Skip to main content

Ridge Bangla

ইউক্রেনের দুর্লভ খনিজের জন্য আমেরিকা কেন এত মরিয়া?

বেশ কিছুদিন আগে আমেরিকার সাথে ইউক্রেনের নতুন একটি চুক্তি হয়ে গেল। দুর্লভ খনিজ পদার্থের এই চুক্তির বেশ ভালোরকমের আলোড়ন তৈরি করেছিল কিছুদিন আগে। প্রায় দুই মাস ধরে এটা নিয়ে নাটকীয়তার কোন শেষ ছিল না। হোয়াইট হাউসে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে ডেকে নিয়ে গিয়ে রীতিমতো অপমান করা হলো। এমনকি ইউক্রেনের নিরাপত্তাবিষয়ক যেকোন আলোচনার ক্ষেত্রে শর্ত দেয়া হল আগে দুর্লভ খনিজ চুক্তি করতে হবে। উপায়ান্তর না পেয়ে ইউক্রেন রাজি হয়ে গেল শেষ পর্যন্ত।

এই চুক্তির মূল বক্তব্য হচ্ছে ভবিষ্যতে নিরাপত্তা প্রদানের বিনিময়ে ইউক্রেনের খনিজ পদার্থের উপর আমেরিকা কিছু অধিকার লাভ করবে। এছাড়া ইউক্রেনের পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে যৌথ তহবিলের কথাও বলা হয়েছে। ইউক্রেনের পক্ষে স্বাক্ষরকারী কর্মকর্তা বলেছেন- এই চুক্তির ফলে ইউক্রেনে বিনিয়োগের দ্বার উন্মোচিত হবে, আবার অনেকে বলছেন- এই চুক্তিটি অনেক দিক থেকে ‘ঔপনিবেশিক’।

ইউরোপে ইউক্রেনের মূল পরিচিতি মূলত ‘রুটির ঝুড়ি’ হিসেবে। ইউরোপ তো বটেই পৃথিবীর অন্যতম প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনকারী দেশ হচ্ছে ইউক্রেন। তবে খাদ্যশস্যের পাশাপাশি দেশটিতে প্রচুর পরিমাণ খনিজ সম্পদেরও খনি রয়েছে, যার বিশাল অংশে এখনও পর্যন্ত কোনো খনন কাজ চালানো হয়নি। আমেরিকা মূলত এই অধরা খনিজ সম্পদের জন্যই মরিয়া হয়ে উঠেছে। এর পেছনে কারণও রয়েছে।

ইউক্রেনে অনেক ‘দুর্লভ’ পদার্থের খনি রয়েছে, যে পদার্থগুলো অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র বা যন্ত্রাংশ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। একদিকে এই পদার্থগুলোর যেমন কোনো বিকল্প নেই, তেমনই পদার্থগুলোর যোগানও সীমিত। আবার যেসব দেশে এই পদার্থগুলো পাওয়া যায়, তারা ভূরাজনৈতিক খেলার চাল হিসেবে এই পদার্থগুলোর সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সব মিলিয়ে ইউক্রেনের খনিজ পদার্থের ক্ষেত্রে আমেরিকার তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য বিকল্প ছিল না।

ইউক্রেনের হিসাবে পৃথিবীর মোট দুর্লভ খনিজ পদার্থের ৫ শতাংশ রয়েছে দেশটিতে। এর মধ্যে প্রায় ১৯ মিলিয়ন টন গ্রাফাইট রয়েছে। ইউরোপে যে পরিমাণ টাইটানিয়াম সরবরাহ করা হয়, তার ৭ শতাংশ রয়েছে দেশটিতে। ইউরোপে মোট যে পরিমাণ লিথিয়াম রয়েছে, তার এক-তৃতীয়াংশ রয়েছে শুধু ইউক্রেনে। প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ঘোষণা দিয়েছেন, ইউরোপের সবচেয়ে বেশি ইউরেনিয়াম মজুদ রয়েছে দেশটির মাটির নিচে। দস্তা, রূপা, নিকেল ও কোবাল্টেরও বিশাল মজুদ রয়েছে দেশটিতে। এর পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে ৩৪টি পদার্থকে ‘দুর্লভ’ হিসেবে চিহ্নিত করে, তার মধ্যে ২২টিই রয়েছে ইউক্রেনে।

 

 

