সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের দুই মাস পূর্তি উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়েছে সরকারের গৃহীত ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের তালিকা। শনিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন এসব উদ্যোগ বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর অল্প সময়ের মধ্যেই নানা খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, যা দেশের উন্নয়নযাত্রায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
মাহদী আমিনের বক্তব্যে উঠে আসে, সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একটি জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা। তিনি উল্লেখ করেন, বিগত সময়ের নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে বর্তমান সরকার দ্রুতগতিতে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ করছে। দুই মাসের এই স্বল্প সময়ে গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে সামাজিক সুরক্ষা, কৃষি উন্নয়ন, জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, শিক্ষা সংস্কার, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনসহ নানা উদ্যোগ।
সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার পদক্ষেপ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর আওতায় ইতোমধ্যে হাজারো পরিবারকে মাসিক আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হচ্ছে। একইসঙ্গে কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালু করে নগদ সহায়তা ও বিভিন্ন সুবিধা প্রদান শুরু হয়েছে। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত কৃষিখাতে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
অর্থনৈতিক খাতে সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। বিদেশি বিনিয়োগ সহজীকরণ, অর্থনীতিকে পুনর্গঠনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে সৌরশক্তিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি খাতে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
শিক্ষা খাতে উল্লেখযোগ্য সংস্কারের মধ্যে রয়েছে পুনরায় ভর্তি ফি বাতিল, শিক্ষাবৃত্তি বৃদ্ধি, আধুনিক ভর্তি পদ্ধতি চালু এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রীড়া ও সহশিক্ষা কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করা। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ গ্রহণের পাশাপাশি মাদ্রাসা শিক্ষাকেও যুগোপযোগী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা এবং ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর পরিকল্পনা জনগণের স্বাস্থ্যসেবায় নতুন মাত্রা যোগ করবে। একইসঙ্গে হাসপাতালগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার এবং টিকাদান কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
প্রবাসী কল্যাণেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, অভিবাসন প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং প্রবাসীদের জন্য ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ ও অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে নদী খনন, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং নদী দখল ও দূষণ রোধে কঠোর আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
সরকার প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ, অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থা এবং দালালমুক্ত সেবা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিয়েছে। একইসঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু উন্নয়ন নয়, বরং একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা। তিনি গণমাধ্যমের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সরকারের কার্যক্রমকে আরও সমৃদ্ধ করতে সহযোগিতা করেন।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে সরকারের এই উদ্যোগগুলো দেশের সার্বিক উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।