অন্তর্বর্তী সরকারের পর গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারের মেয়াদ ১০০ দিন অতিক্রম করেছে। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়েও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আগের অবস্থানেই রয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য হিন্দু।
মঙ্গলবার (৯ জুন) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ভারতের ওপর সন্তুষ্ট নয় বিএনপি সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশের বিষয়ে ভারত যেসব পদক্ষেপ নিয়েছিল, সেগুলো এখনো বহাল থাকায় এই অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগেই দুই দফায় তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল ভারত। প্রথমবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক জানাতে গত ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় আসেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। ওই সফরে তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
দ্বিতীয়বার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণপত্র নিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন দেশটির পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি। এ ছাড়া গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেন ভারতের স্পিকার ওম বিরলা।
তবে একটি সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব উদ্যোগ বিএনপির কাছে যথেষ্ট মনে হয়নি। দলটির একটি প্রভাবশালী অংশ মনে করে, নতুন সরকারের প্রতি সদিচ্ছা দেখাতে মোদি সরকারের আরও কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন ছিল। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আরোপ করা বিভিন্ন বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের প্রত্যাশা ছিল তাদের।
বিএনপির ওই অংশের মতে, বাংলাদেশি পণ্যের জন্য ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা পুনরায় চালু করা, ব্যবসা ও চিকিৎসাসহ সব ধরনের ভিসা কার্যক্রম পুরোপুরি স্বাভাবিক করা এবং ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর থাকা বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া উচিত ছিল ভারতের।
সূত্রের দাবি, ভারত এখনো এসব বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এমন কোনো উদ্যোগও দেখা যায়নি, যার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সন্তুষ্ট হয়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুনভাবে এগিয়ে নিতে পারেন।
দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা এমন একটি অবস্থান তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যেখানে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করলেও দুই দেশের সম্পর্কে তার প্রভাব পড়বে না। তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান ছিল ভিন্ন। ওই সরকারের দাবি ছিল, সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হলে শেখ হাসিনাকে ফেরত দিতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিএনপির পক্ষ থেকে এমন উদ্যোগ নেওয়া হলেও ভারত ইতিবাচক সাড়া দেয়নি। উদাহরণ হিসেবে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার গঠনের পর ‘অবৈধ অভিবাসী’ শব্দের ব্যাপক ব্যবহারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। ওই দুই রাজ্যে কথিত বাংলাদেশিদের পুশ-ইন করার বিষয়টি নিয়েও আলোচনা বেড়েছে।
বাংলাদেশি কূটনীতিকদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা ‘অবৈধ অভিবাসী’ ইস্যুতে বেশি মনোযোগ দিতে চায় না। এর পরিবর্তে ১৯৯৬ সালের গঙ্গা চুক্তি নবায়ন এবং ভিসা সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দিতে চায় বাংলাদেশ।
এর আগে গত ৭ ও ৮ এপ্রিল ভারত সফর করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। সফরে তিনি ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। দুই দেশের সম্পর্কের বর্তমান অবস্থা যাচাই করাই ছিল ওই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য।
দ্য হিন্দু বলেছে, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী প্রচারে বাংলাদেশ নিয়ে উস্কানিমূলক মন্তব্য এবং শেখ হাসিনার বিভিন্ন বক্তব্য প্রচারের বিষয়টি দেখিয়েছে, নির্বাচনে বড় জয় পেলেও বিএনপি ভারতকে প্রভাবিত করতে পারেনি।
তবে ঢাকায় নিযুক্ত বাংলাদেশের এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক দ্য হিন্দুকে বলেছেন, ভারতের রাজ্য নির্বাচনের সময় দেওয়া বক্তব্য দেশটির পররাষ্ট্রনীতিতে প্রভাব ফেলবে না বলে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল।
ওই কূটনীতিকের দাবি, ভারত সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। কথিত অবৈধ অভিবাসী ইস্যুতে ভারতের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে বাংলাদেশ ‘বেঈমানি’ হিসেবে দেখছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ভারতের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এখন ভারত সফরের পরিবর্তে মালয়েশিয়া ও চীন সফরের পরিকল্পনা করছেন।