Skip to main content

Ridge Bangla

ফাস্ট ফ্যাশন: সহজলভ্যতার আড়ালে নীরবে পরিবেশ ধ্বংসের আয়োজন

​শপিং মলের ঝলমলে আলোকসজ্জায় সাজানো সারি সারি আধুনিক পোশাক, কিংবা অনলাইন শপের আকর্ষণীয় সব অফার- অল্প দামে হালের ফ্যাশনে নিজেকে রাঙিয়ে নেওয়ার এই সুযোগ এখন সবার হাতের মুঠোয়। আজ যে নকশাটি প্যারিসের র‍্যাম্পে দেখা যাচ্ছে, মাত্র দুই সপ্তাহ পরেই তা হয়তো আপনার আলমারিতে জায়গা করে নিচ্ছে। এই যে পোশাক শিল্পের এক জাদুকরী দ্রুততা এবং সহজলভ্যতা, একেই বলা হয় ‘ফাস্ট ফ্যাশন’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি কেন একটি পোশাক এত সস্তা? এই সস্তা পোশাকের চড়া মূল্য আসলে কে দিচ্ছে? উত্তরটা হচ্ছে- আমাদের পৃথিবী এবং পরিবেশ।

​ফাস্ট ফ্যাশন কী এবং কেন এটি জনপ্রিয়?

​ফাস্ট ফ্যাশন হলো এমন একটি ব্যবসায়িক মডেল যেখানে উচ্চবিলাসী ফ্যাশন শোগুলোর নকশা দ্রুত এবং সস্তায় গণহারে উৎপাদন করে বাজারে ছাড়া হয়। জারা (ZARA), এইচঅ্যান্ডএম (H&M) কিংবা শেইনের (Shein) মতো ব্র্যান্ডগুলো এই জগতের সম্রাট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসারের ফলে মানুষের মধ্যে প্রতিদিন নতুন নতুন পোশাক পরার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। এক সময় যেখানে বছরে চারবার (ঋতুভেদে) কালেকশন আসত, সেখানে এখন বছরে ৫২টি ‘মাইক্রো-সিজন’ বা কালেকশন বাজারে আসে। ফলে মানুষ একবার বা দুবার পরেই পোশাকটি ফেলে দিচ্ছে এবং নতুন পোশাক কিনছে।

​পানির অপচয় ও নীল বিষের প্রবাহ

​ফ্যাশন শিল্প বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পানি ব্যবহারকারী শিল্প। একটি সাধারণ সুতির টি-শার্ট তৈরি করতে প্রায় ২,৭০০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়, যা একজন মানুষের প্রায় আড়াই বছরের পানীয় জলের সমান। অন্যদিকে, এক জোড়া জিন্স তৈরি করতে লাগে প্রায় ৭,৫০০ লিটার পানি।

​কেবল অপচয় নয়, দূষণও এখানে চরম পর্যায়ে। পোশাকের উজ্জ্বল রঙ তৈরির জন্য ব্যবহৃত হয় ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম এবং পারদের মতো বিষাক্ত রাসায়নিক। এই বর্জ্য পানি সরাসরি নদী বা জলাশয়ে মিশে গিয়ে জলজ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। বাংলাদেশের বুড়িগঙ্গা কিংবা শীতলক্ষ্যার কালো জল এই ফাস্ট ফ্যাশনেরই এক নীরব আর্তনাদ। টেক্সটাইল ডাইং হলো বিশ্বব্যাপী শিল্পজাত জলদূষণের ২০ শতাংশের জন্য দায়ী।

​মাইক্রোপ্লাস্টিক: আমরা কি প্লাস্টিক পরছি?

​ফাস্ট ফ্যাশনের পোশাকগুলো সাধারণত নাইলন, এক্রাইলিক বা পলিয়েস্টার দিয়ে তৈরি হয়। এগুলো আসলে প্লাস্টিকেরই রূপান্তর। এই সিনথেটিক কাপড়গুলো যখন ওয়াশিং মেশিনে ধোয়া হয়, তখন তা থেকে লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক’ বের হয়ে সমুদ্রে মিশে যায়। ধারণা করা হয়, মহাসাগরগুলোতে থাকা ৩৫ শতাংশ প্রাথমিক মাইক্রোপ্লাস্টিক আসে এই পোশাক ধোয়ার মাধ্যমে। এই প্লাস্টিক কণাগুলো মাছের মাধ্যমে আবার আমাদের খাদ্যচক্রেই ফিরে আসছে।

