Skip to main content

Ridge Bangla

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল: আটলান্টিকের সেই রহস্যময় স্থানে আসলে কী ঘটে?

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল

১৯৪৫ সালের ৫ ডিসেম্বর। ফ্লোরিডার ফোর্ট লডারডেল নেভাল এয়ার স্টেশন থেকে আকাশে উড়ল পাঁচটি টিবিএম অ্যাভেঞ্জার টর্পেডো বোমারু বিমান।

যুদ্ধ শেষ হয়েছে মাত্র কয়েক মাস আগে। বিমানের পাইলটেরা কোনো শত্রুঘাঁটিতে হামলা করতে যাচ্ছেন না, সামনে নেই কোনো যুদ্ধও। এটি একটি নিয়মিত প্রশিক্ষণ মহড়া ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী আটলান্টিকের ওপর দিয়ে নির্দিষ্ট পথ ঘুরে আবার ঘাঁটিতে ফিরে আসার কথা তাদের।

দুপুরের ঝকঝকে আকাশ দেখে এমন কোনো ইঙ্গিত পাওয়ার উপায় ছিল না যে, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই এই পাঁচটি বিমান ও তাতে থাকা ১৪ জন মানুষ এমনভাবে হারিয়ে যাবেন, যা পরবর্তী কয়েক দশকে পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত রহস্যগুলোর একটির কেন্দ্রে জায়গা করে নেবে!

প্রথমে সবকিছু স্বাভাবিকই ছিল। বিমানগুলো নির্ধারিত এলাকায় অনুশীলন সম্পন্ন করে। এরপর শুরু হলো সমস্যা। লেফটেন্যান্ট চার্লস টেইলর রেডিওতে জানান, তিনি নিজের অবস্থান ঠিকমতো বুঝতে পারছেন না। কম্পাসও কেমন যেন বিভ্রান্তিকর তথ্য দিচ্ছে!

পরবর্তী রেডিও মেসেজগুলো ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে।

ঘাঁটি থেকে তাদের পশ্চিম দিকে উড়তে বলা হচ্ছিল। কিন্তু টেইলর ধারণা করেছিলেন, তারা সম্ভবত ফ্লোরিডা কিজের ওপরে আছেন। বাস্তবে তিনি যদি বাহামার কাছাকাছি অবস্থান করে থাকেন, তাহলে দিক নির্ধারণে এই একটি ভুলই পুরো বহরকে আটলান্টিকের আরও গভীরে নিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট।

আবহাওয়া খারাপ হতে শুরু করল। সূর্য ডুবে যাচ্ছিল। জ্বালানিও শেষ হয়ে আসছিল। তারপর একসময় রেডিও যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেল। পাঁচটি বিমান আর ফিরে আসেনি।

১৪ জন মানুষসহ পুরো ফ্লাইট উধাও হয়ে গেল আটলান্টিকের বিশাল জলরাশির কোথাও। তাদের খুঁজতে পাঠানো একটি পিবিএম মেরিনার বিমানও অল্প সময়ের মধ্যে হারিয়ে যায়! তাতে ছিলেন আরও ১৩ জন।

একই দিনে ছয়টি বিমান এবং ২৭ জন মানুষের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের কিংবদন্তিতে পরিণত হয় সবচেয়ে শক্তিশালী অধ্যায়গুলোর একটিতে।

আজও ফ্লাইট ১৯-এর পাঁচটি অ্যাভেঞ্জারের নিশ্চিত ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি। তবে ইউএস নেভাল হিস্ট্রি অ্যান্ড হেরিটেজ কমান্ডের বিশ্লেষণে দিক হারানো, কম্পাসে সম্ভাব্য সমস্যা, ক্রমশ খারাপ হতে থাকা আবহাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়া- এই ঘটনাগুলোর সমন্বয়কেই সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা হয়। উদ্ধারকারী মেরিনার বিমানটির ক্ষেত্রে আবার আকাশেই আগুন ধরে যাওয়ার শক্ত প্রমাণ রয়েছে।

