জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি দাবি করেছেন, তিনি প্রতিদিন গড়ে মাত্র তিন ঘণ্টা ঘুমান। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া তার একটি পোস্টকে ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে পর্যাপ্ত ঘুম, কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত জীবনের ভারসাম্য এবং অতিরিক্ত কাজের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
গত বুধবার (২২ জুলাই) প্রকাশিত দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তাকাইচি জানান, দীর্ঘদিন পর এবারই প্রথম তিনি টানা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পেয়েছেন।
সোমবার ‘সমুদ্র দিবস’ উপলক্ষে জাপানে সরকারি ছুটি থাকলেও তিনি বিশ্রাম নেননি। বরং নীতিনির্ধারণ-সংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা করেছেন এবং জমে থাকা হাজারো ই-মেইলের জবাব দিয়েছেন। অবসরের স্বল্প সময়ে নিজের অন্তর্বাস ইস্ত্রি করা, ছেঁড়া স্কার্ট সেলাই করা এবং জ্যাকেটের ঢিলা বোতাম লাগানোর কাজও করেছেন বলে পোস্টে উল্লেখ করেন তিনি।
তাকাইচির ওই পোস্ট ইতোমধ্যে তিন কোটির বেশি বার দেখা হয়েছে। তবে নিজেকে পরিশ্রমী ও সাধারণ জীবনযাপনকারী হিসেবে তুলে ধরার এই প্রচেষ্টা উল্টো সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিরোধী দলের আইনপ্রণেতা তোরু কুনিশিগে বলেন, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মানুষের বিচার-বিবেচনার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তার মতে, এতে জাতীয় সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
আরেক বিরোধী নেতা হিরোইউকি কোনিশি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব প্রতিটি নথির খুঁটিনাটি পড়া নয়। বরং রাষ্ট্রের নীতিগত দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করাই তার প্রধান কাজ।
জনতাবাদী রক্ষণশীল দলের নেতা ইউইচিরো তামাকি বলেন, সানায়ে তাকাইচি নিঃসন্দেহে পরিশ্রমী। তবে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়াও একজন প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
টোকিওর ন্যাশনাল গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের অধ্যাপক ইয়োকো ইওয়ামা বলেন, আগের অনেক প্রধানমন্ত্রী গৃহস্থালির কাজে স্ত্রীর ওপর নির্ভর করলেও তাকাইচিকে নিজের ব্যক্তিগত কাজ নিজেকেই সামলাতে হচ্ছে।
নিক্কেই পত্রিকায় প্রকাশিত এক লেখায় তিনি মত দেন, প্রধানমন্ত্রীর জন্য এমন সহায়ক ব্যবস্থা থাকা উচিত, যাতে ব্যক্তিগত গৃহস্থালির দায়িত্বে সময় নষ্ট না করে তিনি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারেন। এতে সমাজে নারীর অগ্রগতিও ত্বরান্বিত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বর্তমানে সংসদের গ্রীষ্মকালীন বিরতির আগে গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করানো, দুর্বল হয়ে পড়া ইয়েন, অর্থনৈতিক চাপ এবং জনপ্রিয়তা হ্রাসের মতো নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যস্ত রয়েছেন সানায়ে তাকাইচি।
জাপান দীর্ঘ কর্মঘণ্টার সংস্কৃতির জন্য পরিচিত। দেশটিতে অনেক কর্মী প্রতিদিন ১২ ঘণ্টারও বেশি সময় কাজ করেন এবং অতিরিক্ত সময় অফিসে থাকা অনেক ক্ষেত্রে কর্মনিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অতিরিক্ত কাজের কারণে মৃত্যুর ঘটনা, যা ‘কারোশি’ নামে পরিচিত, বারবার আলোচনায় এসেছে। ২০১৬ সালে একটি বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠানের এক তরুণ কর্মী মাসে ১০০ ঘণ্টার বেশি অতিরিক্ত কাজের পর আত্মহত্যা করলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এরপর সরকার অতিরিক্ত কাজের সর্বোচ্চ সীমা মাসে ৪৫ ঘণ্টা নির্ধারণ করে।
নব্বইয়ের দশক থেকে রাজনীতিতে সক্রিয় তাকাইচি দীর্ঘদিন ধরেই কঠোর কর্মনিষ্ঠাকে নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরে আসছেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, “আমি কাজ করব, কাজ করব, কাজ করব, কাজ করব এবং কাজ করব।”