বৈদ্যুতিক গাড়িগুলোর ব্যাটারিতে গ্রাফাইট কাজে লাগে। টাইটানিয়াম হচ্ছে একটি হালকা ধাতু, যেটি উড়োজাহাজ নির্মাণ থেকে বৈদ্যুতিক স্টেশন– অনেক কিছু নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। লিথিয়াম ব্যাটারির ক্ষেত্রে লিথিয়াম একটি অপরিহার্য উপাদান। পারমাণবিক চুল্লি ও পারমাণবিক বোমা তৈরিতে ইউরেনিয়াম ও বেরিলিয়ামের কোনো বিকল্প পাওয়া যায় না৷ ল্যান্থানাম ও সেরিয়াম টিভি ও বাতি নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া আরও অনেকগুলো দুর্লভ খনিজ পদার্থ রয়েছে যেগুলো অস্ত্রনির্মাণ শিল্প, উইন্ড টারবাইন ও ইলেক্ট্রনিক্স পণ্য তৈরির জন্য অপরিহার্য হিসেবে গণ্য করা হয়। যেহেতু এই পদার্থের যোগান অনেক কম, তাই স্বাভাবিকভাবেই এসবের গুরুত্ব অনেক বেশি।

পৃথিবীতে যত দুর্লভ খনিজ পদার্থ রয়েছে, সেসবের একটি বড় অংশের দখল রয়েছে চীনের হাতে। ধারণা করা হয়, পৃথিবীর ৯০ শতাংশ দুর্লভ খনিজ মজুদ আছে চীনে। সম্প্রতি চীন ও আমেরিকার মধ্যে যে বাণিজ্য যুদ্ধের সূচনা হয়েছে তাতে চীনা পণ্যের উপর শুল্ক বাড়িয়ে দেয়ার প্রতিক্রিয়ায় চীন আমেরিকায় দুর্লভ খনিজ পদার্থ রপ্তানির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে।

এই বিষয়টি আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের উপর কপালে ভাঁজ ফেলে দেয়। তারা অতি দ্রুত চীনের বিকল্প খুঁজতে শুরু করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতেই তারা ইউক্রেনের দিকে মনোযোগী হন। ইউক্রেনের খনিজ সম্পদের মাধ্যমে চীনের উপর থেকে যেমন আমেরিকার নির্ভরতা কমে আসবে, তেমনই ইউক্রেনও এর দ্বারা উপকৃত হবে। বিনিয়োগ আসলে ইউক্রেন সরকার ট্যাক্স পাবে, দেশটিতে আরও বেশি কর্মসংস্থান তৈরি হবে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশটির পুনর্গঠনে এসবের কোন বিকল্প নেই।

কিন্তু সবকিছু যতটা সহজ ভাবা হচ্ছে, পরিস্থিতি আসলে ততটা সহজ নয়। ইউক্রেনের এক-পঞ্চমাংশ এলাকা বর্তমানে রাশিয়ার দখলে এবং ধারণা করা হয় ইউক্রেনের মোট দুর্লভ খনিজ পদার্থের ৫০ শতাংশ এই অঞ্চলে মজুদ রয়েছে। এছাড়াও ইউক্রেনের লৌহশিল্পের জন্য অতিপ্রয়োজনীয় কয়লার ৬০ শতাংশেরও বেশি মজুদ রয়েছে দেশটির রাশিয়া অধিকৃত অঞ্চলে। এছাড়াও ইউক্রেনের মোট ধাতব খনিজের ৪০ শতাংশ এখন রাশিয়ার দখলে রয়েছে। দোনেতস্ক এবং জাপোরিঝিয়া– এই দুটি অঞ্চলে ইউক্রেনের দুটি লিথিয়াম খনিও এখন রাশিয়ার আয়ত্তে।

রাশিয়ার অধিকৃত অঞ্চলে যেহেতু ইউক্রেনের কোনো কর্তৃত্ব নেই, তাই এই অঞ্চলের খনিজ পদার্থগুলোর ভবিষ্যৎ কী হবে তা নিয়ে এখন পর্যন্ত কিছুই অনুমান করা যাচ্ছে না। আবার রাশিয়া ধীরে ধীরে ইউক্রেনের আরও বেশি পরিমাণ জায়গা দখলের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এভাবে আরও বেশি পরিমাণ খনিজ পদার্থ হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইউক্রেন এই মুহুর্তে কূটনৈতিকভাবে এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে আমেরিকা তার জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে যে দাবিই উপস্থাপন করুক না কেন, ইউক্রেন তা মেনে নিতে বাধ্য। রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকার সমর্থন হাতছাড়া হওয়া মানে গাছে তুলে মই কেড়ে নেয়ার মতো অবস্থা। আবার ইউরোপের এককভাবে কোনো সামর্থ্য নেই ইউক্রেনকে টানা সহযোগিতা করে যাওয়ার। সব মিলিয়ে একদিকে দুর্লভ খনিজ পদার্থ আহরণের জন্য আমেরিকার কাছে ইউক্রেনের যেমন কোনো বিকল্প নেই, ঠিক তেমনই আমেরিকার সমর্থন হাতছাড়া করা ইউক্রেনের জন্য কোনো যৌক্তিক সমাধান নয়।

তথ্যসূত্র:

১) What minerals does Ukraine have and what are they used for?

২) What are Ukraine’s rare earths and why does Trump want them?

৩) What to know about Ukraine’s rare earth minerals, which the U.S. wants

This post was viewed: 49

আরো পড়ুন