Skip to main content

Ridge Bangla

মোবাইল ফোনের ‘গ্রে মার্কেট’: বাংলাদেশের সরকার ও মোবাইল বিক্রেতাদের চলমান দ্বন্দ্বের নেপথ্যে

​বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অন্যতম বড় চালিকাশক্তি হলো মোবাইল ফোন। বর্তমানে দেশে প্রায় ১৯ কোটির বেশি মোবাইল সংযোগ রয়েছে। কিন্তু এই বিশাল বাজারের এক বড় অংশ দখল করে আছে তথাকথিত ‘গ্রে মার্কেট’ বা অননুমোদিত বাজার। সাম্প্রতিক সময়ে এই গ্রে মার্কেট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং মোবাইল বিক্রেতাদের মধ্যে এক নতুন দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে, যেটি সহিংস হামলা পর্যন্ত গড়িয়েছে। একদিকে সরকার শুল্ক ফাঁকি রোধ ও নিরাপত্তার স্বার্থে কঠোর হচ্ছে, অন্যদিকে বিক্রেতারা বাজারের বাস্তবতাকে তুলে ধরছেন।

​গ্রে মার্কেট বলতে মূলত সেই বাজারকে বোঝায় যেখানে বৈধ পথে শুল্ক পরিশোধ না করে বিদেশ থেকে মোবাইল ফোন এনে বিক্রি করা হয়। সাধারণত ‘ল্যাগেজ পার্টি’র মাধ্যমে বা কুরিয়ার সার্ভিসে এগুলো দেশে আসে।

​বাংলাদেশে এই বাজারের জনপ্রিয়তা পাওয়ার প্রধান কারণ হলো দামের বিশাল পার্থক্য। অফিসিয়াল বা অনুমোদিত চ্যানেলে আসা একটি ফোনের ওপর সরকারকে প্রায় ৩০ থেকে ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে শুল্ক ও ভ্যাট দিতে হয়। ফলে দেখা যায়, একই ব্র্যান্ডের একটি ফোনের অফিসিয়াল দাম যদি ৫০ হাজার টাকা হয়, তবে আনঅফিসিয়াল বা গ্রে মার্কেটে সেটি মিলছে ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকায়। সাধারণ মধ্যবিত্ত ক্রেতার কাছে এই ১০-১৫ হাজার টাকার সাশ্রয় অনেক বড় বিষয়।

​সরকারের পক্ষ থেকে গ্রে মার্কেটকে একটি বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর পেছনে দুটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে, প্রতি বছর কয়েক হাজার কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দিচ্ছে এই অবৈধ বাজার। দ্বিতীয়টি হচ্ছে, অনিবন্ধিত ফোনের আইএমইআই (IMEI) ডাটাবেজে থাকে না, ফলে অপরাধমূলক কাজে এসব ফোন ব্যবহার করা হলে অপরাধীকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। ​এই সংকট নিরসনে বিটিআরসি ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার’ (NEIR) প্রযুক্তি চালু করে। এর মাধ্যমে নিয়ম করা হয় যে, ডাটাবেজে নিবন্ধিত না থাকলে কোনো ফোন দেশের নেটওয়ার্কে সচল হবে না। যদিও মাঝখানে এই প্রক্রিয়া কিছুটা শিথিল ছিল, তবে সম্প্রতি সরকার আবারও কঠোর অবস্থানে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

​মোবাইল বিক্রেতাদের একটি বড় অংশ মনে করেন, শুধুমাত্র কঠোর আইন দিয়ে এই বাজার বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাদের মতে, বাংলাদেশে স্মার্টফোনের ওপর উচ্চমাত্রার শুল্কই গ্রে মার্কেটকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বিশেষ করে প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের ফোনের ক্ষেত্রে অফিসিয়াল এবং আনঅফিসিয়াল দামের ব্যবধান ক্রেতাদের অবৈধ ফোনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ঢাকার মোতালেব প্লাজা বা ইস্টার্ন প্লাজার মতো বড় মার্কেটগুলোর বিক্রেতাদের অভিযোগ রয়েছে যে সরকারি অভিযানে সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন, কিন্তু যারা পাইকারি হারে ফোনগুলো বর্ডার দিয়ে নিয়ে আসছে, তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাদের দাবি, শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা করলে বৈধ ফোনের দাম কমবে এবং ক্রেতারা তখন স্বয়ংক্রিয়ভাবেই অফিসিয়াল ফোন কিনবেন।

​গ্রে মার্কেটে ফোন সস্তা হলেও ক্রেতারা বড় ধরনের ঝুঁকিতে থাকেন। প্রথমত, কোনো ওয়ারেন্টি সুবিধা পাওয়া যায় না। দ্বিতীয়ত, ফোনের যন্ত্রাংশ অনেক সময় পরিবর্তন করে নিম্নমানের পার্টস লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগ থাকে। সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো বর্তমানের সরকারি কড়াকড়ি। যেকোনো সময় শখের দামি ফোনটি নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি নিছক ‘খেলনা’ বা ‘ক্যালকুলেটরে’ পরিণত হতে পারে।

​সরকার এবং বিক্রেতাদের এই দ্বন্দ্বের মূলে রয়েছে স্বার্থের সংঘাত। দেশীয় মোবাইল সংযোজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চায় সরকার গ্রে মার্কেট পুরোপুরি বন্ধ করে দিক, যাতে তাদের উৎপাদিত ফোনের বাজার বড় হয়। অন্যদিকে, আমদানিকারকরা চান শুল্ক হার কমানো হোক। আর সরকার চায় রাজস্ব সংগ্রহ ঠিক রাখতে। ​বিটিআরসি সম্প্রতি ঘোষণা দিয়েছে, অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধের প্রক্রিয়াটি ধাপে ধাপে সম্পন্ন করা হবে। তবে এটি বাস্তবায়ন করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ হঠাৎ করে লাখ লাখ হ্যান্ডসেট বন্ধ করে দিলে সাধারণ মানুষের মধ্যে বড় ধরনের ক্ষোভ সৃষ্টি হতে পারে।

​বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মোবাইল ফোনের গ্রে মার্কেট বন্ধ করতে হলে শুধুমাত্র বলপ্রয়োগ নয়, প্রণোদনারও প্রয়োজন আছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রিমিয়াম হ্যান্ডসেটের শুল্ক কিছুটা কমিয়ে আনা এবং কিস্তিতে ফোন কেনার সুবিধা সহজ করা হলে গ্রে মার্কেটের প্রতি আকর্ষণ কমবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে যেন ক্রেতারা বুঝতে পারেন, কয়েক হাজার টাকা বাঁচাতে গিয়ে তারা আসলে বড় ধরনের আর্থিক ও নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে পড়ছেন।

​সরকার ও বিক্রেতাদের এই দ্বন্দ্ব তখনই প্রশমিত হবে যখন একটি ভারসাম্যপূর্ণ শুল্ক নীতি এবং কঠোর আইনি প্রয়োগ- উভয়ই হাতে হাত রেখে চলবে। অন্যথায়, ছায়া বাজারের এই আধিপত্য কমানো দুঃসাধ্য হয়েই থাকবে।

This post was viewed: 32

আরো পড়ুন