বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন। তিনি বলেন, এমন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা হচ্ছে, যেখানে ভবিষ্যতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা পড়তে আসবে।
শনিবার (১৮ জুলাই) দুপুর আড়াইটার দিকে নওগাঁ সদর উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধন ও নবাগত শিক্ষার্থীদের বরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে বেলা সাড়ে ১১টায় শহরের বরুনকান্দি মোড় এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাসে নামফলক উন্মোচনের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তিনি।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “এই বাংলাদেশ হতে হবে এডুকেশনাল হাব। এই বাংলাদেশে সারা পৃথিবী থেকে লোকজন পড়তে আসবে, সেই আদলের ইউনিভার্সিটি আমরা বানাচ্ছি। আমরা জানি বাংলাদেশের ছাত্ররা মেধাবী। বাংলাদেশের প্রতিটি ছাত্র যারা বাইরে পড়তে গিয়েছে, তারা অত্যন্ত সুনাম অর্জন করেছে। এখনও হিসেব করে দেখা যায় ডিস্টিন্ট পায় ওই বাংলাদেশি ছেলেমেয়েরা বিদেশে বসে। তাহলে আমরা কেন পারব না এই এডুকেশন হাব করতে? আমরা কেন পারব না। ৪০ বিলিয়ন ডলার বিজনেস করতে চায় ব্রিটিশ-ইউকে, আমরা কেন পারব না ১০০ বিলিয়ন ডলারের বিজনেস করতে এই বাংলাদেশে? এটাই তো আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ।”
নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই যে নওগাঁ ইউনিভার্সিটির পেছনে ইনভেস্টমেন্ট হবে, ইউ সি কি বিউটিফুল ইউনিভার্সিটি। আমি স্পষ্ট বলতে পারি, এই মঞ্চে যারা বিদেশ যাওয়ার জন্য লেখাপড়া করতেন, এই ধরনের প্রসপেক্টাস দেখে কত না সুন্দর লাগত, কবে আমরা ওই ধরনের ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে পড়ব, ওই পরিবেশে আমরা থাকব, এই চিন্তাগুলো আমাদের কল্পনায় ছিল। আজকে আমরা সেই ইউনিভার্সিটি করতে চাচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমি আবারও বলছি, গ্লোবালি বাংলাদেশি জনসংখ্যা বাড়ছে এবং বাংলাদেশের জনগণ সকলেই এডুকেশনে ইনভেস্টমেন্ট করছে। তাহলে দেখা যাবে আমরা হয়তো এই পৃথিবীতে থাকব না, আজ থেকে ১০-১৫ বছর পরে যেই ভিশন নিয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এডুকেশন সেক্টরকে আপলিফট করার জন্য কাজ করছেন, দ্যাট ডেইজ আর নট টু ফার যে পৃথিবীতে বাংলাদেশ হবে এক নম্বর সেন্টার অফ এক্সিলেন্স এডুকেশন হাব, পৃথিবীর সবাই আসবে এই জায়গায়।”
এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৪ মাস হয়েছে। তাই প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মডারেশন ব্যবস্থায় এখনও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়নি। তিনি বলেন, “আমরা এসেছি চার মাস, আমরা তো দুই বছরের জন্য নতুন মডারেটর নতুন কোশ্চেনের সেট করিনি। আমরা করব। এসএসসি পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে হয়েছে, এইচএসসি পরীক্ষাও সুষ্ঠুভাবে হচ্ছে। অতএব আমরা এই মডারেশন, কোশ্চেন আনসার এগুলো আমরা করব। এটাকে ইন্টারপ্রেট করল, দুই বছর আগে এইচএসসি কোশ্চেন হয়েছে? এইটা নিয়ে ক্যাচাল শুরু হলো। আমি বলেছি দুই বছর লাগে ট্রেনিং করতে।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নিজের বক্তব্য নিয়েও কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা আয়োজন নিয়ে এক পরীক্ষার্থীর সঙ্গে তার কথোপকথনের একটি অংশ ভাইরাল হয়েছে। তিনি বলেন, “সিটি কলেজ থেকে এক মেয়ে বারবার আমার পিওকে কল করছে, স্যারকে একটু কথা বলতে দেন না। তো ভাবলাম বাচ্চা মেয়ে কল করেছে, এই বৃষ্টিতে ভিজে এসে পরীক্ষাটা দিয়েছে, আবার জিজ্ঞেস করল, স্যার পরীক্ষাটা পেছানো যাবে না? বললাম দেখ, পরীক্ষাটা আমরা নেই জনপ্রশাসন, আমাদের অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সকলকে মিলে। এটা হুট করে চেঞ্জ করা যায় না। তবে আমি বিকেল ৫টা পর্যন্ত মেট্রোলজিস্টের সাথে, ওয়েদার ম্যানের সাথে কথা বলেছি, তারা বলেছে কোনো বৃষ্টি হবে না। সেই জন্য আমরা পরীক্ষাটা নিচ্ছি।”
