গাজা উপত্যকার নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন ৫০ শতাংশের বেশি এলাকা বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে দ্রুতগতিতে বিশাল মাটির বাঁধ নির্মাণ করছে ইসরায়েল। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, ইতোমধ্যে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে নির্মিত এই বাঁধ গাজার বিভিন্ন ফিলিস্তিনি জনপদের ওপর দিয়ে গেছে, যেগুলো এর আগেই ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ধ্বংস করে দিয়েছিল। গাজার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ কিলোমিটার হওয়ায় নির্মিত বাঁধটির দৈর্ঘ্য উপত্যকার অর্ধেকেরও বেশি।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রকাশিত স্যাটেলাইট চিত্রের বিষয়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিশ্চিত করেছে, তারা তথাকথিত ‘ইয়েলো লাইন’ বরাবর একটি ভৌত বাধা নির্মাণ করেছে। গত অক্টোবরে হামাসের সঙ্গে হওয়া যুদ্ধবিরতির সময় এই রেখাকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের সীমারেখা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে হওয়া ওই চুক্তিতে পূর্ণাঙ্গ সেনা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত এটিকে অস্থায়ী বিভাজনরেখা হিসেবে ধরা হয়েছিল।
তবে যুদ্ধবিরতি কার্যত স্থবির হয়ে যাওয়ায় ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, এই অস্থায়ী বিভাজনরেখাই স্থায়ী সীমান্তে রূপ নিতে পারে। যুদ্ধবিরতি তদারকির দায়িত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড এবং গাজার ভবিষ্যৎ তদারকির জন্য গঠিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন বোর্ড অব পিস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, মাটির বাঁধের পাশাপাশি ইয়েলো লাইনের আশপাশে গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিনির্ভর একটি নিরাপত্তা অঞ্চলও গড়ে তোলা হয়েছে। তবে এই বাধা কতদূর পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা হবে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। সেনাবাহিনীর দাবি, অনুপ্রবেশ ঠেকানো এবং সীমান্তবর্তী ইসরায়েলি সেনা ও বসতিগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, চলতি মাসের মাত্র দুই সপ্তাহে দক্ষিণ গাজার একটি অংশে বাঁধের দৈর্ঘ্য ৫০০ মিটার থেকে বেড়ে প্রায় ২.৪ কিলোমিটারে পৌঁছেছে। এর ফলে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া রাফাহ শহর আল-মাওয়াসি এলাকা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে। বর্তমানে আল-মাওয়াসিতে ফিলিস্তিনিদের সবচেয়ে বড় কয়েকটি তাবু শিবির রয়েছে।
বর্তমান গতিতে নির্মাণকাজ চলতে থাকলে এই অংশটি দক্ষিণের খান ইউনিস থেকে গাজা সিটির কাছাকাছি পর্যন্ত নির্মাণাধীন প্রায় ১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ আরেকটি বাঁধের সঙ্গে যুক্ত হবে। ওই অংশের কাজ ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয় এবং এখনো দক্ষিণমুখী সম্প্রসারণ চলছে। এছাড়া গাজার উত্তরে ধ্বংসপ্রাপ্ত বেইত লাহিয়া শহরের কাছেও কয়েকটি বিচ্ছিন্ন মাটির বাঁধের অস্তিত্ব দেখা গেছে।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে ইয়েলো লাইনের পশ্চিমের উপকূলীয় এলাকায় গাজার অধিকাংশ মানুষ গাদাগাদি করে বসবাস করছেন। তাদের বেশিরভাগই অস্বাস্থ্যকর তাবু শিবিরে মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
অন্যদিকে ইয়েলো লাইনের পূর্বাঞ্চলে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, ইসরায়েলি বাহিনী বুলডোজার ও বিস্ফোরক ব্যবহার করে অধিকাংশ ভবন ধ্বংস করেছে। একসময় আড়াই লাখের বেশি মানুষের বসবাস ছিল এমন রাফাহ শহর প্রায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানে নতুন সড়ক ও সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে কৃষিজমিও নষ্ট করা হয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, হামাসের ব্যবহৃত অবকাঠামো ধ্বংস করতেই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইয়েলো লাইনের সুনির্দিষ্ট অবস্থান কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়নি এবং বাস্তবেও এটি সব জায়গায় স্পষ্টভাবে চিহ্নিত নয়। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, সংঘর্ষ কমানো এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে এখন এই সীমারেখা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করার কাজ চলছে।
তবে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েলো লাইনের কাছাকাছি যাওয়া বা এটি অতিক্রম করার সময় ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে বহু ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে শিশু এবং এমন বেসামরিক মানুষও রয়েছেন, যারা সম্ভবত এই সীমারেখা সম্পর্কে অবগত ছিলেন না। কয়েকজন ইসরায়েলি সেনার দাবি, তারা সব সময় জানতেন না কাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হচ্ছে এবং সীমারেখা অতিক্রমকারী যে কাউকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর নির্দেশ তাদের দেওয়া হয়েছিল।