Ridge Bangla

বাংলাদেশে আবারও গুমের অভিযোগ, উদ্বেগ জানাল হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো জোরপূর্বক গুমের অভিযোগ সামনে এসেছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। একই সঙ্গে গুম প্রতিরোধে নেওয়া সংস্কার বাতিলের সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

রোববার প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এইচআরডব্লিউ বলেছে, গত ১২ জুলাই হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশ দ্রুত বাস্তবায়ন করে ৩০ বছর বয়সী মিরাজ শেখের নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগের তদন্ত করা উচিত। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ তাকে কোস্ট গার্ডের হেফাজতে দেখা গিয়েছিল। পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনীর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত সংস্কার বহাল রাখার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২০২৪ সালে গণ-আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া আগের সরকারের সময়ে জোরপূর্বক গুম ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। এরপর ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত দায়িত্ব পালনকারী অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের নভেম্বরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করে। ওই অধ্যাদেশে গুমের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত এবং আদালতের অনুমতি ছাড়াই আটককেন্দ্র পরিদর্শনের ক্ষমতা কমিশনকে দেওয়া হয়েছিল।

তবে এইচআরডব্লিউর দাবি, নবনির্বাচিত বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার অধ্যাদেশটি নবায়ন বা স্থায়ী আইনে পরিণত করেনি। নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ায় এটি কার্যকারিতা হারিয়েছে। একই সঙ্গে এমন একটি নতুন আইনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের থাকবে না।

এইচআরডব্লিউর এশিয়া অঞ্চলের উপপরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে হাজারো মানুষ জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়েছেন। সর্বশেষ এই ঘটনাটি দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রকৃত সংস্কার না হলে এ ধরনের ঘটনা আবারও ঘটতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এতে স্পষ্ট যে, এ ধরনের চর্চা বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া নতুন সরকারের উচিত প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা।’

আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা তাদের নির্দেশে পরিচালিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে কাউকে আটক বা অপহরণের পর আটকের বিষয়টি অস্বীকার করা কিংবা তার অবস্থান গোপন রাখাকে জোরপূর্বক গুম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার জোরপূর্বক গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে যোগ দেয়। ওই সনদ অনুযায়ী, গুমকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, তদন্ত করা এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এইচআরডব্লিউর বিবৃতি অনুযায়ী, চলতি বছরের ১০ এপ্রিল রাতে সুন্দরবনের কাছে মোংলার জয়মণির ঘোল এলাকায় জেলে মিরাজ শেখকে কোস্ট গার্ডের সদস্যরা আটক করে একটি স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যেতে দেখেছেন বলে একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেছেন।

পরদিন পরিবারের সদস্যরা মোংলার দিগরাজে কোস্ট গার্ড কার্যালয়ে গেলে প্রথমে তাদের জানানো হয়, মিরাজ একটি অভিযানে আছেন এবং পরে আসতে বলা হয়। পরে আবার গেলে তাদের জানানো হয়, মিরাজ কখনও সেখানে ছিলেন না।

এছাড়া ২১ এপ্রিল যে চায়ের দোকানের সামনে থেকে মিরাজকে আটক করা হয়েছিল বলে অভিযোগ, সেই দোকানের মালিক দাবি করেন, নিজেকে কোস্ট গার্ডের সদস্য পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি দোকানে এসে মিরাজের মোটরসাইকেলের তালা খুলে নিয়ে যান। পরদিন কোস্ট গার্ডের সদস্যরা মোটরসাইকেলটি ফেরত দেন বলেও তিনি জানান।

মিরাজের পরিবারের আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন এইচআরডব্লিউকে বলেন, ‘প্রত্যক্ষদর্শীরা কীভাবে এবং কখন তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, কোস্ট গার্ডের সদস্যরাই তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন।’

পরিবারটি অভিযোগ দায়ের, সংবাদ সম্মেলন এবং সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করলেও কোনো ফল পায়নি বলে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি। পরে মিরাজের বাবা হেবিয়াস করপাস আবেদন করলে গত ১২ জুলাই হাইকোর্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ১৫ দিনের মধ্যে তাকে খুঁজে বের করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন।

অন্যদিকে, কোস্ট গার্ডের পশ্চিম জোনের গণমাধ্যম কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাহবুব হোসেন বারবার মিরাজকে আটকের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গণমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, মিরাজ সম্পর্কে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।

এইচআরডব্লিউর মতে, ঘটনাটি অতীতের গুমের ঘটনাগুলোর সঙ্গে মিল রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত একটি কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি জোরপূর্বক গুমের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ২৮২ জন কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত গোপন স্থানে আটক থাকার পর ফিরে আসেন।

কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত ২৫১ জন আর ফিরে আসেননি এবং তাদের মৃত বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া আরও ৩৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কমিশনের মতে, প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।

কমিশনের তদন্তে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি), কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) এবং ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স (ডিজিএফআই)সহ বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠে এসেছে। কমিশন আরও বলেছে, গুমের ঘটনাগুলোর সঙ্গে ‘ব্যাপক ও পরিকল্পিত নির্যাতনের মতো সংস্কৃতি’ জড়িয়ে ছিল এবং প্রায় প্রতিটি গোপন আটককেন্দ্রেই নির্যাতনের আলামত পাওয়া গেছে।

এইচআরডব্লিউ আরও বলেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ এবং জোরপূর্বক গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ কার্যকর থাকলে গুমের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত এবং প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর সুযোগ ছিল।

তবে নবনির্বাচিত সরকার এসব অধ্যাদেশ স্থায়ী আইনে রূপ দেয়নি। পরিবর্তে এমন একটি আইনের প্রস্তাব করা হয়েছে, যেখানে গুমের তদন্ত করবে পুলিশ এবং মানবাধিকার কমিশনের ভূমিকা সংশ্লিষ্ট বাহিনীর প্রধান বা সরকারের কাছে প্রতিবেদন চাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। নতুন প্রস্তাবিত আইনে মানবাধিকার কমিশনের সদস্য নিয়োগ ও বিধিমালা প্রণয়নে সরকারের প্রভাবও বাড়বে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেন, ‘মানবাধিকার কমিশনের কাজে হস্তক্ষেপের সুযোগ বাদ দিয়ে এবং জোরপূর্বক গুম তদন্তের ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে নতুন সরকারের উচিত প্রস্তাবিত আইন সংশোধন করা।’

তিনি আরও বলেন, ‘জোরপূর্বক গুমের তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের হাতে রাখলে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না এবং এ ধরনের অপরাধ বন্ধে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধও তৈরি হবে না।’

This post was viewed: 5

আরো পড়ুন