কিন্তু ঘটনা যতটা ভয়াবহ, পরবর্তী সময়ে তৈরি হওয়া রহস্যের বিস্তৃতি তার চেয়েও ব্যাপক।

কারণ পৃথিবী এই ঘটনাকে শুধু ‘ফ্লাইট ১৯-এর দুর্ঘটনা’ হিসেবে মনে রাখেনি। ঘটনাটি জড়িয়ে গেছে এমন এক কাল্পনিক সীমানার সঙ্গে, যার নাম শুনলেই আজও মনে পড়ে নিখোঁজ জাহাজ, অদৃশ্য বিমান, বিকল কম্পাস, এলিয়েন, আটলান্টিস আর সমুদ্রের গভীরে লুকিয়ে থাকা কোনো অজানা শক্তির কথা।

তার নাম বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল (কাল্পনিক ছবি)
বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল (কাল্পনিক ছবি); Image source: TECHEXPLORISTS

মানচিত্রে নেই যে ত্রিভুজ

সাধারণভাবে আটলান্টিক মহাসাগরের পশ্চিমাংশে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা, বারমুডা এবং পুয়ের্তো রিকোর মধ্যবর্তী বিশাল এলাকাকে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল বলা হয়। তিনটি স্থানকে রেখা দিয়ে যুক্ত করলে মোটামুটি একটি ত্রিভুজের মতো অঞ্চল তৈরি হয়।

তবে এখানেই প্রথম অদ্ভুত ব্যাপারটি সামনে আসে- এর কোনো সর্বজনস্বীকৃত সীমানাই নেই!

Image source: Wikimedia Commons

কোন জায়গা থেকে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল শুরু এবং কোথায় শেষ, সেটি নির্ধারণ করে দেওয়া কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা নেই। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি মানচিত্রেও ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল’ নামে স্বীকৃত কোনো ভৌগোলিক অঞ্চল নেই। ইউএস বোর্ড অন জিওগ্রাফিক নেমস নামটিকে আনুষ্ঠানিক ভৌগোলিক নাম হিসেবেও স্বীকৃতি দেয় না। এনওএএ বা ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনও বলছে, এর কোনো সরকারি সীমানা নির্ধারিত হয়নি।

৩০৬ মানুষসহ হারিয়ে গেল ইউএসএস সাইক্লপস

১৯১৮ সাল। তখন চলছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ।

২২ ফেব্রুয়ারি ব্রাজিলের সালভাদর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাল্টিমোরের উদ্দেশে রওনা দেয় মার্কিন নৌবাহিনীর বিশাল কয়লা পরিবহনকারী জাহাজ ইউএসএস সাইক্লপস। জাহাজটিতে ছিল বিপুল পরিমাণ ম্যাঙ্গানিজ আকরিক। পথে বার্বাডোসে থামার পর ৪ মার্চ আবার যাত্রা শুরু করে এটি।

তারপর? জাহাজটি যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল! কোনো বিপদসংকেত নেই, কোনো শেষ রেডিও বার্তা নেই, কিচ্ছু নেই! এমনকি নিশ্চিত কোনো ধ্বংসাবশেষও পাওয়া যায়নি।

জাহাজটিতে থাকা মোট ৩০৬ জন মানুষ নিখোঁজ হন। ইউএস নেভাল হিস্ট্রি অ্যান্ড হেরিটেজ কমান্ডের হিসাবে, সরাসরি যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়- এমন ঘটনায় মার্কিন নৌবাহিনীর ইতিহাসে এটি অন্যতম বৃহৎ প্রাণহানি।

ইউএসএস সাইক্লপস
ইউএসএস সাইক্লপস; Image source: Wikimedia Commons

ঘটনাটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় হওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ গিয়েছিল জার্মানদের দিকে। কোনো জার্মান সাবমেরিন কি জাহাজটিকে ডুবিয়ে দিয়েছিল?

যুদ্ধের পর জার্মান নৌ-রেকর্ড পরীক্ষা করেও এর পক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ব্রিটিশ গোয়েন্দা তথ্যেও এমন কোনো হামলার ইঙ্গিত ছিল না।

তাহলে কী ঘটেছিল?

