যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সম্পর্কের নেপথ্যের এক উত্তপ্ত ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে নতুন একটি বইয়ে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, গাজা যুদ্ধ বন্ধের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার সময় নেতানিয়াহুর কড়া সমালোচনা করেছিলেন ট্রাম্প। এমনকি তিনি বলেছিলেন, ‘সব ইহুদিই তোমার (নেতানিয়াহুর) ওপর বিরক্ত’।
ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সংবেদনশীল আলোচনা নিয়ে লেখা বইটি প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের দুই সাংবাদিকের লেখা বইটিতে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি দূত স্টিভ উইটকফ এবং নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক ফোনালাপের সময় ওই মন্তব্য করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলোচনার বিষয় ছিল ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ট্রাম্প ঘোষিত ২০ দফার গাজা শান্তি পরিকল্পনা। প্রায় ২ বছর ধরে চলা ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) প্রকাশিত ‘রেজিম চেঞ্জ’ বইয়ে বলা হয়েছে, কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের লক্ষ্যবস্তুতে ইসরায়েলের বিমান হামলার পর ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়।
ওই হামলায় কাতারের নিরাপত্তা বাহিনীর ১ সদস্য নিহত হন। বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। বইটির দাবি অনুযায়ী, একপর্যায়ে কুশনার তার এক ঘনিষ্ঠ সহযোগীকে বলেছিলেন, ‘আমি আর থাকছি না। ইসরায়েলিরা পাগল হয়ে গেছে।’
তবে পরে তিনি পরিস্থিতিকে ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখেন, যাতে গাজায় যুদ্ধ বন্ধ করা যায়।
এরপর একটি শান্তি পরিকল্পনার খসড়া তৈরি করেন কুশনার। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানির সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। পরবর্তীতে ট্রাম্প সেই পরিকল্পনা নেতানিয়াহুর সামনে উপস্থাপন করেন।
বইটিতে দাবি করা হয়েছে, ফোনালাপে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে বলেন, ‘সবাই তোমার ওপর বিরক্ত, বিবি। সব ইহুদিই তোমার ওপর বিরক্ত। এই ফোনালাপে থাকা দুই ইহুদিও তোমার ওপর বিরক্ত।’
ধারণা করা হচ্ছে, ওই সময় ফোনালাপে থাকা জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফকে ইঙ্গিত করেই এমন মন্তব্য করেছিলেন ট্রাম্প। কারণ তারা দুজনই ইহুদি।
বইয়ের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প আরও বলেন, ‘তুমি এখন আর পিছু হটতে পারবে না। ইসরায়েলের সবচেয়ে ভালো বন্ধু আমি। সবাই তোমাকে ঘৃণা করে, কিন্তু আমি তোমার পাশে থেকেছি। এটি ইসরায়েলের জন্য দারুণ একটি চুক্তি।’
ওই ফোনালাপের ২ দিন পর ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু। পরে নভেম্বরে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদও এতে সমর্থন জানায়।
‘রেজিম চেঞ্জ’ বইয়ে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর এই কথোপকথনের পাশাপাশি আরও কয়েকটি উত্তপ্ত ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক ম্যাগি হ্যাবারম্যান ও জনাথন সোয়ানের লেখা বইটিতে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের অভ্যন্তরীণ নানা ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে।
এতে ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের বিভিন্ন সংবেদনশীল আলোচনার বিষয়ও স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে এপস্টেইন ফাইলস এবং ইরান যুদ্ধ-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনার তথ্যও উঠে এসেছে।
বইটির কিছু অংশ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমের কথোপকথনের রেকর্ড ফাঁস হয়ে থাকতে পারে বলে কয়েকজন কর্মকর্তা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
বইটিতে আরও দাবি করা হয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলার আগে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মধ্যে সিচুয়েশন রুমে আলোচনা হয়েছিল। সেখানে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পকে জানান, ইরানে সরকার পরিবর্তনের সময় এসেছে।
তবে পরবর্তী আরেক বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নেতানিয়াহুর ওই মূল্যায়নকে ‘সম্পূর্ণ বাজে কথা’ বলে মন্তব্য করেছিলেন বলে বইটিতে দাবি করা হয়েছে।
এসব ঘটনার বিস্তারিত প্রকাশের পর ট্রাম্প ‘ভীষণ ক্ষুব্ধ’ হয়েছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।