Skip to main content

Ridge Bangla

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর: আগুনে পোড়া সেই দুপুরের ক্ষত আজও শুকায়নি

২০২৫ সালের ২১ জুলাই। ঘড়ির কাঁটা তখন দুপুর ১টা পেরিয়েছে। রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের কেউ শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হচ্ছিল, কেউ অভিভাবকের অপেক্ষায় ছিল। ঠিক সেই সময় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির একটি দোতলা ভবনে আছড়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে শিশুদের কোলাহলে মুখর ক্যাম্পাস ঢেকে যায় আগুন, ধোঁয়া ও আর্তনাদে।

বিমানবাহিনীর চীনে তৈরি এফটি-৭ বিজিআই যুদ্ধবিমানটি বেলা ১টা ৬ মিনিটে ঢাকার কুর্মিটোলার বিমানঘাঁটি থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ অভিযানে উড্ডয়ন করেছিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিমানটি মাইলস্টোনের দিয়াবাড়ি ক্যাম্পাসে বিধ্বস্ত হয়। আঘাতের পরপরই ভবনে ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের অনেকে আগুনে দগ্ধ হন। ফায়ার সার্ভিস, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, পুলিশ, চিকিৎসাকর্মী এবং স্থানীয় মানুষ উদ্ধারকাজে অংশ নেন।

দুর্ঘটনায় মোট ৩৬ জনের প্রাণহানি ঘটে। তাঁদের মধ্যে ২৮ জনই ছিল মাইলস্টোনের শিক্ষার্থী। নিহত হন বিমানটির পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মোহাম্মদ তৌকির ইসলামও। আহত হন দেড় শতাধিক মানুষ, যাঁদের অধিকাংশই শিশু-কিশোর। অনেককে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালসহ ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিতে হয়। এক বছর পরও আহতদের কেউ কেউ শারীরিক ও মানসিকভাবে পুরোপুরি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি।

ভয়াবহ সেই দুপুরে মানবিক সাহসের প্রতীক হয়ে ওঠেন মাইলস্টোনের শিক্ষিকা মাহেরিন চৌধুরী। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি বারবার ভবনের ভেতরে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বের করে আনেন। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর সাহসিকতায় বহু শিশু প্রাণে বেঁচে যায়।

ঘটনার পর সরকার ও বিমানবাহিনী পৃথক তদন্তের উদ্যোগ নেয়। ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া সরকারি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রশিক্ষণ চলাকালে পাইলটের ‘অপারেশনাল’ বা উড্ডয়নসংক্রান্ত ত্রুটির কারণে বিমানটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। তদন্তকারীরা প্রায় ১৫০ জন বিশেষজ্ঞ, প্রত্যক্ষদর্শী ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যের বক্তব্য নেন এবং ১৬৮টি আলামত পরীক্ষা করেন। প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ৩৩টি সুপারিশ করা হয়। প্রাথমিক বিমান প্রশিক্ষণ ঢাকা থেকে সরিয়ে কম জনবসতিপূর্ণ এলাকায় নেওয়ার সুপারিশ ছিল এর অন্যতম।

তদন্তে মাইলস্টোনের ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন ওঠে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবনটি বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী অনুমোদিত ছিল না এবং প্রয়োজনীয় একাধিক সিঁড়ির পরিবর্তে সেখানে মাত্র একটি কেন্দ্রীয় সিঁড়ি ছিল। এই কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দ্রুত বেরিয়ে আসা ও উদ্ধারকাজকে বাধাগ্রস্ত করে হতাহতের সংখ্যা বাড়িয়ে থাকতে পারে বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়।

সরকার পরবর্তী সময়ে নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ লাখ টাকা এবং আহতদের পাঁচ লাখ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আহতদের বিনামূল্যে চিকিৎসা অব্যাহত রাখার কথাও জানানো হয়। তবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দাবি শুধু অর্থসহায়তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁরা জবাবদিহি, নিরাপদ শিক্ষাঙ্গন এবং ২১ জুলাইকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাতীয় শোক দিবস হিসেবে পালনের দাবি জানিয়েছেন।

ট্র্যাজেডির প্রথম বর্ষপূর্তিতে মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ দুই দিনের শোক ও স্মরণ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। দোয়া, প্রার্থনা ও স্মরণানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে হারিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অন্যদের স্মরণ করা হচ্ছে। এক বছর পেরোলেও দিয়াবাড়ির সেই ক্যাম্পাসে আগুনে পোড়া দুপুরটির স্মৃতি এখনো জীবন্ত।

This post was viewed: 19

আরো পড়ুন