অধিকৃত পশ্চিম তীরের নাবলুসের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাররা গ্রামে শত শত ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী হামলা চালিয়ে বাড়িঘরে আগুন, সম্পত্তি ভাঙচুর এবং বাসিন্দাদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। শুক্রবার সংঘটিত এ হামলার পর কয়েকটি পরিবার নিরাপত্তার আশঙ্কায় এলাকা ছেড়ে চলে গেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা। এ তথ্য জানিয়েছে লন্ডনভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই।
স্থানীয় বাসিন্দারা সংবাদমাধ্যমটিকে জানান, হামলার সময় অন্তত ২টি বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুনের ঘন ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে ভুগেছেন কয়েকজন ফিলিস্তিনি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, গ্রামের বাসিন্দারা হামলাকারীদের প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। এতে আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাবলুস এলাকার তেল গ্রামে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনার পর থেকেই বসতি স্থাপনকারীদের ধারাবাহিক হামলা চলছে। সাররা গ্রামে শুক্রবারের ঘটনাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
সাররার বাসিন্দা মোহাম্মদ তুরাবি জানান, সেটলাররা তার বাড়িতে পাথর ও পেট্রোলবোমা নিক্ষেপ করলে তিনি ও তার পরিবার চরম আতঙ্কে পড়েন। এতে তার বাড়ির আঙিনা, একটি গাড়ি এবং ভবনের নিচতলা আগুনে পুড়ে যায়। তবে পরিবারের সবাই নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন।
তিনি বলেন, “সেটলাররা শত শত লোক এসেছিল এবং অত্যন্ত সহিংসভাবে আমাদের বাড়িতে হামলা চালায়। তারা পাথর ও মলোটভ ককটেল বা পেট্রোল বোমা ছুড়ে মারে। এতে বাড়ির আঙিনা ও গাড়িতে আগুন ধরে যায়।”
তুরাবির অভিযোগ, হামলার সময় কাছেই অবস্থান করা ইসরায়েলি সেনারা পুরো ঘটনা দেখলেও হামলাকারীদের থামাতে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।
সাররা পৌরসভার সদস্য আহমদ সাররাবি দাবি করেন, হামলাটি ছিল পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত। তার ভাষ্য, সম্প্রতি বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের বাড়ির কাছে সহজে পৌঁছাতে নতুন মাটির রাস্তা তৈরি করছিল।
তিনি বলেন, “হাভাত গিলাদ আউটপোস্ট থেকে সেটলাররা এসে গ্রামের শুরুর দিকে অবস্থিত বাড়িগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। তারা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এবং বিপুল সংখ্যায় এসে কয়েকটি বাড়ি ও গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।”
আহমদ সাররাবি আরও জানান, গ্রামের বাসিন্দারা শেষ পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তুললে হামলাকারীরা এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয় এবং আরও বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ ঠেকানো সম্ভব হয়।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা উম্মে ওয়াহিদ বলেন, হামলার আশঙ্কায় তিনি প্রতিদিন রাতে সন্তানদের নিয়ে মেয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন। তার দাবি, ইসরায়েলি বুলডোজার মেয়ের বাড়ির পাশের জলপাই গাছ উপড়ে ফেলার পর আশপাশের উপত্যকা থেকে শত শত সেটলার হামলা চালায়।
তিনি বলেন, “এত বিপুল সংখ্যায় তাদের হামলা করতে দেখে আমরা শিশুদের নিরাপদ রাখতে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমরা বেরিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তারা বাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর গ্রামের অন্য বাড়িগুলোতেও হামলা চালিয়ে জানালার কাচ ভাঙচুর করে এবং গাড়িগুলোর ক্ষতি করে।”
তিনি আরও জানান, আগুনের ধোঁয়ায় শ্বাসকষ্টে তার এক নাতি অজ্ঞান হয়ে পড়ে। হামলার পর থেকে গ্রামের শিশুরা চরম আতঙ্কে রয়েছে।
হামলার সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উগ্রপন্থী সেটলার গোষ্ঠীগুলোর উসকানিমূলক প্রচারণাও চলতে থাকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা এবং বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, এসব প্রচারণা আরও সহিংসতা উসকে দিতে পারে এবং বেসামরিক মানুষের ওপর হামলার পরিবেশ তৈরি করছে। তারা ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছে।
ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্সি, সরকার এবং কমিশন অ্যাগেইনস্ট দ্য ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্টস সাম্প্রতিক হামলাগুলোর নিন্দা জানিয়ে বলেছে, স্থানীয় বাসিন্দাদের ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার নীতির অংশ হিসেবে এসব হামলা চালানো হচ্ছে। তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ, দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং সেটলারদের হামলার পুনরাবৃত্তিকে উৎসাহিত করে এমন দায়মুক্তির সংস্কৃতি বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
সাররার মেয়র নাআমান আবদুল্লাহ বলেন, গ্রামের পশ্চিমাংশে যাওয়া সম্ভব নয়, কারণ এলাকাটি অসলো চুক্তি অনুযায়ী এরিয়া-সি হিসেবে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা যে বাস্তবতার মধ্যে বাস করছি, তা আমাদের আশপাশের গ্রামের অবস্থার মতোই। শুক্রবার সকালে টেল গ্রামে চার ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার পর সেটলাররা অন্য গ্রামগুলোতে গিয়ে তাদের বাড়িঘরে হামলা চালায়।”
তিনি আরও বলেন, “এরপর তারা আমাদের গ্রামে আসে, জমি বুলডোজার দিয়ে সমতল করে, গাছপালা উপড়ে ফেলে এবং বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়।”
নাআমান আবদুল্লাহর ভাষ্য, ধারাবাহিক সেটলার হামলা এবং ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর আরোপিত বিধিনিষেধের কারণে এলাকাবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি জানান, সামরিক গেট দিয়ে প্রায়ই সড়ক বন্ধ করে দেওয়ায় বাসিন্দাদের নিজ বাড়িতে পৌঁছাতে কাঁচা ও দুর্গম পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে।