Ridge Bangla

মার্কিন রণতরি উপেক্ষা করে উপসাগরীয় দেশগুলোতে কেন হামলা করছে ইরান?

যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক বিমান হামলার জবাবে ইরান পাল্টা আঘাত হানলেও তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানের মতো উপসাগরীয় দেশগুলো। তবে মার্কিন নৌবহর বা ইসরায়েলের ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা থেকে বিরত রয়েছে তেহরান। এই কৌশলের কারণ নিয়ে সামরিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাখ্যা উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান এমন একটি কৌশল অনুসরণ করছে, যার মাধ্যমে একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়, অন্যদিকে সংঘাতকে এমন পর্যায়ে না নেওয়া হয়, যা দেশটির জন্য বড় ধরনের সামরিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

সামরিক বিশ্লেষক ও অবসরপ্রাপ্ত লেবানিজ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এলিয়াস হান্না আল-জাজিরাকে বলেন, মার্কিন নৌবহর বা রণতরিতে সরাসরি হামলা চালানো ইরানের জন্য আত্মঘাতী হতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘মার্কিন রণতরিতে হামলা মানেই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক পাল্টা প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়া।’ তিনি আরও বলেন, অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয়ের কারণে মার্কিন যুদ্ধজাহাজে সফল হামলা চালানোও অত্যন্ত কঠিন।

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আতিফেহ তাঘিয়ানি মনে করেন, ইরানের ধারণা- যুক্তরাষ্ট্র কুয়েতসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা পরিচালনা করছে। যদিও এসব দেশ বারবার দাবি করেছে, তারা ইরানবিরোধী সামরিক অভিযানে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। তবু আইনগত ও কৌশলগত বিবেচনায় ইরান এসব দেশকে লক্ষ্যবস্তু করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তাঘিয়ানির মতে, ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে শত্রুতা বাড়িয়ে ইরানের পাল্টা প্রতিক্রিয়ার পথ আরও কঠিন করে তোলা।

তবে কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-শায়জি এই যুক্তিকে ‘প্রোপাগান্ডা’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ বিমান হামলা পরিচালিত হচ্ছে ‘জর্জ ডব্লিউ বুশ’ এবং ‘আব্রাহাম লিংকন’ নামের দুটি বিমানবাহী রণতরি থেকে, যেগুলো ইরানের উপকূল থেকে মাত্র ১৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে।

আল-শায়জির ভাষ্য, ইরান জানে ক্রুজ ও টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র এসব রণতরি থেকেই নিক্ষেপ করা হচ্ছে। কিন্তু সেসব জাহাজে হামলা করে একজন মার্কিন সেনাও নিহত হলে এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা তেহরান ভালোভাবেই উপলব্ধি করে।

তাঁর মতে, উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ থামাতে বাধ্য করার যে কৌশল ইরান নিয়েছে, তা কার্যকর হচ্ছে না। বরং এতে দেশটি আঞ্চলিকভাবে আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ বন্দর আল-ওতাইবি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান- কোনো পক্ষই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চায় না। এ কারণে উভয় দেশই হামলার লক্ষ্য নির্ধারণে সতর্কতা অবলম্বন করছে।

তিনি বলেন, ইসরায়েলের বেন গুরিয়ান বিমানবন্দর থেকে মার্কিন রিফুয়েলিং বিমান পরিচালিত হলেও ইরান সেখানে হামলা চালাচ্ছে না, যাতে সংঘাত আরও বিস্তৃত না হয়।

তবে আল-ওতাইবি সতর্ক করে বলেন, ইরান যদি উপসাগরীয় কোনো দেশে বড় ধরনের হামলা চালিয়ে ব্যাপক বেসামরিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটায়, তাহলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালিকে কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চাইলেও বর্তমানে সেটি ইরানের জন্য ‘রাজনৈতিক দায়’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সার্বিকভাবে বিশ্লেষকদের অভিমত, অভ্যন্তরীণ জনমতের চাপ মোকাবিলা এবং নিজেদের ‘প্রতিরোধের সমীকরণ’ ধরে রাখতে ইরান প্রতিবেশী দেশগুলোতে হামলার পথ বেছে নিয়েছে। তবে এই কৌশল দেশটিকে উল্লেখযোগ্য সামরিক সুবিধা এনে দিচ্ছে না; বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

This post was viewed: 2

আরো পড়ুন