‘হলুদ সাংবাদিকতা’- কথাটি শুনলেই আমাদের মাথায় ভেসে ওঠে চটকদার শিরোনাম, অতিরঞ্জিত খবর, গুজব, অর্ধসত্য কিংবা পাঠক টানার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা তৈরি করা সংবাদ। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সাংবাদিকতার সঙ্গে ‘হলুদ’ রঙের সম্পর্ক আদতে নীতি-নৈতিকতা, রাজনীতি কিংবা কোনো প্রতীকী অর্থ থেকে তৈরি হয়নি। এর পেছনে আছে উনিশ শতকের শেষের নিউইয়র্ক, দুই প্রভাবশালী সংবাদপত্রের মালিকের তীব্র ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব এবং হলুদ জামা পরা এক কার্টুন শিশু!
পুরো কাহিনি এতটাই বিচিত্র যে সাংবাদিকতার ইতিহাস না জানলে একে প্রায় বানানো গল্প বলেই মনে হতে পারে।
সময়টা ১৮৯০-এর দশক। নিউ ইয়র্ক তখন দ্রুত বদলে যাওয়া এক মহানগর। বিপুলসংখ্যক অভিবাসী সেখানে নতুন জীবন শুরু করছেন, বাড়ছে শ্রমজীবী মানুষের সংখ্যা, আর সেই সঙ্গে দ্রুত বাড়ছে সংবাদপত্রের বাজার। সকাল হলেই রাস্তায় সংবাদপত্র বিক্রেতা কিশোরদের হাঁক, বড় বড় কালো অক্ষরের শিরোনাম, অপরাধ, রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি, দুর্ঘটনা কিংবা শহরের অদ্ভুত সব ঘটনার খবর- সব মিলিয়ে পত্রিকার বাজার ছিল মারাত্মক প্রতিযোগিতাপূর্ণ। এই বাজারেরই সবচেয়ে বড় খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন জোসেফ পুলিৎজার।
১৮৮৩ সালে তিনি New York World কিনে নেওয়ার পর পত্রিকাটিকে নতুন রূপ দেন। সাধারণ মানুষের জীবনের গল্প, দুর্নীতির অনুসন্ধান, অপরাধ, স্ক্যান্ডাল, মানবিক ঘটনা- সবকিছুই জায়গা পেতে থাকে সেখানে। খবরকে শুধু তথ্যের বাক্সে আটকে না রেখে কীভাবে নাটকীয় ও আকর্ষণীয়ভাবে পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা যায়, পুলিৎজার সেটি ভালোই বুঝেছিলেন।
তাঁর কৌশল কাজও করেছিল। পত্রিকাটি দ্রুত নিউইয়র্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদপত্রগুলোর একটিতে পরিণত হয়। কিন্তু ১৮৯৫ সালে সেই আধিপত্যে বড় ধাক্কা দিলেন আরেক উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকাশক উইলিয়াম র্যান্ডলফ হার্স্ট। তিনি কিনলেন New York Journal। লক্ষ্য একটাই- পুলিৎজারকে হারাতে হবে।
শুরু হলো নিউইয়র্কের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত সংবাদপত্র-যুদ্ধগুলোর একটি।
লাইব্রেরি অব কংগ্রেসের বিবরণ অনুযায়ী, পাঠক টানার এই প্রতিযোগিতায় দুই পক্ষই বড় বড় শিরোনাম, চোখধাঁধানো ইলাস্ট্রেশন, উত্তেজক গল্প এবং অনেক সময় তথ্যের সঙ্গে শিথিল আচরণের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কে বেশি চমক সৃষ্টি করতে পারবে- প্রতিযোগিতা যেন সেখানে গিয়ে দাঁড়ায়। আর ঠিক এই লড়াইয়ের মাঝেই হাজির হলো একটি শিশু।
হলুদ জামা পরা সেই ছেলেটি
কার্টুনিস্ট রিচার্ড এফ. আউটকোল্ট তখন নিউ ইয়র্ক ওয়ার্ল্ডে একটি জনপ্রিয় কার্টুন আঁকতেন- Hogan’s Alley। নিউ ইয়র্কের দরিদ্র বস্তি এলাকার জীবনকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হতো সেখানে। কার্টুনটির নানা চরিত্রের ভিড়ে সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছিল টাকমাথা, বড় কান ও দাঁত বের করা হাসিমুখের এক বালক। তার নাম মিকি ডুগান। তবে পাঠকের কাছে সে অন্য নামেই বিখ্যাত হয়ে ওঠে- The Yellow Kid। কারণ তার পরনে থাকত বিশাল, ঢিলেঢালা, উজ্জ্বল হলুদ রঙের নাইটশার্ট।
