ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক সংকটে উন্নয়নশীল, স্বল্পোন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন চীনের গবেষক জিন লিয়াংশিয়াং। তার মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর জ্বালানি আমদানি এবং প্রবাসী আয়ের নির্ভরশীলতার কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি এ সংকটে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ঢাকা ইনস্টিটিউট অফ রিসার্চ এন্ড অ্যানালিটিক্স আয়োজিত বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স ২০২৬-এ ‘দ্য ইরান-ইউএস কনফ্লিক্ট অ্যান্ড দ্য ইমার্জিং সিকিউরিটি ল্যান্ডস্কেইপ’ শীর্ষক নির্ধারিত বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন। প্রায় ১০ মিনিটের বক্তব্যে তিনি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিশ্বকে নাড়িয়ে দেওয়া এ যুদ্ধের পটভূমি এবং এর বহুমাত্রিক প্রভাব তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ প্রসঙ্গে জিন লিয়াংশিয়াং বলেন, বিশেষ করে জ্বালানি খাতে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ইতোমধ্যে তেল সরবরাহে বিঘ্ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তার ভাষায়, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতি চীন, যুক্তরাষ্ট্র বা জাপানের মতো দেশের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে এ ধরনের বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার দিক থেকেও দেশটি তুলনামূলকভাবে বেশি ভঙ্গুর।
তিনি আরও বলেন, জ্বালানির পাশাপাশি জিসিসিভুক্ত দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মীর উপস্থিতিও দেশের জন্য বড় ঝুঁকির কারণ। এসব কর্মীর পাঠানো প্রবাসী আয় দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তবে চলমান যুদ্ধের পূর্ণ অর্থনৈতিক প্রভাব এখনো স্পষ্ট হয়নি। ভবিষ্যতে যদি উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি বড় ধরনের সংকটে পড়ে, তাহলে তারা আগের মতো বিপুলসংখ্যক বিদেশি শ্রমিকের প্রয়োজন নাও অনুভব করতে পারে।
জিন লিয়াংশিয়াং বলেন, “তবে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।”
তিনি বলেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সংঘাত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের তুলনায় আরও বড় ধরনের বৈশ্বিক প্রভাব ফেলতে পারে। তার মতে, ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত লক্ষ্য হলো ইরানকে এমনভাবে দুর্বল করা, যাতে দেশটি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের আঞ্চলিক প্রাধান্যের জন্য আর চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে না পারে। তবে তিনি ইরান সহজেই ভেঙে পড়বে, এমন ধারণা নাকচ করে দেন। তার যুক্তি, ইরান সামরিক সক্ষমতায় উল্লেখযোগ্য আত্মনির্ভরতা অর্জন করেছে এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাও রাখে।
এসআইআইএসের জ্যেষ্ঠ ফেলো জিন লিয়াংশিয়াং বলেন, এ ধরনের সংঘাত বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশগুলোর নিরাপত্তাজনিত দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে জ্বালানি বাজার ও কৌশলগত অংশীদারত্বের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ফলে সেখানে অস্থিতিশীলতা দেখা দিলে তার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক অবস্থানেও পড়বে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে একটি অস্বস্তিকর ভারসাম্য বজায় রেখেই এগোতে হবে।