ঝড়? জাহাজের কাঠামোগত ত্রুটি? অতিরিক্ত ভার? যান্ত্রিক সমস্যা?

সবই সম্ভাব্য ব্যাখ্যা। কিন্তু নিশ্চিত উত্তর আজও নেই। নেভাল হিস্ট্রি অ্যান্ড হেরিটেজ কমান্ডের এক বিশ্লেষণে জাহাজটির মারাত্মক কাঠামোগত ব্যর্থতাকে তুলনামূলকভাবে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

তারপরও একটি ১৯ হাজার টনের কাছাকাছি বিশাল জাহাজ শত শত মানুষ নিয়ে এমনভাবে হারিয়ে যাওয়া মানুষের কল্পনাকে উসকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

আরও বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সাইক্লপসের একই শ্রেণির দুটি জাহাজ, প্রোটিয়াস ও নেরিয়াস, ১৯৪১ সালে আটলান্টিকে হারিয়ে যায়। কোনোটিরই নিশ্চিত ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি। বহু বছর পর এই ঘটনাগুলোকেও বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের গল্পের ভেতর টেনে আনা হয়।

তবে তখনো ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল’ নামটির জন্ম হয়নি।

রহস্যের জন্ম সমুদ্রে নয়, কাগজে?

ফ্লাইট ১৯ হারিয়ে যাওয়ার পর সংবাদমাধ্যমে ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে আটলান্টিকের এই অঞ্চলে আরও কয়েকটি বিমান ও জাহাজ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা মানুষের আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।

কিন্তু ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল’ ধারণাটিকে জনপ্রিয় সংস্কৃতির স্থায়ী অংশে পরিণত করার ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার চেয়ে লেখকদের ভূমিকাই সম্ভবত বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৬৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন ম্যাগাজিন আর্গোসিতে লেখক ভিনসেন্ট গ্যাডিসের একটি লেখা প্রকাশিত হয়- ‘দ্য ডেডলি বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল’। ওই লেখার মাধ্যমেই ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল’ নামটি ব্যাপকভাবে পরিচিতি পায়। পরের বছর গ্যাডিস বিষয়টিকে আরও বিস্তৃত করেন তার বইয়ে।

এর এক দশক পর রহস্যের জগতে আসেন চার্লস বার্লিটজ। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তার ‘দ্য বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল’ বইটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। সেখানে বিভিন্ন নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা, অস্বাভাবিক কম্পাস, রহস্যময় শক্তি, আটলান্টিসসহ নানা ধারণা এক সুতোয় গাঁথা হয়।

টেলিভিশন অনুষ্ঠান, ডকুমেন্টারি, সিনেমা, উপন্যাস, পত্রিকা- সবখানেই প্রশ্ন উঠতে থাকল: আটলান্টিকের ওই অঞ্চলে কি সত্যিই এমন কোনো শক্তি আছে, যেটি মানুষ এখনো বুঝতে পারেনি?

কম্পাস কি সত্যিই অস্বাভাবিক আচরণ করে?

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় দাবিগুলোর একটি হলো- এখানে ঢুকলেই কম্পাস অস্বাভাবিক আচরণ করতে শুরু করে।

ফ্লাইট ১৯-এর রেডিও কথোপকথনে নেভিগেশন ও কম্পাস-সংক্রান্ত সমস্যার উল্লেখ থাকায় এই ধারণা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র বিষয়টিকে কিছুটা জটিল করে তোলে।

কম্পাস সাধারণত ‘ম্যাগনেটিক নর্থ’ নির্দেশ করে, যা ভৌগোলিক ‘ট্রু নর্থ’-এর সঙ্গে সব জায়গায় পুরোপুরি এক নয়। দুই উত্তরের মধ্যকার এই পার্থক্যকে নেভিগেশনের সময় হিসাব করতে হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে এই পার্থক্যের মাত্রাও ভিন্ন।

