বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এই সংখ্যা বেড়ে ১ কোটি ৮১ লাখে পৌঁছাতে পারে বলে জানিয়েছে ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশনের সর্বশেষ বিশ্লেষণ।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) প্রকাশিত তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা বিষয়ক এই বিশ্লেষণ প্রতিবেদন ঢাকায় আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় প্রকাশ করা হয়। খাদ্য মন্ত্রণালয়, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এবং বেসরকারি সংস্থা অ্যাকশন অ্যাগেইনস্ট হাঙ্গার, সেভ দ্য চিলড্রেন ও গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইমপ্রুভড নিউট্রিশন যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের মে থেকে আগস্ট সময়ে বিশ্লেষণের আওতায় থাকা জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষ উচ্চমাত্রার তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৮৩ হাজার মানুষ জরুরি অবস্থার মুখোমুখি।
বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর সময়ে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। ওই সময় তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। একই সময়ে জরুরি অবস্থায় থাকা মানুষের সংখ্যা বেড়ে প্রায় ৭ লাখ ৮৭ হাজার হতে পারে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের ফুড প্ল্যানিং অ্যান্ড মনিটরিং ইউনিটের নেতৃত্বে আয়োজিত কর্মশালায় সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
প্রতিবেদনে পার্বত্য চট্টগ্রাম, হাওর অঞ্চল, কয়েকটি উপকূলীয় জেলা এবং কক্সবাজার ও ভাসানচরে আশ্রয় নেওয়া বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মধ্যে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সর্বোচ্চ মাত্রা চিহ্নিত করা হয়েছে।
খাদ্য প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বলেন, ‘খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মানুষের সক্ষমতা বাড়াতে নীতিনির্ধারণ ও বিনিয়োগে তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবহারে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
তিনি আরও বলেন, ‘আইপিসির এই ফলাফল আমাদের আরও কার্যকরভাবে সম্পদ বরাদ্দ করতে এবং জলবায়ু ও অর্থনৈতিক চাপের মুখে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তার যৌথ প্রচেষ্টা জোরদার করতে সহায়তা করবে।’
প্রতিবেদনে খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির পেছনে প্রতিকূল জলবায়ু, বন্যা, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জকে দায়ী করা হয়েছে। এসব কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আরও অনেক মানুষের পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য কেনার সক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
কর্মশালায় প্রতিবেদনের বিভিন্ন সুপারিশ নিয়েও আলোচনা হয়। এর মধ্যে ছিল জীবনরক্ষাকারী খাদ্য সহায়তা বৃদ্ধি, দুর্যোগ-সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি জোরদার, জীবিকা পুনরুদ্ধারে সহায়তা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি ও আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানো।
বাংলাদেশে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিনিধি ড. জিয়াওকুন শি বলেন, ‘প্রতিবেদনের ফলাফল দেখায়, বিশেষ করে বারবার বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য জলবায়ুজনিত দুর্যোগে আক্রান্ত এলাকাগুলোতে কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থার সহনশীলতা বাড়ানো এখন অত্যন্ত জরুরি।’
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রতিনিধি ও বাংলাদেশে কান্ট্রি ডিরেক্টর কোকো উশিয়ামা বলেন, আইপিসি বিশ্লেষণের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হলো কোনো সংকটের প্রভাব গভীর হওয়ার আগেই খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে শনাক্ত করা।
তিনি বলেন, বর্তমানে বিশ্লেষণে চিহ্নিত অনেক এলাকাই ভারী বৃষ্টিপাত ও বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে, বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে। সেখানে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি আগাম পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং সরকারের দুর্যোগ-সংবেদনশীল সামাজিক সুরক্ষা কার্যক্রমে সহায়তা দিচ্ছে।
প্রতিবেদনের শেষে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও এর অংশীদাররা তাৎক্ষণিক খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা মোকাবিলা, ভবিষ্যতের দুর্যোগ ও সংকট মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সবার জন্য টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।