তিনি জানান, পরদিন সকালে কুমিল্লা মহিলা কলেজ কেন্দ্রে জলাবদ্ধতার খবর পাওয়ার পরই সেখানে পরীক্ষা ১ ঘণ্টা পিছিয়ে দেওয়ার এবং অতিরিক্ত আধা ঘণ্টা সময় দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তিনি বলেন, দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে কোনো কেন্দ্রে পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসনের রয়েছে।
পরীক্ষা নিয়ে নিজের মন্তব্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, “আমি যখন সকাল ৯টায় দেখলাম যে কুমিল্লা মহিলা কলেজ বন্যার জলে ভেসে যাচ্ছে অর্থাৎ জলাবদ্ধতা, তখনই আমি ইমিডিয়েটলি বোর্ডকে বললাম ওখানে যান, পরীক্ষা এক ঘণ্টা পিছিয়ে দেন। এক ঘণ্টা পরে পরীক্ষা নিবেন এবং তাদের আধা ঘণ্টা এডিশনাল টাইম দিবেন যেহেতু তারা অনেকটা সময় নষ্ট হয়েছে। অর্থাৎ তিন ঘণ্টার পরীক্ষা সাড়ে তিন ঘণ্টা দিবেন। পরীক্ষা বন্ধ করার দায়িত্ব কিন্তু ওই এলাকার অথরিটির, করে নাই। সারা বাংলাদেশে এটা হয়েছে, কিন্তু একটি সেন্টারে বৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু একটি সেন্টার বাদে আপনারা দ্বিতীয় কোনো সেন্টার দেখাতে পারবেন না।”
তিনি আরও বলেন, “ঢাকা শহরে বৃষ্টি হলে জলবদ্ধতা হয়, এটা একটা কমন টার্মিনোলজি, এটা কোনো নতুন নতুন ব্যাপার না। মেয়েটি আমাকে জিজ্ঞেস করল, স্যার বৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা দিলেন আমাদের? আমি বললাম হ্যাঁ, আমি জানি বৃষ্টি হয়েছে, আমি তোমাদের নিয়ে খুব চিন্তিত। সেই সাথে বললাম, আমার মেয়ে তানজিদা ওর মাথায় একটু বৃষ্টির পানি পড়লেই জ্বর আসে ফার্মের মুরগির মতো। সেজন্য আরও বেশি চিন্তা করতেছি তোমাদের কি জ্বর আসে কিনা, সেই জন্য আমি খুব উদ্বিগ্ন। যেটা হয়েছে তো হয়েছে, জ্বর আসে কি না। কিন্তু কি করা যাবে আমাদের পরীক্ষা তো সকলের সাথে কথা বলে নিতে হয়, সকলেই বলেছে পরীক্ষা নেওয়া যাবে। তো লক্ষ্মী মা, পরীক্ষাটা দিয়ে দাও, মাকে বলো এক কাপ কফি বানিয়ে দিতে, পড়ার টেবিলে বসে যাও।”
নিজের বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “ইউ সি শিক্ষার্থীরা তারা এই ধরনের একটা ন্যারেটিভ, এই ন্যারেটিভটাকে তারা নেগেটিভে নিয়ে গেল। ইউ সি জাতি যদি এইভাবে অন্ধকানা হয়ে যায়, তাহলে তো আমাদের ভবিষ্যৎ ভালো হবে না। কীভাবে আমাকে নিয়ে ট্রোল শুরু হলো। যারা ট্রোল করতে শুরু করল, তারাও পরীক্ষার্থী না। আমি তো ঢাকা শহরের আইডিয়াল কলেজ বা ল্যাবরেটরি স্কুল বা ভিকারুননিসার কাউকে দেখিনি আন্দোলন করতে। কেউ আন্দোলন করতে আসেনি। এইভাবে আন্দোলন করে মিসগাইডেড করে কি একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করল।”
নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাছানাত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ, কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. এ এস এম আমানুল্লাহ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. খান মঈনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল, নওগাঁ-২ আসনের সাংসদ ইঞ্জিনিয়ার এনামুল হক, নওগাঁ-৩ আসনের সাংসদ ফজলে হুদা বাবুল, নওগাঁ-৪ আসনের সাংসদ ইকরামুল বারি টিপু, নওগাঁ-৫ আসনের সাংসদ জাহিদুল ইসলাম ধলু, নওগাঁ-৬ আসনের সাংসদ শেখ মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম, নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বক্তব্য দেন।
উল্লেখ্য, হিসাববিজ্ঞান ও আইন বিভাগে ৪০ জন করে মোট ৮০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।