দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আজ জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে বাজেটের আকারের পাশাপাশি ঘাটতির পরিমাণও নতুন রেকর্ড গড়তে যাচ্ছে।
অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের জন্য বাজেট ঘাটতি নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এ ঘাটতি পূরণে ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪ শতাংশ সমপরিমাণ এই ঘাটতি অর্থনীতির জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে।
বাজেট বক্তৃতার সম্ভাব্য প্রতিপাদ্য হিসেবে ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: সবার জন্য উন্নয়ন’ অথবা ‘অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির নতুন বাংলাদেশ’ শিরোনাম বিবেচনায় রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, ডি-রেগুলেশন, সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশ এবং দীর্ঘমেয়াদে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করা।
প্রস্তাবিত বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ব্যয় পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে সরকারের ঘোষিত ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচি।
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট বক্তৃতায় বিগত সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও মূল্যায়ন তুলে ধরা হতে পারে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দশকে বৈদেশিক ও অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে সুদ পরিশোধ ব্যয়ও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয়েছে।
আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৭ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ওপর প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা আদায়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন অত্যন্ত কঠিন হবে।
এদিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয়ের একটি বড় অংশ দেশীয় উৎস থেকে এবং বাকিটা বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তার মাধ্যমে সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকার আশা করছে, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে এ অর্থ ব্যয় হবে।
প্রস্তাবিত বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে বেশ কিছু কর ও শুল্ক ছাড়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ধান, চাল, গম, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, চিনি, ভোজ্যতেল, মাছ ও কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে কর কমানোর প্রস্তাব এসেছে। শিশুখাদ্যের কাঁচামাল, মসলা ও খেজুর আমদানিতেও শুল্ক ছাড় দেওয়া হতে পারে।
স্বাস্থ্য খাতে কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টার, ক্যানসার চিকিৎসার কাঁচামাল, হার্টের রিং ও চোখের লেন্সসহ বিভিন্ন চিকিৎসাসামগ্রীতে কর রেয়াতের প্রস্তাব রয়েছে। ফলে চিকিৎসা ব্যয় কিছুটা কমতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তি খাতেও বড় ধরনের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। মোবাইল ফোন উৎপাদনের কাঁচামাল, কম্পিউটার ও বিভিন্ন ডিজিটাল যন্ত্রপাতির ওপর কর কমানোর প্রস্তাব রয়েছে। নতুন সিমের ওপর নির্ধারিত ভ্যাট কাঠামো পরিবর্তনের ফলে গ্রাহকদের খরচও কমতে পারে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কর হ্রাসের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি কর অব্যাহতির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক যানবাহন ও সংশ্লিষ্ট শিল্পে কর রেয়াত দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ ও বিলাসবহুল পণ্যে করভার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিগারেটের সব স্তরে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া বিলাসবহুল গাড়ি, কাজুবাদামসহ কিছু আমদানিনির্ভর পণ্যের ওপরও অতিরিক্ত কর আরোপের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কর-শুল্ক ছাড় বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে শুধু কর সুবিধা নয়, ব্যাংক ঋণের সুদের হার, জ্বালানি সরবরাহ, প্রশাসনিক জটিলতা হ্রাস এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
ফলে রেকর্ড আকারের এই বাজেট বাস্তবায়ন এবং রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য অর্জনই আগামী অর্থবছরে সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।