Skip to main content

Ridge Bangla

বাংলা সংগীতের কিংবদন্তি লাকী আখান্দ: সুরের আকাশে এক ধ্রুবতারা

বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনে এক অমর নাম লাকী আখান্দ। বাংলা গানের জগতে তার অবদান চিরকাল স্মরণীয় থাকবে। ২০১৭ সালের ২১ এপ্রিল, এই কিংবদন্তি সুরকার এবং গায়ক পৃথিবীকে বিদায় জানান। কিন্তু তার সৃষ্টিগুলো আজও বেঁচে রয়েছে, শ্রোতাদের হৃদয়ে গেঁথে আছে তার অমূল্য সংগীত।

লাকী আখান্দের জন্ম ১৯৫৬ সালের ১৮ জুন, ঢাকা শহরের পাতলা খান লেনে। সংগীতের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল পারিবারিকভাবেই প্রাপ্ত। ছোটবেলা থেকেই তিনি সংগীত শিখেছেন তার বাবা এ কে আবদুল হকের কাছ থেকে। বাবার সংগীতের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা থেকেই লাকী আখান্দের সংগীতজীবনের শুরু। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি সংগীতে হাতেখড়ি নেন। এরপর থেকেই সংগীতের প্রতি তার অটুট আকর্ষণ পরবর্তীতে তাকে সংগীতের আকাশে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রে পরিণত করে।

লাকী আখান্দের সংগীতজীবনের প্রথম পদক্ষেপ ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত টেলিভিশন এবং রেডিওতে শিশু শিল্পী হিসেবে সংগীতবিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ। ১৪ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল থেকে ‘বাংলা আধুনিক গান’ বিভাগে পুরস্কৃত হন। এরপর ১৬ বছর বয়সে এইচএমভি পাকিস্তান এবং এইচএমভি ভারতের সুরকার হিসেবে নিজের নাম যুক্ত করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি সংগীত পরিচালক হিসেবে কাজ করেন বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্র এবং অ্যালবামে।

১৯৭৫ সালে লাকী আখান্দ তার ছোট ভাই হ্যাপী আখান্দের একটি অ্যালবামের সংগীতায়োজন করেন। সেই অ্যালবামটি ছিল সংগীতপ্রেমীদের জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা। ‘নীল নীল শাড়ি পরে’ এবং ‘হঠাৎ করে বাংলাদেশ’ গানের মাধ্যমে তিনি তার অসাধারণ সুরের ক্ষমতা আরও একবার প্রমাণ করেন। তার সুরে গাওয়া ‘স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে’ এবং ‘পাহাড়ি ঝর্ণা’ গানগুলো ছিল বাংলার স্বাধীনতার সংগ্রামের এক আবেগঘন স্মৃতিচারণ।

১৯৮০ সালে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী পরিচালিত ‘ঘুড্ডি’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে তিনি আরও বড় পরিসরে খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯৮৪ সালে তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘লাকী আখান্দ’ প্রকাশিত হয়, যা সংগীতাঙ্গনে তার শক্ত অবস্থান নিশ্চিত করে। তার অন্যান্য জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আগে যদি জানতাম’, ‘আমায় ডেকো না’, ‘মামুনিয়া’, ‘এই নীল মনিহার’ এবং ‘হৃদয় আমার’। তিনি ব্যান্ড দল ‘হ্যাপি টাচ’-এর সদস্যও ছিলেন।

এছাড়া তিনি বাংলাদেশ বেতারে পরিচালক (সংগীত) হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। একাধারে তিনি সংগীত পরিচালক, সুরকার এবং কণ্ঠশিল্পী হিসেবে বাংলাদেশের সংগীতকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। তার সুরের বৈচিত্র্য এবং সৃষ্টিশীলতা ছিল অনন্য। তার গানে হামিং এবং শেকারের ব্যবহারের জন্য তাকে বাংলা গানের জগতে আলাদা মর্যাদা দেওয়া হয়।

তবে তার সংগীতজীবনের সবচেয়ে দুঃখজনক অধ্যায় ছিল তার ছোট ভাই হ্যাপী আখান্দের অকালমৃত্যু। ১৯৮৭ সালে হ্যাপী আখান্দের মৃত্যুর পর লাকী আখান্দ দীর্ঘদিন সংগীত থেকে দূরে ছিলেন। তবে তিনি তার সুরের মাধ্যমে আবার ফিরে আসেন, এবং তার গানগুলোর প্রতি শ্রোতাদের ভালোবাসা কখনো কমেনি।

লাকী আখান্দের গানগুলো বাংলা গানের ইতিহাসে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছিল। তার সুরের সঙ্গতি, কথা ও সুরের মেলবন্ধন এবং সংগীতের সৃজনশীলতার সমন্বয়ে সৃষ্ট সংগীত আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে এক অমর স্থান করে নিয়েছে। তার সুরে গাওয়া ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’, ‘এই নীল মনিহার’, ‘ফেরারি পাখি’ বা ‘কবিতা পড়ার প্রহর’ গানগুলো আজও সংগীতাঙ্গনে প্রভাব রেখে চলেছে। তার সৃষ্টি করা গানের আঙ্গিক ছিল বহুমুখী; কখনও আধুনিক, কখনও ক্লাসিক, আবার কখনও ফোক এবং পাশ্চাত্য সুরের মেলবন্ধন।

তবে একথা স্বীকার করতেই হবে, তার সুরের মধ্যে যে শুদ্ধতা ও ভালোবাসা ছিল, তা তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। তার সংগীতজীবন ছিল এক মহান প্রয়াস, যা আমাদের মাঝে আজও জীবন্ত। তার সুরে গান গাওয়ার মাধ্যমে তিনি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে তার স্মৃতি চিরকাল জাগিয়ে রেখেছেন। এমনকি তার মৃত্যুর পরও তরুণ মুন্সী তার অসমাপ্ত গান ‘যার কাছে মন রেখে’ কণ্ঠে তুলে প্রকাশ করেছেন। ৩৪ বছর আগে এই গানের লিরিক লিখেছিলেন গোলাম মোর্শেদ, এবং সুর করেছিলেন লাকী আখান্দ। মৃত্যুর পরও তার সুরের ছোঁয়া তার গানে চিরকাল থাকবে।

This post was viewed: 56

আরো পড়ুন