কম্পাস সাধারণত ‘ম্যাগনেটিক নর্থ’ নির্দেশ করে, যা ভৌগোলিক ‘ট্রু নর্থ’-এর সঙ্গে সব জায়গায় পুরোপুরি এক নয়; Image source: Lake St. Clair Sailing School

এনওএএ বলছে, বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের কিছু স্থানে এমন পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে যেখানে কম্পাসের ম্যাগনেটিক নর্থ এবং ট্রু নর্থের পার্থক্য তুলনামূলকভাবে বিশেষ অবস্থায় থাকে। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, সেখানে কোনো রহস্যময় শক্তি কম্পাসকে বিকল করে দেয়।

আধুনিক নেভিগেশন ব্যবস্থায় জিপিএস, ইনার্শিয়াল নেভিগেশন (Inertial Navigation), রাডার এবং উন্নত আবহাওয়া পূর্বাভাস যুক্ত হওয়ায় পুরনো যুগের নাবিক বা পাইলটদের তুলনায় বর্তমান সময়ের পরিস্থিতিও সম্পূর্ণ ভিন্ন।

তারপরেও প্রশ্ন থেকেই যায়- আগের এত দুর্ঘটনার ব্যাখ্যা কী?

সমুদ্রই কি আসল কারণ?

মানচিত্রে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের চারপাশে তাকালে রহস্যের চেয়ে প্রথমে চোখে পড়ার কথা ভূগোল।

অঞ্চলটির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় গালফ স্ট্রিম- আটলান্টিকের অত্যন্ত শক্তিশালী উষ্ণ সামুদ্রিক স্রোতগুলোর একটি। দ্রুত প্রবাহিত এই স্রোত কোনো দুর্ঘটনার পর ধ্বংসাবশেষ খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিতে পারে। ফলে ‘ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়নি’ কথাটি শুনতে যতটা অলৌকিক মনে হয়, বিশাল সমুদ্রের বাস্তবতায় সেটি সব সময় ততটা অস্বাভাবিক নয়।

এর সঙ্গে রয়েছে আবহাওয়া।

আটলান্টিকে সৃষ্ট বহু ট্রপিক্যাল স্টর্ম ও হারিকেন এই অঞ্চলের ওপর বা কাছ দিয়ে অতিক্রম করে। আধুনিক স্যাটেলাইট, আবহাওয়া রাডার ও উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা চালু হওয়ার আগের যুগে হঠাৎ খারাপ হয়ে যাওয়া আবহাওয়া জাহাজ ও বিমানের জন্য ভয়াবহ বিপদ তৈরি করতে পারত।

এনওএএর ভাষ্য অনুযায়ী, এই এলাকার বহু ঘটনার সম্ভাব্য ব্যাখ্যার মধ্যে ঝড়, গালফ স্ট্রিমের কারণে দ্রুত আবহাওয়া পরিবর্তন, ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিপজ্জনক অগভীর জলরাশি এবং মানবিক ভুল গুরুত্বপূর্ণ।

তাহলে মিথেন গ্যাস?

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল নিয়ে তুলনামূলকভাবে ‘বৈজ্ঞানিক শোনায়’ এমন একটি জনপ্রিয় তত্ত্ব হলো সমুদ্রতলের মিথেন।

সমুদ্রের নিচে জমে থাকা বিপুল মিথেন গ্যাস হঠাৎ বেরিয়ে এলে পানির ঘনত্ব কমে যেতে পারে। তাত্ত্বিকভাবে বড় ধরনের গ্যাস নিঃসরণ কোনো জাহাজের ভাসমান থাকার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এই ধারণা থেকেই গল্প ছড়িয়েছে- বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের নিচে মিথেনের বিস্ফোরণ ঘটে এবং জাহাজ মুহূর্তের মধ্যে ডুবে যায়।

শুনতে বেশ রোমাঞ্চকর শোনালেও এখানেও সমস্যা আছে- বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের বিখ্যাত নিখোঁজ হবার ঘটনাগুলো এই প্রক্রিয়ায় ঘটেছে বলে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নেই।

এনওএএ মিথেন নিঃসরণকে প্রচলিত তত্ত্বগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করলেও বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের রহস্যের প্রতিষ্ঠিত ব্যাখ্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। একইভাবে এলিয়েন, অন্য ডাইমেনশনে নিয়ে যাওয়া রহস্যময় ঘূর্ণি কিংবা হারানো আটলান্টিস সভ্যতার শক্তির পক্ষে তো কোনো নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণই নেই।

কিন্তু এত বিমান-জাহাজ একই জায়গায় হারাল কেন?

