Ridge Bangla

মার্কিন স্থল হামলার হুমকির মুখে ‘প্রস্তুত’ থাকার ঘোষণা তেহরানের

জর্ডান ও ইরাকে সপ্তাহান্তে মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার পর টানা নবম রাতের মতো ইরানে হামলা চালানোর দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড। এর মধ্যেই সম্ভাব্য মার্কিন স্থল আক্রমণকে ‘স্বাগত’ জানাতে প্রস্তুত থাকার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, দেশটির নেতৃত্ব মার্কিন বাহিনীর যেকোনো সম্ভাব্য স্থল আগ্রাসনকে ‘স্বাগত জানাতে অপেক্ষার প্রহর গুনছে।’ তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির ভাষা ‘সম্পূর্ণ স্পষ্ট’ এবং সেটি লঙ্ঘনের ‘কোনো অজুহাত নেই।’

সোমবার ভোরে মার্কিন সামরিক বাহিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করে, সর্বশেষ হামলায় ইরানের সামরিক কমান্ড সেন্টার, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র, সামুদ্রিক সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র এবং যোগাযোগ নেটওয়ার্ক লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও বেসামরিক নাবিকদের ওপর হামলা চালানোর ইরানের সক্ষমতা আরও দুর্বল করতেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, সাম্প্রতিক এই ‘অত্যন্ত কঠোর’ হামলাগুলো নিহত তিন মার্কিন সেনাসদস্যের স্মরণে চালানো হয়েছে। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আজ রাতে আমরা তাদের ওপর আবারও খুব কঠোরভাবে আঘাত হেনেছি, এবং সেটা করেছি সম্ভবত তিনজন মহান দেশপ্রেমিকের সম্মানে।’

ট্রাম্পের দাবি, ইরান ‘অত্যন্ত, অত্যন্ত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সামরিকভাবে তারা প্রায় সবকিছুই হারিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তাদের কাছে কিছু ক্ষেপণাস্ত্র, কিছু ড্রোন এবং সামান্য উৎপাদন সক্ষমতা আছে, তবে খুব বেশি নয়।’ নিহত মার্কিন সেনাদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমরা গভীরভাবে দুঃখিত।’ তাঁর ভাষ্য, তারা লড়াই করছিলেন যাতে তেহরান ‘পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।’

সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, শনিবার উত্তর ইরাকে একটি ভূপাতিত ইরানি একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোনের অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ নিয়ন্ত্রিতভাবে ধ্বংস করার সময় একজন মার্কিন সেনা নিহত হন।

এর আগে শুক্রবার জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলায় আরও অন্তত দুই মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হন। সোমবার মার্কিন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেন, হাওয়াইয়ের ২৫ বছর বয়সী লেফটেন্যান্ট টাইলার জেমস ফিহান এবং টেক্সাসের ১৯ বছর বয়সী প্রাইভেট ইসাবেলা গনজালেস গত ১৭ জুলাই মুয়াফফাক শালতি বিমানঘাঁটিতে ‘শত্রুপক্ষের হামলায়’ নিহত হয়েছেন।

মার্কিন ঘোষণার পরপরই ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দেশের বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণাঞ্চলের বন্দর মাহশাহর, বন্দর ইমাম খোমেনি ও চাবাহার এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবরিজ শহরে এসব বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।

আধা-সরকারি মেহের নিউজ এজেন্সির তথ্য অনুযায়ী, তাবরিজের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একজন নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন। পরে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, দক্ষিণাঞ্চলের বন্দরনগরী বুশেহরের বিভিন্ন স্থানেও হামলা হয়েছে। শহরটিতেই ইরানের বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অবস্থিত।

বুশেহরের গভর্নর মোহাম্মদ মোজাফফারি বলেন, ‘কয়েক মিনিট আগে বুশেহর শহরের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন শত্রুর নিক্ষেপ করা প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে।’ তিনি জানান, হামলার পরিধি ও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা তদন্ত করা হচ্ছে।

এর আগে রোববার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নির্মাণাধীন দারখোভিন পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার নিন্দা জানিয়ে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার প্রতি আহ্বান জানায় তেহরান। ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থা ওই হামলাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে উল্লেখ করে।

এদিকে জর্ডান, কুয়েত ও সিরিয়ায়ও পাল্টা হামলার দাবি করেছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস। তাদের দাবি, জর্ডানের আকাবা বিমানবন্দরে অবস্থানরত মার্কিন সি-১৭ পরিবহন বিমান এবং একটি পি-৮ নজরদারি বিমান লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছে, যাতে কয়েকটি বিমান গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আইআরজিসির আরও দাবি, মুয়াফফাক শালতি বিমানঘাঁটির ২০টি আশ্রয়কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে, যেখানে মার্কিন সেনারা অবস্থান করছিলেন। এতে ডজন ডজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছে বলেও তারা দাবি করে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, বিমানঘাঁটিতে হামলার আগে গত সপ্তাহে জর্ডানে ইরানের তিনটি পৃথক হামলায় আরও বহু মার্কিন সেনা আহত হন এবং কয়েকটি হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

কুয়েতে আইআরজিসি দাবি করেছে, আলি আল সালেম বিমানঘাঁটিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনা, বিমান-সংক্রান্ত সরঞ্জামের গুদাম এবং এমকিউ-৯ ড্রোন রাখার হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে, যাতে কয়েকটি বিমান আগুনে পুড়ে যায়।

অন্যদিকে কুয়েত সরকার জানিয়েছে, একটি লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র টানা দ্বিতীয় দিনের মতো হামলার শিকার হয়েছে। তারা এটিকে গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর সরাসরি হামলা বলে নিন্দা জানিয়েছে।

কুয়েতি সেনাবাহিনী এক্সে জানিয়েছে, ইরানের হামলার জবাবে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, শোনা যাওয়া বিস্ফোরণের শব্দ শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করার ফল। একই সঙ্গে জনগণকে নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

এ ছাড়া আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা সিরিয়ার আল-তানফে একটি কমান্ড সেন্টারের ওপর ‘আকস্মিক হামলা’ চালিয়েছে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএর প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের ইরানশাহর শহরে নিহত সেনাদের ‘শহীদের রক্তের প্রতিশোধ’ হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে।

এদিকে বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বিস্ফোরণের খবরের মধ্যেই সাইরেন বেজে ওঠে। দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, ইরানের হামলা মোকাবিলায় তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রয়েছে।

This post was viewed: 2

আরো পড়ুন