ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করতে দেশটির ওপর টানা ১০ থেকে ১৪ দিনের বিমান হামলার একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ডের প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেই এ পরিকল্পনার তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের চলমান হুমকি মোকাবিলার উদ্দেশ্যে এই সামরিক পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছেন অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার। তিনি ফ্লোরিডার টাম্পায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কমান্ডের সদর দপ্তর থেকে ইরানবিরোধী সামরিক কার্যক্রম তদারকি করছেন।
এরই মধ্যে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় নতুন করে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। চলতি সপ্তাহের শুরুতে জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের আকস্মিক হামলার জবাব হিসেবে এই অভিযান পরিচালিত হয়। কেন্দ্রীয় কমান্ড জানিয়েছে, ভারী মাত্রার হামলার একটি ধাপ সফলভাবে শেষ হয়েছে। অভিযানে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সামরিক কমান্ড সেন্টারসহ কয়েক ডজন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশের কয়েকটি শহর এবং কেশম দ্বীপে হামলা হয়েছে। হরমুজ প্রণালির কেশম দ্বীপে ৩ জন নিহত হয়েছেন। প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষের বরাতে সংস্থাটি আরও জানায়, আবাদান, শাদেগান, আরভান্দকেনার ও আহভাজ শহরের আশপাশের এলাকাও হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।
রাতভর হামলার পর বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, “আজই আগ্রাসনকারীকে শাস্তি দেবে।” একই সময়ে জর্ডান জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে তারা আরও ৫টি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।
এর আগে বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর হামলা চালাবেন এবং দেশটিকে “উচিত শিক্ষা দেবেন”। তার এই বক্তব্যকে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাডমিরাল কুপারের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় থাকা কয়েকটি সামরিক বিকল্পের একটি। এর মধ্যে দ্রুত এবং বৃহৎ পরিসরে যুদ্ধের মাত্রা বাড়ানোর কৌশলও রয়েছে।
তবে এই পরিকল্পনা এমন সময় সামনে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রের বিমান প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসছে। জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইনও এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার মতে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন থাকায় পুরো মজুত মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা সম্ভব নয়।
একটি নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র তার প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ব্যবহার করেছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে প্রায় ২ হাজার ৩৩০টি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। কয়েক মাসের সংঘাতে সেই সংখ্যা কমে ৭৫৯টিতে নেমে এসেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির ধারণা।
প্রতিষ্ঠানটি সতর্ক করে জানিয়েছে, যুদ্ধ আবার তীব্র হলে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়িষ্ণু ইন্টারসেপ্টর মজুত বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। পাশাপাশি পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য মার্কিন সামরিক প্রস্তুতিও এতে প্রভাবিত হতে পারে।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ট্রাম্প বর্তমানে “সংঘাত বাড়ানোর মেজাজে” রয়েছেন। তবে কী মাত্রার জবাব দেওয়া হবে, সে বিষয়ে তিনি এখনও সিদ্ধান্ত নেননি। অ্যাডমিরাল কুপারের পরিকল্পনার উদ্দেশ্য দ্রুত বড় আকারের সামরিক অভিযান চালিয়ে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা দুর্বল করা। পরিকল্পনার সমর্থকদের মতে, এতে ইরানের পাল্টা হামলার সক্ষমতা কমবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামূলক ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর চাপও হ্রাস পাবে।
যুদ্ধের কৌশল নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে মতপার্থক্যও দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক এক বৈঠকে তিনি কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এক সূত্র এনবিসি নিউজকে জানিয়েছে, “প্রেসিডেন্ট হতাশ। ইরানিদের একটি চুক্তিতে রাজি করানো এত কঠিন হবে- তিনি মনে হয় তা বিশ্বাস করেননি।” একই সূত্রের দাবি, যুদ্ধ কতদিন চলবে এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে কী কৌশল নেওয়া হবে, সে বিষয়ে শুরুতে ওয়াশিংটনের কোনো বাস্তব পরিকল্পনা ছিল না।
অন্যদিকে, মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, বৈঠকে দুই নেতার মধ্যে খোলামেলা আলোচনা হয়েছে। এর আগে মার্চে নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকে ভ্যান্স অভিযোগ করেছিলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে ইসরায়েলের মূল্যায়ন অতিরিক্ত আশাবাদী।
জুনে ভ্যান্স বলেছিলেন, ইসরায়েল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রমেই একঘরে হয়ে পড়ছে এবং শুধু সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। পরের মাসে তিনি যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সম্ভাব্য যোগাযোগের ইঙ্গিতও দেন।
সাম্প্রতিক হামলাগুলোর মাধ্যমে ইরান তার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। এর মধ্যে মঙ্গলবার রাতে জর্ডানে চালানো আকস্মিক হামলাও রয়েছে। চলতি মাসের শুরুতে একই ধরনের আরেক হামলায় ৩ মার্কিন সেনা নিহত হয়।
এদিকে, ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ অভিযান চালিয়ে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে সৌদি আরব। রিয়াদের তেল স্থাপনায় হামলার জন্য ইরানের প্রতি অনুগত মিলিশিয়াদের দায়ী করে পরে ইরাকে অবস্থানরত সেই গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথ হামলা চালায় সৌদি বাহিনী।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ইরান-সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের অস্ত্র ও রসদ সংরক্ষণাগার ছিল ওই হামলার লক্ষ্য। জোটের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, হামলায় তাদের অন্তত ২০ সদস্য নিহত হয়েছেন।
সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। বুধবার মিশরের দামিয়েত্তা বন্দরে একটি মার্কিন মালিকানাধীন গ্যাস সংরক্ষণকারী ট্যাংকার এবং গ্রিসের মালিকানাধীন একটি পণ্যবাহী জাহাজ ড্রোন হামলার শিকার হয়।
নিউইয়র্ক টাইমস নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, হামলায় ব্যবহৃত ড্রোনগুলো ইরান থেকে ছোড়া হয়ে থাকতে পারে। অঞ্চলজুড়ে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার বার্তা দিতেই এ হামলা চালানো হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।