চেহারা বদলাতে কেটে ফেলেছিলেন চুল ও গোঁফ। পরিচয়ও পাল্টে দাবি করেছিলেন, তিনি পুরান ঢাকার একজন শ্রমিক, নাম মিরাজ। উদ্দেশ্য ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে সীমান্ত পার হয়ে যাওয়া। তবে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি। ছদ্মবেশে থাকা চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বুধবার (২৯ জুলাই) ভোরে যশোরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সকালে তাকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পুলিশের দাবি, ভারতে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছিলেন।
গ্রেপ্তারের সময় ধারণ করা একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, গোয়েন্দা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বারবার নিজের নাম, পরিচয় ও ঠিকানা পরিবর্তন করে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। তবে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং শারীরিক বৈশিষ্ট্য যাচাই করে পুলিশ নিশ্চিত হয়, ‘মিরাজ’ পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিই ডেভিড ইমন।
পুলিশের তথ্যমতে, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চন নগর ইউনিয়নের বাসিন্দা মোবারক হোসেনের অপরাধজগতে প্রবেশ ঘটে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়। ফটিকছড়ির সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও তৎকালীন শীর্ষ সন্ত্রাসী আবু তৈয়বের অনুসারী হিসেবে তিনি এলাকায় চুরি, ধুরুং খাল থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন এবং বিভিন্ন সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।
২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনি ফটিকছড়ি ছেড়ে চট্টগ্রাম শহরে চলে যান। সেখানে ‘ছোট সাজ্জাদ’-এর মাধ্যমে অপরাধচক্রে যুক্ত হয়ে নিজের নাম পরিবর্তন করে ডেভিড ইমন পরিচয় নেন। পরে ‘বড় সাজ্জাদ’ গ্রুপে যোগ দেন। ছোট সাজ্জাদ গ্রেপ্তার হওয়ার পর ওই বাহিনীর নেতৃত্বের দায়িত্ব ডেভিড ইমনের হাতে আসে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, চট্টগ্রাম শহরে আসার পর একাধিক হত্যা ও চাঁদাবাজির ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট বাকলিয়া এলাকায় আনিস ও মোহাম্মদ হাসান হত্যাকাণ্ড, একই বছরের ৩০ মার্চের আলোচিত জোড়া হত্যা এবং ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় ‘ঢাকাইয়া আকবর’ হত্যা মামলার তদন্তে তার নাম উঠে আসে।
এ ছাড়া চলতি বছরের জুন ও জুলাই মাসে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে তার নামে প্রায় দেড় কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে। চন্দপুরা এলাকার একটি ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ২ কোটি টাকা এককালীন এবং মাসে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ আরও জানায়, গত সপ্তাহে বড়দিঘির পাড় এলাকার এক আবাসন ব্যবসায়ীর কাছে ৫০ লাখ টাকা এবং জিইসি এলাকার এক ব্যবসায়ীর কাছে হোয়াটসঅ্যাপে চাঁদা দাবি করে ব্যবসা বন্ধের হুমকি দেওয়া হয়।
গত ২৬ জুলাই রাতে চট্টগ্রাম নগরীর অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের ওয়াজেদিয়া এলাকা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও চার রাউন্ড গুলিসহ মো. আসিফ (২৫) ও সাইদুল ইসলাম ওরফে আরিফ (২৪) নামে ডেভিড ইমনের দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে তারা ডেভিড ইমনের চাঁদাবাজি চক্র সম্পর্কে তথ্য দেয়। সেই সূত্র ধরেই যশোর জেলা পুলিশের একটি বিশেষ দল ঝুমঝুমপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরা অবস্থায় গ্রেপ্তার করে। তবে অভিযানের সময় তার আরেক সহযোগী রায়হান পালিয়ে যান।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মো. নাজিমুল হক বলেন, “চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের গোয়েন্দা দল দীর্ঘদিন ধরে এই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে নজরে রাখছিল। তিনি প্রথমে ঢাকায় আত্মগোপন করেছিলেন, সেখানেও অভিযান চালানো হয়। সর্বশেষ যশোর সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাকে ধরা সম্ভব হয়েছে।”
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) মো. রাসেল জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সকালে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তার এবং তার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগগুলোর বিস্তারিত তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হবে।