এই প্রশ্নই বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল রহস্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। আর এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে একটি বিষয় প্রায়ই বাদ পড়ে যায়- এটি পৃথিবীর ব্যস্ততম সামুদ্রিক ও আকাশপথগুলোর কাছাকাছি একটি বিশাল এলাকা।

ফ্লোরিডা, ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জ এবং আটলান্টিকের মধ্যে বহু বাণিজ্যিক জাহাজ, ব্যক্তিগত নৌযান ও বিমান নিয়মিত চলাচল করে। অর্থাৎ ট্রাফিক বেশি হলে দুর্ঘটনার সংখ্যাও স্বাভাবিকভাবেই বেশি দেখা যেতে পারে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই শুধু ‘কতগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছে’ না। বরং একই পরিমাণ ট্রাফিক থাকা অন্য সমুদ্রাঞ্চলের তুলনায় দুর্ঘটনার হার অস্বাভাবিকভাবে বেশি কি না সেটা। এ জায়গাতেই বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের কিংবদন্তি বড় একটি সমস্যায় পড়ে।

পৃথিবীর অন্য বড় ও ব্যস্ত সামুদ্রিক অঞ্চলের তুলনায় বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলে রহস্যময় নিখোঁজের ঘটনা বেশি ঘটে- এমন কোনো প্রমাণ নেই; Image source: Popular Mechanics

এনওএএ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, পৃথিবীর অন্য বড় ও ব্যস্ত সামুদ্রিক অঞ্চলের তুলনায় বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলে রহস্যময় নিখোঁজের ঘটনা বেশি ঘটে- এমন কোনো প্রমাণ নেই।

ইউএস কোস্ট গার্ডও বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলকে জাহাজ বা বিমানের জন্য বিশেষ বিপজ্জনক কোনো ভৌগোলিক এলাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। বহু দুর্ঘটনা পর্যালোচনা করেও এমন কোনো ‘অসাধারণ কারণ’ তারা খুঁজে পায়নি, যা প্রচলিত প্রাকৃতিক বা ভৌত কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।

স্মিথসোনিয়ানের ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের আলোচনাতেও একই বক্তব্য উঠে এসেছে- হারিকেন, নেভিগেশনাল ভুল, কম্পাসের স্বাভাবিক বিচ্যুতি এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা মিলিয়েই বহু ঘটনার বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়।

তাহলে কি সব রহস্যের সমাধান হয়ে গেছে?

মোটেও না! বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের মিথ দুর্বল হওয়া আর প্রত্যেকটি দুর্ঘটনার রহস্য সমাধান হওয়া এক বিষয় নয়।

ইউএসএস সাইক্লপস কোথায় ডুবেছিল, নিশ্চিতভাবে কেউ জানে না। ফ্লাইট ১৯-এর পাঁচটি অ্যাভেঞ্জারের ঠিক কী হয়েছিল, সেটিও শতভাগ নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করা যায়নি। মহাসাগরের তলদেশ এত বিশাল, গভীর এবং কঠিন যে বহু জাহাজ ও বিমানের ধ্বংসাবশেষ দশকের পর দশক খুঁজে পাওয়া না যাওয়াও সম্ভব।

ফ্লাইট ১৯ নিয়ে মার্কিন নৌবাহিনীর ঐতিহাসিক নথিতেও শেষ পর্যন্ত স্বীকার করা হয়েছে- ঘটনার সুনির্দিষ্ট কারণ কখনোই নির্ধারণ করা যায়নি। তবে প্রাপ্ত রেডিও বার্তা ও পরিস্থিতি দিক হারানো, আবহাওয়া খারাপ হওয়া এবং জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়ার দিকে শক্তভাবে ইঙ্গিত করে।

এই পার্থক্যটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল নিয়ে অনেক কিছুই অজানা- এটা যেমন সত্য, তেমনই এটাও সত্য যে কোনো কিছু অজানা মানেই অতিপ্রাকৃত নয়।

রহস্যকে আরও রহস্যময় করেছিলেন যারা

বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল নিয়ে সংশয়বাদী গবেষণায় সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি ল্যারি কুশে। তিনি একজন গ্রন্থাগারিক ছিলেন। সংবাদপত্রের পুরনো প্রতিবেদন, আবহাওয়ার রেকর্ড, সরকারি রিপোর্ট ও মূল উৎস ধরে বিখ্যাত ঘটনাগুলো পুনরায় পরীক্ষা করেছিলেন তিনি।

১৯৭৫ সালে প্রকাশিত তার ‘দ্য বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল মিস্ট্রি – সলভড’ বইয়ের মূল বক্তব্য ছিল- বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল নিয়ে প্রচলিত বহু গল্পে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বাদ গেছে, কিছু ঘটনায় নাটকীয়তা যোগ হয়েছে এবং এমন দুর্ঘটনাকেও কখনো কখনো ট্রায়াঙ্গেলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যেগুলো আসলে প্রস্তাবিত সীমানার বাইরেই ঘটেছিল।

স্মিথসোনিয়ানের বিশ্লেষণেও কুশের গবেষণাকে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের অতিপ্রাকৃত ব্যাখ্যার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাহলে বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল কি সত্যিই আছে?

ভৌগোলিক অর্থে আটলান্টিকের একটি অঞ্চল হিসেবে অবশ্যই জায়গাটি আছে। কিন্তু জাহাজ ও বিমানকে অস্বাভাবিক হারে গ্রাস করে- এমন কোনো রহস্যময় অঞ্চল হিসেবে? বর্তমান বৈজ্ঞানিক ও সরকারি তথ্য এর বিপরীতেই কথা বলছে।

এনওএএ বলছে, অন্যসব একই রকম ব্যস্ত সামুদ্রিক অঞ্চলের তুলনায় এখানে রহস্যময় নিখোঁজ হওয়ার হার বেশি- এমন প্রমাণ নেই।

ইউএস কোস্ট গার্ড বলছে, তারা এই অঞ্চলকে বিশেষ বিপজ্জনক এলাকা হিসেবে স্বীকারই করে না এবং তদন্তে কোনো অস্বাভাবিক শক্তির প্রমাণ পায়নি।

ইউএস নেভির ঐতিহাসিক রেকর্ড দেখায়, বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের সবচেয়ে বিখ্যাত ঘটনাগুলোর অন্তত কয়েকটির পেছনে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নেভিগেশনাল বিভ্রান্তি, যান্ত্রিক সমস্যা ও মানবিক ভুলের যথেষ্ট যৌক্তিক সম্ভাবনা রয়েছে।

তবু বারমুডা ট্রায়াঙ্গেল নিয়ে জল্পনা-কল্পনা সম্ভবত এখানেই শেষ হবে না। কারণ বিজ্ঞান কোনো অতিপ্রাকৃত ত্রিভুজের অস্তিত্ব খুঁজে না পেলেও সমুদ্র এখনো মানুষের কাছে পুরোপুরি উন্মুক্ত বই নয়। পৃথিবীর মহাসাগরের বিশাল অংশ প্রত্যক্ষভাবে অনুসন্ধান করা হয়নি। বহু পুরনো জাহাজ ও বিমান এখনো সমুদ্রতলে হারিয়ে আছে। কিছু দুর্ঘটনার শেষ মুহূর্তে ঠিক কী ঘটেছিল, আমরা হয়তো কোনোদিনই জানতে পারব না।

আর সেই না-জানার জায়গাটুকুই বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের সবচেয়ে বড় শক্তি।

ফিচার ইমেজ: এআই জেনারেটেড

তথ্যসূত্র

This post was viewed: 6

আরো পড়ুন