আজকের দৃষ্টিতে একটি কার্টুন চরিত্রের জনপ্রিয়তা খুব বড় ব্যাপার মনে না-ও হতে পারে। কিন্তু তখন সংবাদপত্রে রঙিন ভার্সন বেশ আকর্ষণীয় ছিল সবার কাছেই। ইয়েলো কিড দ্রুত পাঠকপ্রিয় হয়ে ওঠে। এমনকি তাকে সংবাদপত্রে জনপ্রিয় কমিক চরিত্রের প্রথম দিককার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়।
ইয়েলো কিডের জনপ্রিয়তা হার্স্টের চোখ এড়ায়নি। তিনি পুলিৎজারের পত্রিকা থেকে আউটকোল্টকে নিজের নিউ ইয়র্ক জার্নালে নিয়ে এলেন। মোটা অঙ্কের বেতন দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর সেরা কর্মী ছিনিয়ে নেওয়া তখন হার্স্টের পরিচিত কৌশলগুলোর একটি ছিল। আউটকোল্টের সঙ্গে ইয়েলো কিডও চলে গেল।কিন্তু পুলিৎজারও ছাড়বার পাত্র না। তিনি অন্য কার্টুনিস্ট দিয়ে নিজের পত্রিকায় ইয়েলো কিডের সংস্করণ চালিয়ে যেতে লাগলেন। ফলে একপর্যায়ে নিউইয়র্কের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সংবাদপত্রেই দেখা যাচ্ছিল হলুদ জামা পরা সেই ছেলেকে। একটি কার্টুন চরিত্র যেন দুই সংবাদপত্র সাম্রাজ্যের যুদ্ধের প্রতীক হয়ে উঠল।
‘Yellow’ থেকে ‘Yellow Journalism’
পুলিৎজার ও হার্স্টের যুদ্ধ কেবল কার্টুন নিয়ে ছিল না। দুই পত্রিকাই পাঠকের মনোযোগ কাড়তে ক্রমশ আরও বড় শিরোনাম, নাটকীয় ভাষা ও উত্তেজনাকর উপস্থাপনার দিকে যাচ্ছিল। তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ও সমালোচক সংবাদপত্রগুলো এই ধারাকে ব্যঙ্গ করতে শুরু করে। ইয়েলো কিডকে কেন্দ্র করে দুই পত্রিকাকে কখনো ‘Yellow Kid papers’, কখনো ‘Yellow press’ বলা হচ্ছিল। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় ইয়েলো জার্নালিজম (Yellow Journalism) কথাটি।
১৮৯৭ সালের সংবাদপত্রেও ‘The Yellow War’-এর মতো শব্দযুগল দেখা যায়। আসলে তত দিনে ‘Yellow’ শব্দটি পুলিৎজার-হার্স্টের সংবাদপত্র-যুদ্ধের পরিচিত ব্যঙ্গাত্মক অভিধায় পরিণত হয়েছিল। তবে শব্দটি জন্ম নেওয়ার পর খুব দ্রুতই এর অর্থ ইয়েলো কিডের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়। এটি এমন সাংবাদিকতার নাম হয়ে দাঁড়ায়, যেখানে সত্যের যথার্থতার চেয়ে সংবাদকে যতটা সম্ভব উত্তেজক করে তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তারপর এলো কিউবা
হলুদ সাংবাদিকতার ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় শুরু হয় কিউবাকে কেন্দ্র করে। ১৮৯০-এর দশকে কিউবায় স্পেনের ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ চলছিল। হার্স্টের জার্নাল ও পুলিৎজারের ওয়ার্ল্ড সেখানে স্প্যানিশ বাহিনীর নির্যাতন, সংঘর্ষ এবং মানবিক দুর্দশার খবর ব্যাপকভাবে প্রকাশ করছিল। এর মধ্যে অনেক ঘটনা সত্যি ছিল। কিন্তু প্রতিযোগিতার বাজারে কিছু খবরকে নাটকীয় করা, ভয়াবহতা বাড়িয়ে তুলে ধরা কিংবা পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়া দাবি ছাপানোর অভিযোগও ছিল।
১৮৯৮ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। হাভানা বন্দরে থাকা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস মেইন-এ ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। ২৬০ জনের বেশি মার্কিন নাবিক ও কর্মকর্তা প্রাণ হারান। তখন বিস্ফোরণের প্রকৃত কারণ পরিষ্কারভাবে জানা যায়নি। কিন্তু মার্কিন সংবাদপত্রের একটি অংশ এমনভাবে খবর প্রকাশ করতে থাকে যেন এর পেছনে স্পেনই জড়িত।
