সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি ও সামরিক সমীকরণে একটি নতুন তর্কের সূত্রপাত হয়েছে- বাংলাদেশ কি পাকিস্তান থেকে জেএফ-১৭ (JF-17 Thunder) ফাইটার জেট কিনতে যাচ্ছে? বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই দেশের মধ্যে এই যুদ্ধবিমান নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা ও আগ্রহ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ (Forces Goal 2030) প্রকল্পের আওতায় সামরিক শক্তি আধুনিকায়নের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে জেএফ-১৭ একটি শক্তিশালী বিকল্প হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে।
জেএফ-১৭ থান্ডারের একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
জেএফ-১৭ থান্ডার (JF-17 Thunder) বা ‘জয়েন্ট ফাইটার-১৭’ মূলত চীন এবং পাকিস্তানের যৌথ গবেষণার ফল। পাকিস্তানের ‘পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স’ (PAC) এবং চীনের ‘চেংডু এয়ারক্রাফট ইন্ডাস্ট্রি গ্রুপ’ (CAC) যৌথভাবে এই বিমানটি তৈরি করেছে। এর মূল লক্ষ্য ছিল একটি সাশ্রয়ী কিন্তু কার্যকর চতুর্থ প্রজন্মের মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান তৈরি করা, যা আকাশ থেকে আকাশে এবং আকাশ থেকে ভূমিতে নিখুঁতভাবে আক্রমণ করতে সক্ষম।
২০০৩ সালে এই বিমানের প্রথম সফল উড্ডয়ন ঘটে এবং ২০০৭ সাল থেকে এটি পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে যুক্ত হওয়া শুরু করে। গত এক দশকে জেএফ-১৭ এর তিনটি সংস্করণ তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে সর্বশেষ ‘ব্লক-৩’ সংস্করণটি প্রযুক্তির দিক থেকে অনেক উন্নত এবং এটিকে ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
কেন বাংলাদেশ জেএফ-১৭ কিনতে আগ্রহী?
বাংলাদেশ বিমানবাহিনী বর্তমানে তাদের পুরনো হয়ে যাওয়া এফ-৭ (F-7) যুদ্ধবিমানগুলোকে প্রতিস্থাপন করার পরিকল্পনা করছে। এক্ষেত্রে জেএফ-১৭ বেশ কিছু কারণে বাংলাদেশের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিতে পারে। পশ্চিমা দেশের ফাইটার জেট, যেমন এফ-১৬, ইউরোফাইটার টাইফুন বা রাফালের তুলনায় জেএফ-১৭ অনেক বেশি সাশ্রয়ী। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও ক্রয়মূল্য বিবেচনায় এটি একটি যৌক্তিক পছন্দ। এই মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য হলো বিমানবাহিনীকে একটি আধুনিক ও স্মার্ট বাহিনীতে রূপান্তর করা। জেএফ-১৭ এর ব্লক-৩ সংস্করণে এমন সব প্রযুক্তি রয়েছে যা আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান সুসংহত করবে।
উপরের কারণগুলো ছাড়াও আরও বেশ কিছু কারণ রয়েছে। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী দীর্ঘকাল ধরে চীনা যুদ্ধবিমান (যেমন এফ-৭ এবং এ-৫) ব্যবহার করে আসছে। জেএফ-১৭ এর ডিজাইনে চীনা প্রভাব থাকায় বাংলাদেশি পাইলট ও গ্রাউন্ড ক্রুদের জন্য এটি মানিয়ে নেওয়া তুলনামূলক সহজ হবে। পাকিস্তানের কাছ থেকে এই বিমান কিনলে যন্ত্রাংশ সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদী রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে সুবিধা পাওয়া যেতে পারে।
জেএফ-১৭ থান্ডারের কিছু বিশেষ সুবিধা
জেএফ-১৭ ফাইটার জেটের বর্তমান সংস্করণগুলোতে কিছু বিশ্বমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ব্লক-৩ সংস্করণে অত্যন্ত শক্তিশালী ‘অ্যাক্টিভ ইলেকট্রনিক্যালি স্ক্যানড অ্যারে’ (AESA) রাডার ব্যবহার করা হয়েছে। এটি অনেক দূর থেকে শত্রুপক্ষের বিমান শনাক্ত করতে এবং জ্যামিং প্রতিরোধ করতে সক্ষম। এই যুদ্ধবিমানটি বিয়ন্ড ভিজ্যুয়াল রেঞ্জ (BVR) মিসাইল বহন করতে পারে। এটি পিএল-১৫ (PL-15) এর মতো আধুনিক মিসাইল ছুড়তে সক্ষম, যা আকাশযুদ্ধের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। শত্রুর রাডারকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য এতে উন্নত ইলেকট্রনিক কাউন্টার-মেজার ব্যবস্থা রয়েছে। এর একটি বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এটি একটি ‘মাল্টিরোল ফাইটার জেট’। এটি একই সাথে আকাশ প্রতিরক্ষা, সামুদ্রিক টহল এবং ভূমিতে আক্রমণ- তিনটি কাজই অত্যন্ত দক্ষতার সাথে করতে পারে।
সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়নে এর প্রভাব
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে জেএফ-১৭ এর অন্তর্ভুক্তি সামরিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে রাশিয়ার তৈরি মিগ-২৯ এবং চীনা এফ-৭ বিজিআই প্রধান শক্তি হিসেবে কাজ করছে। জেএফ-১৭ যুক্ত হলে বাহিনীর ‘ফায়ার পাওয়ার’ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অঞ্চল রক্ষা এবং আকাশসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই বিমানের ভূমিকা হবে অপরিসীম। এছাড়াও, অত্যাধুনিক অ্যাভিওনিক্স ও ককপিট প্রযুক্তির কারণে এটি নতুন প্রজন্মের পাইলটদের প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও সহায়ক হবে।
ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে এই সম্ভাব্য চুক্তি কেবল সামরিক নয়, বরং একটি কৌশলগত বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের উত্থান-পতন থাকলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সামরিক এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হচ্ছে। ভারত ও মিয়ানমারের বিমানবাহিনীর সক্ষমতার বিপরীতে নিজের শক্তি সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখতে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হতে পারে।
জেএফ-১৭ থান্ডার বর্তমান বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় লাইট-ওয়েট ফাইটার জেট হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে। নাইজেরিয়া এবং মিয়ানমারের মতো দেশগুলোও এই বিমান ব্যবহার করছে। বাংলাদেশের আকাশসীমা রক্ষা এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য জেএফ-১৭ একটি “ভ্যালু ফর মানি” অপশন। যদি এই চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়, তবে এটি বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ইতিহাসে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা করতে পারে।