Ridge Bangla

জ্বালানি তেল সংকটে জনদুর্ভোগ চরমে, নিত্যপণ্যের বাজারেও চাপ

দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকটকে ঘিরে পরিবহন খাতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও অনেক চালক জ্বালানি পাচ্ছেন না। ফলে পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কাঁচাবাজারে সবজি, মাছ ও অন্যান্য পণ্যের দামও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে দেখা গেছে, অধিকাংশ সবজি ৮০ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। পটল, করলা, ঝিঙা, চিচিঙ্গা, বেগুন ও শিমের মতো নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। কাঁচামরিচের দাম তুলনামূলক কম থাকলেও সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি অস্থির।

মৎস্য খাতে জ্বালানি সংকটের প্রভাবে নদীতে মাছ ধরা কমে যাওয়ায় সরবরাহ কমেছে। এতে মাছের দামও কেজিপ্রতি ১০০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি ভোজ্যতেলের বাজারেও সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক ক্রেতাকে বাধ্যতামূলকভাবে নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের সরিষার তেল কিনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পরিবহন খাতের চালকদের অভিযোগ, ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল সরবরাহ পর্যাপ্ত না থাকায় একেকটি যানবাহনকে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। রাজধানীর পরীবাগ, মৎস্য ভবন ও জিয়া উদ্যান এলাকায় দীর্ঘ যানবাহনের সারি লক্ষ্য করা গেছে। অনেক চালক রাত থেকে অপেক্ষা করেও জ্বালানি না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

একজন প্রাইভেট কার চালক জানান, “রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি, তবুও তেল পাইনি। কাজের পাশাপাশি এখন তেলের জন্যই সময় নষ্ট হচ্ছে।” একই ধরনের অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন মোটরসাইকেল চালকরাও, যারা বলছেন এই পরিস্থিতি তাদের জীবিকা নির্বাহে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বাজারে সাপ্লাই চেইনেও বিঘ্ন ঘটছে বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তাদের মতে, তেল সংকট অব্যাহত থাকলে নিত্যপণ্যের দাম আরও বাড়তে পারে।

এদিকে সরকার বলছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো প্রকৃত সংকট নেই। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। চালক ও ভোক্তাদের অভিযোগ, সরবরাহ ব্যবস্থায় কোথাও ঘাটতি বা অনিয়ম রয়েছে, যা সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে।

জ্বালানি তেলের মজুদ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হলেও বাস্তবে সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে তেল পৌঁছানোর পরিমাণ কম থাকায় একাধিক পাম্পে অল্প সময়ের মধ্যেই স্টক শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।

এদিকে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের রেকর্ড মজুদ রয়েছে। তিনি দাবি করেন, আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও দেশের চাহিদা পূরণে সরকার সক্ষম রয়েছে এবং এপ্রিল ও মে মাসের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি ইতোমধ্যে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে একাধিক ট্যাংকারে বিপুল পরিমাণ ডিজেল পৌঁছানোর খবরও পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নতুন এই সরবরাহ দিয়ে দেশের প্রায় ১২ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে।

তবে বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সরবরাহ থাকলেও বিতরণ ব্যবস্থায় সমন্বয়ের ঘাটতি থাকলে সংকটের প্রভাব সরাসরি জনগণের ওপরই পড়বে। বিশেষ করে পরিবহন খাতে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব খাদ্য সরবরাহ ও মূল্যস্ফীতিতে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক হতে পারে।

অন্যদিকে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে চালকদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। অনেক জায়গায় দীর্ঘ অপেক্ষার পরও তেল না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে যানবাহনগুলোকে। এতে জনজীবনে সৃষ্টি হয়েছে চরম দুর্ভোগ ও অনিশ্চয়তা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে। একই সঙ্গে পরিবহন ও বাজার ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে নিত্যপণ্যের দামের চাপ আরও বাড়বে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনে।

সব মিলিয়ে জ্বালানি তেলের সংকট এখন শুধু পরিবহন খাতেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি জাতীয় অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে জনদুর্ভোগ বাড়তে পারে।

This post was viewed: 6

আরো পড়ুন