ভারতের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (নিট) নিয়ে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ ঘিরে চলমান বিতর্কের মধ্যে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ছাত্রজীবনের একটি অধ্যায়। প্রায় তিন দশক আগে ওড়িশায় প্রশ্ন ফাঁসের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা এই নেতা এখন একই ধরনের অভিযোগে বিরোধীদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
‘দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর ২০২১ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯৭ সালে ওড়িশায় কংগ্রেস সরকারের আমলে একটি প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে ওঠে। সে সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জানকী বল্লভ পট্টনায়েক। ভুবনেশ্বরে রাজ্য সচিবালয়ের সামনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ শিক্ষার্থীর বিক্ষোভে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান, যিনি তখন অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের (এবিভিপি) ছাত্রনেতা ছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র ১৮ বছর বয়সে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন ধর্মেন্দ্র প্রধান। উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি আরএসএসের ছাত্রসংগঠন এবিভিপির সক্রিয় সংগঠক হিসেবে কাজ করেন। ১৯৯৪ সালের নভেম্বর থেকে ১৯৯৭ সালের মধ্যে দুই দফায় সংগঠনটির সর্বভারতীয় সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।
ওই সময়ের আন্দোলনের স্মৃতিচারণ করে ভুবনেশ্বরের আরএমডি ডিগ্রি কলেজের বর্তমান অধ্যক্ষ ও প্রধানের অনুজ প্রশান্ত রাউত ‘দ্য নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-কে বলেন, ‘আমরা সচিবালয়ের সামনে ওড়িশা সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করেছিলাম। আমাদের সাথে প্রায় ১৫০০ শিক্ষার্থী যোগ দিয়েছিল।’
তিনি জানান, শুরুতে আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। রাউতের ভাষায়, ‘আমরা বেশ আতঙ্কিত ছিলাম। ওই সময় প্রধানকে খুব মারধর করা হয়েছিল। তার শরীরের কয়েকটি হাড়ও ভেঙেছিল।’
রাউত আরও দাবি করেন, সে সময় ছাত্রসংসদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক সহিংসতা ছিল নিয়মিত ঘটনা। তার অভিযোগ, এক নির্বাচনে ধর্মেন্দ্র প্রধানের জয়ের সম্ভাবনা তৈরি হলে ‘জনতা দল’-সমর্থিত ব্যক্তিরা তার ওপর হামলা চালায়। সেই ঘটনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তিনি আজ কেবল ভাগ্যের জোরেই বেঁচে আছেন।’
ছাত্রজীবনের সেই আন্দোলন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডই পরে বিজেপিতে ধর্মেন্দ্র প্রধানের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার ভিত্তি তৈরি করে। ২০২১ সালে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার আগে তিনি পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস এবং দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওড়িশায় বিজেপির সাংগঠনিক বিস্তারে ধর্মেন্দ্র প্রধানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের নির্বাচনে দীর্ঘ দুই দশকের শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিজু জনতা দলকে পরাজিত করে রাজ্যে প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করে বিজেপি।
বর্তমানে নিট পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগকে কেন্দ্র করে সেই ১৯৯৭ সালের আন্দোলনের প্রসঙ্গ আবারও সামনে এসেছে। দিল্লিতে এই ইস্যুতে আন্দোলনরত হাজারো শিক্ষার্থী পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপের ঘটনায় অন্তত ১০০ শিক্ষার্থী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এছাড়া পুলিশের হামলায় আহত ২১ বছর বয়সী এক তরুণী হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলো নিট কেলেঙ্কারির দায় নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ দাবি করছে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেছেন, শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করার পরই এই অনিয়ম নিয়ে নিরপেক্ষ ও কার্যকর আলোচনা সম্ভব।
অন্যদিকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিজেপির সিনিয়র নেতা জেপি নাড্ডা বলেছেন, সরকার বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় প্রস্তুত এবং এ বিষয়ে তাদের গোপন করার মতো কিছু নেই।