অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় দেশের টেলিভিশন টকশো থেকে শুরু করে চায়ের দোকান- সব স্থানেই যে আলোচনাটি সবচেয়ে বেশি ঝড় তুলেছিল, সেটি ছিল ‘মব-লিঞ্চিং’। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নতুন সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করার পর মব-লিঞ্চিংয়ের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত হয়েছে আরও একটি বিষয়, সেটি হচ্ছে ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ড।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে কন্যাশিশুদের ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা নতুন করে সামাজিক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক এমন নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি শুধু আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নই নয়, বরং সমাজের নৈতিক ও নিরাপত্তাগত কাঠামো নিয়েও গভীর প্রশ্ন তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধের ধারাবাহিকতা নয়, বরং বহুমাত্রিক সামাজিক সংকটের এক নির্মম বহিঃপ্রকাশ।
সম্প্রতি রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা ঘটে। এছাড়া চট্টগ্রামের খুলশী এলাকায় চার বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে স্থানীয় জনতা অভিযুক্তকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছে। এই ধরনের ঘটনা এখন প্রায় প্রতিদিনই দেখা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রতিদিনই আসছে শিশু ধর্ষণের খবর।
আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, গত ১ জানুয়ারি থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশব্যাপী ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১১৮ শিশু। একই সময়ে ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ৪৬ শিশু। এদের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ১৪ জন শিশুকে এবং ধর্ষণচেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে হত্যা করা হয়েছে আরও তিন শিশুকে। ধর্ষণের শিকার হওয়া দুই শিশু আত্মহত্যা করেছে।
এদিকে চলতি মাসের প্রথম ২০ দিনেই, অর্থাৎ ১ থেকে ২০ মে পর্যন্ত, ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৪ জন শিশু। এছাড়া ধর্ষণচেষ্টার শিকার হয়েছে ১২ জন এবং ধর্ষণের ঘটনায় হত্যা করা হয়েছে পাঁচজনকে। পাশাপাশি বিভিন্ন ঘটনায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত খুন হয়েছে ১১৫ শিশু।
বাংলাদেশ চাইল্ড হেল্পলাইনের তথ্য বলছে, জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শিশু যৌন হয়রানি সংক্রান্ত ৫ হাজার ৮৫৩টি কল এসেছে, যার মধ্যে ৫২০টি সরাসরি ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
দেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কয়েকটি আলোচিত ধর্ষণের ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপরাধীরা ছিলেন ধর্ষণের শিকার হওয়া শিশুদের পূর্বপরিচিত প্রতিবেশী, আত্মীয় কিংবা ঘনিষ্ঠজন। এ বাস্তবতা শিশুদের নিরাপত্তাকে আরও জটিল করে তুলেছে। কারণ দূরের বা বাইরের অচেনা ব্যক্তিরা নয়, অনেক সময় ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের পরিচিত মানুষই হয়ে উঠছে হুমকি।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। সামাজিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তির বিস্তার, অনলাইনে বিকৃত কনটেন্টের সহজলভ্যতা, নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি এবং অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি এ প্রবণতাকে উসকে দিচ্ছে। পাশাপাশি প্রযুক্তির অপব্যবহার অপরাধপ্রবণতার মনস্তত্ত্বকে আরও জটিল করে তুলছে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুরা তুলনামূলক দুর্বল ও সহজ টার্গেট হওয়ায় অপরাধীরা তাদের সহজেই বেছে নিতে পারছে। সমাজে মানবিক মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়া এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক মানসিকতার বিস্তারও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। একই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি অন্য অপরাধীদের মধ্যেও অনুকরণ প্রবণতা তৈরি করতে পারে।
শুধু শিশুরাই নয়, সমাজে এখন উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে নারীদের ক্ষেত্রেও। বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকার পাতা খুললেই এসব বিষয়ে আশঙ্কাজনক নানা খবর পাওয়া যাচ্ছে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ৫ হাজার ৯৫৮টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ বলছে, গত বছর ২ হাজার ৮০৮ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে কন্যাশিশুদের সংখ্যা ছিল ১ হাজার ২৩৪ জন এবং নারী ১ হাজার ৫৭৪ জন। তাদের তথ্যমতে, ৫৪৩ জন কন্যাশিশু ও ২৪৩ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশে নারী ও শিশু সুরক্ষায় আইনগত কাঠামোর ঘাটতি নেই, মূল সমস্যা প্রয়োগে। দুর্বল তদন্ত, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং কিছু ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করাকে কঠিন করে তুলছে। ফলে অপরাধীদের মধ্যে দায়মুক্তির ধারণা তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র এবং সমাজের সমন্বিত উদ্যোগ। নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত বিচার এবং কার্যকর শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাই হতে পারে এ সংকট মোকাবিলার প্রধান উপায়।