​আবর্জনার পাহাড়: চিলির আতাকামা থেকে ঘানা

​ফাস্ট ফ্যাশনের ফলে পোশাকের আয়ু কমে গেছে। আগে একটি পোশাক কয়েক বছর টিকে থাকত, এখন তা কয়েক মাসেই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৯২ মিলিয়ন টন টেক্সটাইল বর্জ্য উৎপন্ন হয়। এর বড় একটি অংশ ল্যান্ডফিলে জমা হয় অথবা পুড়িয়ে ফেলা হয়।

​সম্প্রতি চিলির আতাকামা মরুভূমিতে ফেলে দেওয়া কয়েক টন পোশাকের পাহাড়ের ছবি বিশ্বকে চমকে দিয়েছে। এছাড়া ঘানার মতো দেশগুলোতে উন্নত বিশ্বের ফেলে দেওয়া পোশাকের স্তূপ পরিবেশের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই কাপড়ের অধিকাংশই সিনথেটিক হওয়ায় তা মাটিতে মিশে যেতে শত শত বছর সময় নেয়।

​জলবায়ু পরিবর্তন ও কার্বন নিঃসরণ

​গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নে ফ্যাশন শিল্পের ভূমিকা আকাশচুম্বী। বিশ্বব্যাপী মোট কার্বন নিঃসরণের ৮ থেকে ১০ শতাংশ আসে এই শিল্প থেকে, যা বিমান এবং জাহাজ চলাচলের মোট নিঃসরণের চেয়েও বেশি। সুদূর চীন বা ভিয়েতনামে উৎপাদিত পোশাক যখন সারা বিশ্বে পরিবহন করা হয়, তখন বিপুল পরিমাণ জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানো হয়।

​মানবিক মূল্য ও নৈতিক সংকট

​পরিবেশের পাশাপাশি ফাস্ট ফ্যাশনের আরেকটি অন্ধকার দিক হলো শ্রমিক শোষণ। সস্তায় উৎপাদন নিশ্চিত করতে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে শ্রমিকদের নামমাত্র মজুরিতে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করানো হয়। ২০১৩ সালের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আমাদের ট্রেন্ডি পোশাকের পেছনে কতটা ঘাম ও রক্ত মিশে আছে।

​উত্তরণের পথ: কনশাস কনজিউমারিজম

​আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তবে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন বাজেটের এক-চতুর্থাংশ দখল করবে এই ফ্যাশন শিল্প। তবে আশার কথা হলো, বিশ্বজুড়ে এখন ‘স্লো ফ্যাশন’ (Slow Fashion) বা টেকসই ফ্যাশনের আন্দোলন শুরু হয়েছে। অনেক স্থানেই মানুষ পোশাক কেনার আগে নিজেকে প্রশ্ন করছে, এটি কি আমি অন্তত ৩০ বার বা একটি ন্যূনতম সময় পর্যন্ত পরতে পারবো? সস্তা পলিয়েস্টারের বদলে টেকসই ও প্রাকৃতিক তন্তুর (যেমন লিনেন বা অর্গানিক কটন) পোশাকের চাহিদা আবারও বাড়তে শুরু করেছে। আমাদের দেশে থ্রিফটিং বা পুরনো ও সেকেন্ড হ্যান্ড পোশাক কেনার চল শুরু হয়েছে। এটি ফাস্ট ফ্যাশনের একটি উপযুক্ত বিকল্প। কোন ব্র্যান্ড পরিবেশ ও শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করে, তা যাচাই করে সেখান থেকে কেনাকাটা করারও সচেতনতা দেখা যাচ্ছে বর্তমানে।

​ফ্যাশন হলো আত্মপ্রকাশের মাধ্যম, কিন্তু সেই প্রকাশ যেন পৃথিবীর ধ্বংসের কারণ না হয়। ফাস্ট ফ্যাশনের মোহময় মায়াজাল ছিন্ন করে আমাদের ফিরতে হবে দায়িত্বশীল অভ্যাসের দিকে। মনে রাখতে হবে, মাত্র ৫০০ টাকার একটি টি-শার্ট হয়তো আপনার পকেটের জন্য সাশ্রয়ী, কিন্তু প্রকৃতির জন্য তা এক অপূরণীয় ক্ষতি। পৃথিবীটা আমাদের সবার, তাই এর সুরক্ষায় আমাদের প্রতিটি ছোট পদক্ষেপ, যেমন একটি পোশাক কম কেনা, হতে পারে এক বিশাল পরিবর্তনের সূচনা।

This post was viewed: 28

আরো পড়ুন