

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, শুক্রবার দিবাগত রাতে পরিচালিত সপ্তম দফার হামলায় ইরানের নজরদারি ব্যবস্থা, সামরিক রসদ অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভান্ডার এবং নৌবাহিনীর স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু ছিল।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, হরমোজগান প্রদেশে সর্বশেষ মার্কিন হামলায় ৩ জন নিহত এবং ৮ জন আহত হয়েছেন। হামলায় ২টি সেতু, একটি সড়ক সুড়ঙ্গ ও টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ১১৬টি টেলিযোগাযোগ টাওয়ার অচল হয়ে পড়েছে।

মার্কিন হামলার জবাবে কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে হামলার কথা জানিয়েছে ইরান। ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর দাবি, কুয়েতের একটি তেল স্থাপনা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালানো হয়েছে। কুয়েতের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামলার কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়েকটি উৎপাদন ইউনিট বন্ধ রাখতে হয়েছে।

ইরান আরও দাবি করেছে, বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত শেখ ইসা বিমানঘাঁটির বিমান আশ্রয়কেন্দ্র, জ্বালানি সংরক্ষণাগার ও সংযোগকারী কয়েকটি সেতু লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। পাশাপাশি জর্ডানের আল-আজরাক ঘাঁটির জ্বালানি ট্যাংকেও হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে দেশটি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৩ মাস পর শুক্রবার দিবাগত রাতে সৌদি আরবেও হামলা চালিয়েছে ইরান। রাজধানী রিয়াদের কাছে আল-খারজের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি এবং লোহিত সাগর উপকূলের ইয়ানবু এলাকায় সতর্কসংকেত বেজে ওঠে।

ঘটনার সঙ্গে পরিচিত দুই ব্যক্তি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, আল-খারজের ওই ঘাঁটিতে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছেন। তবে হামলার বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ কিংবা ইরান কোনো মন্তব্য করেনি।

আলজাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি হামলা শুরুর পর প্রথম পর্যায়ে ১৩ মার্কিন সেনা নিহত হন। পরে এক বিমান দুর্ঘটনায় একজন পাইলটের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ জর্ডানে নিহত দুই সেনাকে যুক্ত করলে নিহত মার্কিন সেনার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬।

বেসামরিক স্থাপনাও হামলার মুখে

ইরানের খুজেস্তান প্রদেশের কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ দিনে যুক্তরাষ্ট্র ১২টি শহরের ৯৫টি স্থানে হামলা চালিয়েছে। এতে অন্তত ৮ জন নিহত হয়েছেন। বিদ্যুৎ স্থাপনা ও পানি শোধনাগারের পাম্প ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি গ্রামের সুপেয় পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে।

ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নতুন দফার সংঘাত শুরু হওয়ার পর ৬ জুলাই থেকে মার্কিন হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত এবং ৫০০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

আলজাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারকের সব প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন করেছে। তাই তেহরানও ওই সমঝোতার আওতায় নিজেদের সব অঙ্গীকার স্থগিত করেছে।

যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা

ক্রমাগত হামলা-পাল্টা হামলার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইরানে মার্কিন হামলার পরিধি ও তীব্রতা যেমন বাড়ছে, তেমনি ইরানও উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলার মাধ্যমে পাল্টা জবাব দিচ্ছে। ৩ মাসের মধ্যে প্রথমবার সৌদি আরবে হামলা হয়েছে। একই সঙ্গে সিরিয়াতেও প্রথমবার হামলার খবর পাওয়া গেছে।

কাতারভিত্তিক আরব পারস্পেকটিভস ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক জেইদন আলকিনানি আলজাজিরাকে বলেন, যুদ্ধ যেদিকে এগোচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ধীরে ধীরে এটি আরও বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। তাঁর মতে, এই সংকট নিরসনে জাতিসংঘ বা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যকর উদ্যোগ না থাকা এবং আঞ্চলিক মধ্যস্থতার চেষ্টা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা না থাকাও বড় উদ্বেগের বিষয়।

This post was viewed: 3

আরো পড়ুন