Ridge Bangla

ইরান যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তে বদলে গেছে বৈশ্বিক সমীকরণ

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান নীতি ও পরবর্তী যুদ্ধ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমা কূটনৈতিক মহলে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হুমকি দূর করা এবং বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া সংঘাত শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের জন্য বড় কৌশলগত ধাক্কায় পরিণত হয়েছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব বেড়েছে। একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে। হরমুজ প্রণালি ঘিরেও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুমে একটি উপস্থাপনার মাধ্যমে ট্রাম্পকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দেন। প্রায় ১ ঘণ্টার ওই উপস্থাপনায় তিনি ভিডিওচিত্র, বক্তব্যের অংশ এবং সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্বের তথ্য তুলে ধরেন।

নেতানিয়াহুর দাবি ছিল, ইরানের বর্তমান সরকারের পতন ঘটলে নতুন নেতৃত্ব দেশটিকে পশ্চিমাপন্থি পথে নিয়ে যেতে পারবে। এরপর ইরানের হুমকি দ্রুত শেষ করা সম্ভব হবে- এমন ধারণার ভিত্তিতে ট্রাম্প তার সামরিক কর্মকর্তাদের যুদ্ধ পরিকল্পনা তৈরির নির্দেশ দেন।

তবে যুদ্ধ পরিস্থিতি প্রত্যাশা অনুযায়ী এগোয়নি। সামরিক অগ্রগতি সত্ত্বেও ইরানকে ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে’ বাধ্য করার আশা পূরণ হয়নি। শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতিকেই বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরেন ট্রাম্প। কিন্তু হরমুজ প্রণালি ঘিরে পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপের কারণে সেই সমঝোতাও দ্রুত চাপে পড়ে।

ওয়াশিংটনের এক অভ্যন্তরীণ সূত্র পরবর্তী চুক্তিকে ‘সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ চুক্তি’ বলে মন্তব্য করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বিশ্ব অর্থনীতি, যুক্তরাষ্ট্রের জোট, মিত্রতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সম্পর্কেও এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।

জো বাইডেন প্রশাসনের সাবেক ডেপুটি সেক্রেটারি অব স্টেট কার্ট ক্যাম্পবেল বলেন, ‘আমি মনে করি এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং প্রত্যাশিত ও অপ্রত্যাশিত- দুইভাবেই সামনে আসবে’।

তিনি আরও বলেন, ‘এটি ব্যবসা, ভোক্তা এবং ভূরাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে। কিছু দেশ এই পরিস্থিতি থেকে আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়ে বেরিয়ে আসবে, আর তাদের মধ্যে চীন সম্ভবত সবচেয়ে এগিয়ে থাকবে।’

ক্যাম্পবেলের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি সংকটে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িয়ে পড়ার বিষয়টি অনেক দেশের মধ্যে ওয়াশিংটনের কৌশলগত অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সমর্থকদের অনেকেই ইরান যুদ্ধকে তার পররাষ্ট্রনীতির বড় ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। এ অবস্থার জন্য নেতানিয়াহুর ওপরও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘বিবি (নেতানিয়াহু) কেন আবার সেই হামলা চালাতে গেল?’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। আমি তাকে সেটা জানিয়েছি। তার বিচারবুদ্ধিই নেই। আমি তাকে সেটাও জানিয়েছি।’

যদিও কয়েক মাস আগেও দুই নেতার সম্পর্ক ছিল ভিন্ন। নেতানিয়াহু মনে করেছিলেন, তিনি এমন একটি লক্ষ্য অর্জন করেছেন, যা তার পূর্বসূরিরা পারেননি। কারণ ১৯৪৫ সালের পর এবারই প্রথম ইসরায়েলের পাশে দাঁড়িয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেয় যুক্তরাষ্ট্র।

তবে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত এবং প্রত্যাশিত ফল না আসায় ট্রাম্প নিজ দেশেও সমালোচনার মুখে পড়েন। মার্কিন কট্টর-ডানপন্থিদের একাংশ অভিযোগ করে, তিনি নেতানিয়াহুর কৌশলের ফাঁদে পড়েছেন।

অন্যদিকে ইসরায়েলের কিছু মহলের দাবি, তাদের সামরিক পরিকল্পনাকারীরা আরও সময় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাদের মতে, অপেক্ষা করলে লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহকে আরও দুর্বল করা যেত এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ চাপও বাড়ত।

ইসরায়েলের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল ইয়াকভ আমিদরর বলেন, ‘ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু করার কোনও পরিকল্পনা ইসরায়েলের ছিল না। ইসরায়েল এই যুদ্ধে নেমেছিল আমেরিকার সময়সূচি অনুযায়ী, নিজেদের সময়সূচি অনুযায়ী নয়।’

এদিকে যুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি জনসমর্থন কমার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন, যা ২০২২ সালের তুলনায় ২০ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা জেনারেল আসাফ ওরিয়ন বলেন, ‘মূল বিষয় হলো, ইসরায়েলের সমর্থন কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত। এমনকি সেই সমর্থন নেতিবাচক মনোভাব বা বিরোধিতায় পরিণত হতে পারে’।

তিনি আরও বলেন, ‘এটি ইসরায়েলের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক। কারণ আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’

অন্যদিকে উপসাগরীয় দেশগুলোও যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপে হতাশ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, ‘এই যুদ্ধের বিরোধিতা উপসাগরীয় সব দেশই করেছিল’।

তার মতে, এসব দেশ ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করলেও সফল হয়নি।

ইরান যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক সামরিক অবস্থানে। বিশ্লেষকদের মতে, চীনকে মোকাবিলার পরিবর্তে ওয়াশিংটনকে আবারও মধ্যপ্রাচ্যে মনোযোগ দিতে হয়েছে।

কার্ট ক্যাম্পবেল বলেন, ‘ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রতিরোধমূলক অবস্থান বজায় রাখার জন্য যে সামরিক সক্ষমতাগুলো বরাদ্দ ছিল, তার বড় অংশ এখন পারস্য উপসাগর ও আশপাশের এলাকায় সরিয়ে নেয়া হয়েছে’।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে চীন। অন্যদিকে তেলের দাম বৃদ্ধি ও পশ্চিমাদের সামরিক সম্পদ ব্যবহারের কারণে কিছু ক্ষেত্রে লাভবান হয়েছে রাশিয়াও।

চ্যাথাম হাউসের গবেষক কিয়ার গাইলস বলেন, ‘রাশিয়া সন্তুষ্টির সঙ্গে দেখবে যে ইউরোপের আত্মরক্ষার জন্য ব্যবহৃত হতে পারত এমন প্রতিরক্ষামূলক গোলাবারুদের মজুত কমে গেছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের সম্পূর্ণ প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। তবে এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, বৈশ্বিক বাণিজ্য নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে।

কার্ট ক্যাম্পবেল বলেন, ‘একটি বিষয় আমরা নিশ্চিতভাবে জানি- যুদ্ধ-পূর্ব অবস্থায় আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়’।

তিনি আরও বলেন, ‘আগের মতো পরিস্থিতি আর কখনও হবে না। উপসাগরীয় অঞ্চলের ওপর সব সময়ই ইরানের একটি অদৃশ্য চাপ বা কতৃত্ব থাকবেই।’

This post was viewed: 3

আরো পড়ুন