যুদ্ধের আবহ দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এপ্রিলেই যুক্তরাষ্ট্র ও স্পেন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। হলুদ সাংবাদিকতা কি তাহলে সত্যিই স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছিল? বিষয়টি আসলে এভাবে বলার উপায় নেই।
সংবাদপত্র জনগণকে তাতিয়ে তুলেছিল, স্পেনবিরোধী আবেগ নিয়ে ব্যবসা করেছিল- এই ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কিউবার স্বাধীনতা সংগ্রাম, স্পেনের নীতি, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ এবং দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা উত্তেজনাও যুদ্ধের পেছনে কাজ করেছিল। তাই শুধু হার্স্ট-পুলিৎজারের সংবাদপত্রই যুদ্ধের পেছনে মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে- এমনটা ভাবা বোকামির নামান্তর।
তবে সেই সময় সংবাদমাধ্যম কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, তার চমৎকার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৮৯৮ সালের একটি বিখ্যাত রাজনৈতিক কার্টুনে। সেখানে পুলিৎজার ও হার্স্টকে ইয়েলো কিডের পোশাকে দেখানো হয়েছিল, আর মাঝখানে বিশাল অক্ষরে লেখা ছিল: ‘WAR’।
ইয়েলো কিড হারিয়ে গেল… ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ রয়ে গেল
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইয়েলো কিডের জনপ্রিয়তা কমে যায়। পুলিৎজার ও হার্স্টের সেই তুমুল সার্কুলেশন যুদ্ধও একদিন ইতিহাস হয়ে যায়। কিন্তু আশ্চর্যভাবে বেঁচে যায় তাদের প্রতিযোগিতা থেকে জন্ম নেওয়া শব্দটি।
আজ ‘হলুদ সাংবাদিকতা’ বলতে আর কোনো হলুদ জামা পরা কার্টুনকে বোঝায় না। বোঝায় এমন সংবাদচর্চাকে, যেখানে পাঠকের আবেগকে ইচ্ছাকৃতভাবে উসকে দেওয়া হয়; শিরোনাম যেন খবরের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে; সত্যের সঙ্গে মিশে যায় অনুমান; অসম্পূর্ণ তথ্যকে পূর্ণ সত্যের মতো দেখানো হয়; কিংবা সংবাদকে এমনভাবে সাজানো হয় যাতে মানুষ আগে ক্লিক করে, পরে সত্য-মিথ্যা নিয়ে ভাবুক!
প্রযুক্তি বদলেছে। পুলিৎজার ও হার্স্টের ছাপাখানার জায়গায় এসেছে ওয়েবসাইট, ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক। রাস্তার সংবাদপত্র বিক্রেতার হাঁকের জায়গায় এসেছে নোটিফিকেশন আর নিউজফিড। কিন্তু মানুষের মনোযোগ কেড়ে নেওয়ার লড়াইটি খুব বেশি বদলায়নি।
আর তাই প্রায় ১৩০ বছর পরও যখন কোনো সংবাদ সত্যকে পেছনে ফেলে চাঞ্চল্যকে সামনে নিয়ে আসে, তখন আমরা অজান্তেই ফিরে যাই ১৮৯০-এর দশকের নিউইয়র্কে; দুই সংবাদপত্রের মালিকের তীব্র লড়াই আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা সেই অদ্ভুত টাকমাথার শিশুটির কাছে। তার গায়ে ছিল একটি হলুদ জামা। সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল সাংবাদিকতার ইতিহাসের সবচেয়ে কুখ্যাত শব্দগুলোর একটি- হলুদ সাংবাদিকতা।
ফিচার ইমেজ: LIBRARY OF CONGRESS/DAGLI ORTI/AURIMAGES
তথ্যসূত্র
- The Yellow Kid Makes His Move – Library of Congress
- Yellow Journalism: Topics in Chronicling America – Library of Congress
- Did Yellow Journalism Fuel the Outbreak of the Spanish American War? – History.com
- Spanish American War – History.com