Skip to main content

Ridge Bangla

তীব্র গ্যাসসংকটে উৎপাদন ব্যাহত, বন্ধের মুখে দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ শিল্পকারখানা

দেশজুড়ে তীব্র গ্যাসসংকটের কারণে প্রায় ৪০ শতাংশ শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে বা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে আরও কারখানা বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা। বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পে উৎপাদন ধরে রাখা এবং সময়মতো রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

শিল্প উদ্যোক্তারা জানান, দেশে দীর্ঘদিন ধরেই গ্যাসসংকট থাকলেও গত এক সপ্তাহে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়েছে। অনেক কারখানা অর্ধেক সক্ষমতায়ও চালানো যাচ্ছে না। কেউ কেউ উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন, আবার অনেকে পূর্ণ সময় কারখানা চালাতে পারছেন না। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং রপ্তানি আয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

তাদের মতে, শিল্প খাত টিকিয়ে রাখতে গ্যাস ও বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় অভ্যন্তরীণ উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি রপ্তানি আয়েও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। এর ফলে রাজধানীসহ সারা দেশে আবাসিক, শিল্প, বাণিজ্যিক, সিএনজি ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি এখনো পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব হয়নি। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের দল ত্রুটি শনাক্ত ও মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। তবে তাঁরা আমাদের এখনো কবে নাগাদ সমস্যার সমাধান হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময় জানাতে পারেননি। তবে কাজ চলছে, সমস্যাটি সমাধান হতে আরো কিছুটা সময় লাগতে পারে।’

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

স্বাভাবিক সময়ে আমদানিকৃত এলএনজি থেকে দৈনিক ৯৫০ থেকে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও একটি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির কারণে তা প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। একই সময়ে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও ধারাবাহিকভাবে কমেছে। গত ছয় বছরে স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুট কমে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমেছে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘বর্তমান গ্যাসসংকট দ্রুত কাটিয়ে ওঠার মতো পরিস্থিতি দেখছি না। আগের সরকার শিল্প-কারখানার গ্যাস কমিয়ে সার উৎপাদনে অগ্রাধিকার দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার নেতিবাচক প্রভাব এখন শিল্প খাতকে বহন করতে হচ্ছে। অন্যদিকে বর্তমান সরকারও আবাসিক ও বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, ফলে শিল্প খাত আবারও উপেক্ষিত হচ্ছে। অথচ শিল্প-কারখানা সচল না থাকলে সরকারের ভ্যাট ও কর আদায়ও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শিল্পমালিকরা নিয়মিত সরকারের সঙ্গে বৈঠক করছেন এবং জ্বালানিমন্ত্রীর সঙ্গেও শিগগিরই আলোচনা করবেন। তবে সরকারের পক্ষ থেকে গ্যাসের সীমিত সরবরাহের কথাই জানানো হচ্ছে। গ্যাসসংকটে আমার নিজের শিল্পগ্রুপের প্রায় ৯০ শতাংশ কারখানা বন্ধ রয়েছে। টেক্সটাইল মিল আগেই বন্ধ করতে হয়েছে। এখন কাগজ, বোর্ড, প্যালেটসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক কারখানাও বন্ধ রয়েছে।’

শওকত আজিজ রাসেলের ভাষ্য, দেশের সব অঞ্চলে সংকটের মাত্রা এক নয়। চট্টগ্রাম ও মেঘনা এলাকায় তুলনামূলক গ্যাস সরবরাহ থাকলেও সার্বিকভাবে প্রায় ৪০ শতাংশ শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত বা বন্ধ রয়েছে। দীর্ঘদিন এমন অবস্থা চললে রপ্তানি আদেশ বাস্তবায়ন ব্যাহত হবে এবং কার্যকর মূলধন দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম মাসুদ বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে গ্যাসনির্ভর স্টিল মিলগুলো কার্যত উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। অবস্থা খুবই খারাপ, গ্যাসের কোনো চাপই নেই। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে অনেক শিল্প-কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যেতে পারে।’

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন ডিভিশন) প্রকৌশলী কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান বলেন, ‘পরিস্থিতি দিন দিন আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে। প্রতিদিনই গ্যাস সরবরাহের সংকট কিছুটা করে বাড়ছে। বর্তমানে অনেক শিল্প-কারখানায় গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে উৎপাদন ব্যাপক হারে ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও কোথাও কারখানা কার্যত বন্ধ হওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছে। পরিস্থিতি যদি এভাবেই চলতে থাকে, তাহলে গ্যাসের চাপ আরো কমতে থাকবে।’

