তুরাগ নদ থেকে দুই দিনে উদ্ধার হওয়া তিনটি মরদেহের সঙ্গে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ বা এর সহযোগী সংগঠনের কোনো মিছিলের সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছে পুলিশ। রোববার পৃথক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানায় ঢাকা মহানগর পুলিশ এবং ঢাকা জেলা পুলিশ।
প্রথমে বিকেল সাড়ে ৩টায় পুরান ঢাকায় নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন। তিনি বলেন, তুরাগ নদে সাতটি মরদেহ উদ্ধারের দাবি এবং এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে প্রচার করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণ গুজব। তাঁর ভাষ্য, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো মিছিল থেকে নদীতে পড়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একটি স্বার্থান্বেষী মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
পুলিশ সুপার জানান, গত শুক্রবার আশুলিয়া থানার গরুহাটা ঘাট থেকে একটি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মরদেহের পকেটে থাকা মোবাইল ফোনের সূত্র ধরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নিহতের ভাই সালাহউদ্দিন এসে লাশ শনাক্ত করেন। নিহত সুমন (১৭) রাজধানীর তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকায় পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন।
অপমৃত্যুর মামলার তথ্য অনুযায়ী, ২২ জুন বন্ধুদের সঙ্গে পিকনিকে গিয়ে নৌভ্রমণ শেষে ধৌউর ব্রিজঘাটে নৌকা থেকে নামার সময় সুমন অসাবধানতাবশত নদীতে পড়ে যান। সাঁতার না জানায় তিনি নিখোঁজ হন। পরে ২৬ জুন রাতে নদী থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
আরেক ঘটনায় গত বুধবার সাভারের রয়্যাল সিটি-সংলগ্ন তুরাগ নদে গোসল করতে নেমে রনি মোল্লা (৩৫) নামে এক ব্যক্তি ডুবে যান। স্থানীয়রা তাঁকে উদ্ধার করে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন দেন। পরে শাহআলী থানা-পুলিশ ও নৌ পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে।
রনির বাবা কফিল উদ্দিন মোল্লা বলেন, তাঁর ছেলে দিয়াবাড়ির একটি রেস্টুরেন্টে কাজ করতেন এবং ঘটনার দিন বাসায় ফেরার পথে পরিচিত একজনের সঙ্গে গোসল করতে নেমেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল না।’
একই দিনে তুরাগ নদ থেকে আরিফ হাসান নামে আরও একজনের মরদেহ উদ্ধার করে নৌ পুলিশ। আরিফ তুরাগ থানার রানাভোলা এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। এ ঘটনায় তাঁর চাচা মো. আরশাদুল ইসলাম বাদী হয়ে দারুসসালাম থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন।
আরিফের চাচা জানান, ২২ জুন সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর বিকেলে মায়ের সঙ্গে তাঁর শেষবার মোবাইলে কথা হয়। এরপর তিনি নিখোঁজ ছিলেন। গত বুধবার তুরাগ নদ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা দাবি করেন, মিছিল করতে গিয়ে নৌকায় থাকা কয়েকজন নেতা-কর্মী পুলিশের ধাওয়া খেয়ে নদীতে পড়ে নিহত হয়েছেন। এ দাবির পক্ষে বিভিন্ন ফটোকার্ডও ছড়িয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকেও একই ধরনের তথ্য প্রচার করা হয়।
তবে পুলিশ সদর দপ্তর শনিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব দাবি নাকচ করে। এর ধারাবাহিকতায় রোববার পৃথক সংবাদ সম্মেলনে একই অবস্থান তুলে ধরে ঢাকা মহানগর পুলিশ ও ঢাকা জেলা পুলিশ।
পুলিশ সুপার শামীমা পারভীন বলেন, আওয়ামী লীগের মিছিল থেকে সাতজন নিখোঁজ হওয়ার কোনো তথ্য জেলা পুলিশের কাছে নেই। তিনি জানান, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপপ্রচার চালানো ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে। পাশাপাশি তিনি জানান, গত মার্চ ও মে মাসে ঢাকা জেলায় মোট ১৭০টি অপমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মরদেহ অজ্ঞাত ছিল।
অন্যদিকে বিকেল সাড়ে ৫টায় ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার ফারুক হোসেন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুরাগ নদ থেকে একাধিক মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে যেসব তথ্য, ছবি ও ভিডিও ছড়ানো হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে ডিএমপির উত্তরা বিভাগের আওতাধীন তুরাগ থানার কোনো ঘটনার মিল পাওয়া যায়নি। তিনি জানান, এ ধরনের ধারাবাহিক মরদেহ উদ্ধার, হত্যাকাণ্ড কিংবা এ-সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ, সাধারণ ডায়েরি বা মামলা তুরাগ থানায় হয়নি।
তিনি সবাইকে তথ্য যাচাই ছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কোনো তথ্য বিশ্বাস বা শেয়ার না করার আহ্বান জানান। তাঁর ভাষ্য, গুজব ও বিভ্রান্তিকর তথ্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে। এ ধরনের অপপ্রচার শনাক্তে পুলিশের সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে বলেও জানান তিনি।