যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। সুইজারল্যান্ডে আলোচনার সময় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মুখে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রশংসাও উঠে আসে। তবে এই মধ্যস্থতার মাধ্যমে কূটনৈতিক স্বীকৃতির বাইরে পাকিস্তানের প্রকৃত অর্জন কী- তা নিয়েও চলছে আলোচনা।
যুদ্ধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক যখন চরম সংকটে, তখন দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে ওঠে ইসলামাবাদ। ট্রাম্প প্রশাসনের আস্থাভাজন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় ভূমিকা রাখে।
পর্দার আড়ালে চালানো এসব কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলেই গত সপ্তাহে সুইজারল্যান্ডে দুই পক্ষ শান্তির একটি রোডম্যাপে পৌঁছায়। এরপর যুদ্ধ-পরবর্তী প্রথম বিদেশ সফরে পাকিস্তানে যান ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং ইসলামাবাদের ভূমিকার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান।
আলোচনার সময় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের একটি মন্তব্যও আলোচনায় আসে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত স্ত্রী উষা ভ্যান্সের প্রসঙ্গ তুলে তিনি রসিকতা করে বলেন, তার জীবনে দু’জন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মানুষ রয়েছেন। একজন ভারতীয়, অন্যজন পাকিস্তানি। আর সেই পাকিস্তানি হলেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির।
গত ৩ মাসে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের বিষয়টি ভ্যান্সের বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে তেহরানের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের অবস্থান নতুন করে তুলে ধরেছে ইসলামাবাদ।
তবে এই কূটনৈতিক সাফল্যের মধ্যেও প্রশ্ন উঠছে, এর মাধ্যমে পাকিস্তান বাস্তবে কী সুবিধা পাবে। অর্থনীতিতে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এলেও দেশটির অর্থনৈতিক সংকট এখনো কাটেনি।
আইএমএফের ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় থাকা পাকিস্তানের জন্য যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা অর্থনৈতিক স্বস্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে। হরমুজ প্রণালীর উত্তেজনা কমলে জ্বালানি আমদানির ব্যয় কমতে পারে। পাশাপাশি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে দীর্ঘদিন আটকে থাকা ‘ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপলাইন’ প্রকল্প এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগে পাকিস্তানের বড় অর্জন অর্থনীতির চেয়েও বেশি কৌশলগত। মধ্যস্থতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের আঞ্চলিক গুরুত্ব আবার সামনে এনেছে দেশটি। সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিশরের মতো প্রভাবশালী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে ইসলামাবাদ।
এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বও বড় সুবিধা পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। মার্কিন প্রশাসনের প্রশংসা ইঙ্গিত দিচ্ছে, ওয়াশিংটনের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমতার কাঠামোয় রাওয়ালপিন্ডির সামরিক নেতৃত্ব এখনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে ভূরাজনৈতিক এই সাফল্যের পরও সতর্ক করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, নাইন ইলেভেন-পরবর্তী সময়েও পাকিস্তান আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট পুরোপুরি কাটাতে পারেনি।
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই কূটনৈতিক অর্জনের সুফল যদি দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র বিদ্রোহ ও অবহেলার মুখে থাকা বেলুচিস্তানের সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছায়, তাহলে এটি শুধু ক্ষমতাকেন্দ্রিক অভিজাতদের আরেকটি কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবেই থেকে যাবে।