তিনি জানান, নরসিংদীসহ অনেক এলাকায় গ্যাসের চাপ প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলেও আগের ৭০ থেকে ৮০ পিএসআইয়ের পরিবর্তে এখন মাত্র ২০ থেকে ২৫ পিএসআই চাপ পাওয়া যাচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহও প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমিয়ে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নামানো হয়েছে।

সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মইনুল ইসলাম বলেন, ‘দেশের শিল্পাঞ্চলভেদে গ্যাসসংকটের তীব্রতা ভিন্ন। ভোলা ও হবিগঞ্জে তেমন সংকট না হলেও নরসিংদী-নারায়ণগঞ্জ শিল্পবেল্টে উৎপাদনে সমস্যা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি গাজীপুর ও মানিকগঞ্জ শিল্পাঞ্চলে। একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় শিল্পে গ্যাসসংকট আরও তীব্র হয়েছে। বর্তমানে আবাসিক খাতেও গ্যাসের ঘাটতি প্রকট।’

তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে ব্যবসায়ীরা একদিকে গ্যাসসংকট, অন্যদিকে বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হলে শিল্প, বিনিয়োগ ও রপ্তানি সব ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব বাড়বে।’

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে গেলে দেশে এমন গ্যাসসংকট তৈরি হবে, এটি আগে থেকেই জানা ছিল। কারণ দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো অতিরিক্ত সক্ষমতা বা রিজার্ভ নেই। ফলে এমন পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক কোনো বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও নেই। আমাদের যদি অতিরিক্ত সক্ষমতা থাকত, তাহলে সেটি ব্যবহার করা যেত। কিন্তু তৃতীয় টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনাও বাতিল করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘ভবিষ্যতেও এমন ঝুঁকি থেকে যাবে। শুধু ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নয়, দেশের বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর যেকোনো একটিতে বড় সমস্যা দেখা দিলেও শত শত মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদন এক মুহূর্তে কমে যেতে পারে। আমরা এখন খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছি।’

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন) মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, বর্তমান সংকটের তাৎক্ষণিক কারণ এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি হলেও দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এ নির্ভরতা কমাতে সরকার পর্যায়ক্রমে ১০০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনা নিয়েছে। ইতোমধ্যে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ ও সুনামগঞ্জে নতুন গ্যাসকূপ খননের একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।

গাজীপুর, সাভার ও নরসিংদীর শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদন ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। কালিয়াকৈর, কোনাবাড়ী, টঙ্গী, শ্রীপুর, মৌচাক, চন্দ্রা ও বোর্ডবাজার এলাকার বহু কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাস না থাকায় উৎপাদন কমেছে, শিপমেন্ট বিলম্বিত হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে।

কালিয়াকৈরের গোমতি টেক্সটাইলে অনুমোদিত ৫ পিএসআইয়ের বিপরীতে বর্তমানে মাত্র ১ পিএসআই গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এতে উৎপাদন ৬০ শতাংশ কমে গেছে। একইভাবে সাদমা ফ্যাশনওয়্যারে প্রয়োজনীয় ১০ পিএসআইয়ের বদলে ১ থেকে ২ পিএসআই গ্যাস পাওয়ায় দৈনিক উৎপাদন ৬০ টন থেকে নেমে ১০ টনে এসেছে। গ্যাসসংকটের প্রভাব সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক এলাকাতেও পড়েছে।

দেশের বস্ত্রশিল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ চাহিদা পূরণকারী নরসিংদীর সাড়ে ৩ শতাধিক গ্যাসনির্ভর কারখানাও সংকটে পড়েছে। এমআর টেক্স লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মোহাম্মদ রুমন বলেন, ‘গ্যাসসংকটে গত মঙ্গলবার থেকে কারখানার ডায়িং, ফিনিশিং, নিটিং, ডিজিটালসহ সব ইউনিট পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। কবে নাগাদ গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হবে তা তিতাস কর্তৃপক্ষও জানাতে পারছে না।’

সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলেও গ্যাসের চাপ স্বাভাবিক ১৫ পিএসআইয়ের পরিবর্তে ২ থেকে ৩ পিএসআইয়ে নেমে আসায় উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমে গেছে। ব্রয়লার, জেনারেটর ও উৎপাদন যন্ত্রপাতি স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। পাশাপাশি সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক যানবাহনে ১০০ থেকে ২০০ টাকার বেশি গ্যাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

শিল্পমালিকদের মতে, সাভার-আশুলিয়ায় প্রায় ১ হাজার ২০০ কারখানা রয়েছে। দীর্ঘ সময় সংকট চললে ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের কারণে উৎপাদন ব্যয় আরও বৃদ্ধি পাবে।

This post was viewed: 4

আরো পড়ুন