Skip to main content

Ridge Bangla

বিশ্ব বাণিজ্যের পথে ঝুঁকি: পাঁচটি সমুদ্রপথে বাড়ছে অনিশ্চয়তা

বিশ্ব অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে যে অদৃশ্য অবকাঠামো সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে, তার অন্যতম হলো সমুদ্রপথ। অথচ এই বৈশ্বিক বাণিজ্যের বিশাল অংশ নির্ভর করে অল্প কয়েকটি সরু সমুদ্রপথের ওপর, যেগুলোকে বলা হয় সামুদ্রিক ‘বটলনেক’। সাম্প্রতিক মধ্যপ্রাচ্য সংকট, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, আবারও সামনে এনেছে এই পথগুলোর ভঙ্গুরতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর তাদের গভীর প্রভাব।

ইরান-সংকটের জেরে পারস্য উপসাগর অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও কাঁচামালের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নিরাপত্তা সংকটের কারণে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।

যুদ্ধের আগে যেখানে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলার, তা বেড়ে ১১৫ ডলারেরও বেশি হয়েছে। এর প্রভাব শুধু জ্বালানিতেই সীমাবদ্ধ নেই; খাদ্য, কৃষিপণ্য ও ভোক্তা বাজারেও এর ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি একটি বড় বাস্তবতাকে স্পষ্ট করেছে- বিশ্ব বাণিজ্য এখনো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। এই পথগুলোর যেকোনো একটিতে বিঘ্ন ঘটলেই বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে।

হরমুজ প্রণালি

পারস্য উপসাগর ও ওমান সাগরকে সংযুক্তকারী হরমুজ প্রণালি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর হিসেবে বিবেচিত। সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৩৯ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ১৯ শতাংশ এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোর জন্য এই প্রণালির কোনো কার্যকর বিকল্প নেই। দীর্ঘদিন ধরেই ইরান এই প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়ে আসছে।

সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে জাহাজে হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এর ফলে শুধু জ্বালানি নয়, সার ও কন্টেইনার পরিবহণও ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিবছর প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ কন্টেইনার এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে, যা বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার একটি বড় অংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রণালিতে অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে বিশ্ব খাদ্য উৎপাদন খরচও বেড়ে যেতে পারে, কারণ সার রপ্তানির বড় অংশ এই পথেই পরিবাহিত হয়।

সুয়েজ খাল

মিশরের নিয়ন্ত্রণাধীন সুয়েজ খাল লোহিত সাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে, যা এশিয়া থেকে ইউরোপে যাত্রাপথকে প্রায় ১০ দিন কমিয়ে দেয়। বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এই খালের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।

এই খালের গুরুত্ব বোঝা যায় ২০২১ সালের একটি ঘটনায়, যখন একটি বিশাল কন্টেইনার জাহাজ আটকে গিয়ে ছয় দিনের জন্য পুরো খাল বন্ধ হয়ে যায়। এতে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যদিও সুয়েজ খাল সরাসরি বড় কোনো সামরিক হুমকির মুখে নেই, তবে এর দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত বাব আল-মানদাব প্রণালিতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর হামলার কারণে অনেক জাহাজ বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছে, যা খরচ ও সময় দুটোই বাড়াচ্ছে।

পানামা খাল

পানামা খাল আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগরকে যুক্ত করে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ২.৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। সংখ্যাটি তুলনামূলক কম মনে হলেও, উচ্চমূল্যের পণ্য, বিশেষ করে কন্টেইনার, যানবাহন ও শিল্পজাত পণ্য পরিবহণে এর গুরুত্ব অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের মোট কন্টেইনার পরিবহণের প্রায় ৪০ শতাংশ এই খালের মাধ্যমে হয়, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এই খালের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে খরার কারণে পানির স্তর কমে যাওয়ায় জাহাজ চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করতে হয়েছে। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক উত্তেজনাও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। খালের অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর আগ্রহ ভবিষ্যতে নতুন জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।

মালাক্কা প্রণালি

বিশ্বের ব্যস্ততম সমুদ্রপথ হিসেবে পরিচিত মালাক্কা প্রণালি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর। বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ২৪ শতাংশ এই পথ দিয়ে সম্পন্ন হয়। চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শিল্পোন্নত দেশের জ্বালানি আমদানির বড় অংশ এই প্রণালির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে চীনের প্রায় ৮০ শতাংশ তেল এই পথ দিয়েই আসে। তবে এই প্রণালিতে জলদস্যুতার ঘটনা একটি বড় উদ্বেগ। সম্প্রতি এখানে শতাধিক দস্যুতা ঘটনার খবর পাওয়া গেছে। এছাড়া ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, বিশেষ করে চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে উত্তেজনা, এই পথের নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন সুনামি বা আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতও এখানে সম্ভাব্য হুমকি।

তুর্কি প্রণালি

বসফরাস ও দার্দেনেলিস প্রণালি নিয়ে গঠিত তুর্কি প্রণালি কৃষ্ণ সাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করে। বিশ্বের প্রায় ৩ শতাংশ সামুদ্রিক বাণিজ্য এই পথ দিয়ে হয়। বিশেষ করে ইউক্রেন, রাশিয়া ও রোমানিয়া থেকে গম রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালির মাধ্যমে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলে উত্তেজনা তৈরি হলে বিশ্ব খাদ্যবাজার সরাসরি প্রভাবিত হয়। প্রণালিটি অত্যন্ত সরু, কিছু স্থানে মাত্র ৭০০ মিটার প্রশস্ত, যার কারণে জাহাজ চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ। তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে থাকা এই পথের সামরিক ব্যবস্থাপনা মন্ট্রেক্স কনভেনশন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাতের পর থেকে এখানে সামরিক জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

এছাড়াও, বিশ্বে এমন অন্তত ২৪টি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বন্দর রয়েছে, যেগুলো বৈশ্বিক বাণিজ্যের জন্য অপরিহার্য। তাইওয়ান প্রণালি, ডোভার প্রণালি বা বেরিং প্রণালির মতো অন্যান্য পথও একই ধরনের ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এই ঝুঁকিগুলোর মধ্যে রয়েছে ভূরাজনৈতিক সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তন, জলদস্যুতা, সন্ত্রাসী হামলা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ। একটি পথ বন্ধ হয়ে গেলে বিকল্প পথ ব্যবহার করতে হয়, যা সময় ও খরচ বাড়িয়ে দেয় এবং সাপ্লাই চেইনকে অস্থিতিশীল করে তোলে।

ভবিষ্যতে এই ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো, বিকল্প রুট উন্নয়ন এবং নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে জ্বালানি ও পণ্য পরিবহণে বৈচিত্র্য আনা না গেলে বিশ্ব অর্থনীতি বারবার এমন সংকটের মুখোমুখি হবে। হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান উত্তেজনা একটি সতর্কবার্তা- বিশ্ব বাণিজ্যের প্রাণরেখা এখনো কয়েকটি সংকীর্ণ পথের ওপর নির্ভরশীল, এবং এই নির্ভরতা যতদিন থাকবে, ততদিন বৈশ্বিক অর্থনীতি ঝুঁকির মধ্যেই থাকবে।

This post was viewed: 85

আরো পড়ুন