Skip to main content

Ridge Bangla

নারী ফারাওরা ইতিহাস থেকে হারিয়ে গেল কেন?

প্রাচীন মিশরের ইতিহাসে নারী শাসকেরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তা আধুনিক পাঠকের কাছে আজও এক রহস্যময় ধাঁধা। হাতশেপসুতের মতো নারী ফারাওদের নাম পরিচিত হলেও, বাস্তবে এমন আরও অনেক নারী ছিলেন যাঁরা মিশরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তবে তাঁদের অনেকেই ইতিহাসের পাতায় চিহ্নিত নন। ফলে নারী ফারাওদের সংখ্যা, ক্ষমতা এবং প্রভাব আজও গবেষণার বিষয় হয়ে রয়ে গেছে।

পরিচিত কয়েকজন নারী ফারাও

সবচেয়ে পরিচিত নারী ফারাও হলেন হাতশেপসুত, যিনি প্রায় দুই দশক ধরে মিশর শাসন করেন এবং তাঁর শাসনকালের নানা চিত্র ও নির্মাণ এখনও সুস্পষ্টভাবে দেখা যায়। তাঁর প্রকৃত শাসনক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, নেফারতিতির বিখ্যাত মূর্তি তাঁকে জনপ্রিয় করে তুলেছে। অন্যদিকে, ক্লিওপেট্রা সপ্তম ছিলেন রোমান যুগের অন্যতম আলোচিত এক নারী ফারাও। তাঁর জীবন, প্রেম এবং রাজনীতি বহু নাটক ও চলচ্চিত্রে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

এছাড়াও ইতিহাসে স্থান পেয়েছেন তাওসারেত, যিনি ঊনবিংশ রাজবংশে শাসন করেছিলেন। নিথিক্রেটকে ষষ্ঠ রাজবংশের প্রথম নারী ফারাও বলে মনে করা হয়। যদিও শাসনকালে তিনি ‘রাজা’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রাচীনভাবে স্বীকৃত নারী ফারাও হলেন সোবেকনেফেরু, যিনি খ্রিষ্টপূর্ব ১৭৬০ সাল থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ১৭৫৬ সাল পর্যন্ত মিশর শাসন করেন।

সোবেকনেফেরুর গল্প

সোবেকনেফেরুর রাজ্যাভিষেক একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তাঁর পিতা আমেনেমহেত তৃতীয়ের মৃত্যুর পর রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। সন্তান আমেনেমহেত চতুর্থ, কন্যা নেফেরুপতাহ, নাকি সোবেকনেফেরু; কার কাছে যাবে সিংহাসন? বহু নাটকীয়তার পর সিংহাসনে আসীন হন আমেনেমহেত চতুর্থ। দশ বছর শাসনের পর তিনি মারা গেলে ক্ষমতা যায় সোবেকনেফেরুর কাছে। এই ঘটনার মাধ্যমে বোঝা যায়, পুরুষ উত্তরাধিকারের প্রতি সমাজের ঝোঁক থাকলেও রাজপরিবারের রক্তসম্পর্কই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নারী ফারাও এবং মিশরীয় সমাজব্যবস্থা

প্রাচীন মিশরে নারী ও পুরুষের মাঝে সামাজিক ও আইনি সমতা বিরাজ করত। নারীরা সম্পত্তির মালিক হতে পারতেন, ব্যবসা করতে পারতেন, এমনকি সামরিক অভিযানে কৃতিত্ব অর্জনের মাধ্যমে সম্মান লাভ করার সুযোগও ছিল। উচ্চবিত্ত নারীরা রাজনীতি ও ধর্মীয় কার্যাবলিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন।

পুরুষের ছদ্মবেশে নারীর শাসন

আইনগতভাবে নারী ও পুরুষের সমান অধিকার থাকলেও, ফারাও পদটি মূলত পুরুষের জন্যই নির্ধারিত ছিল। তাই নারী শাসকেরা নিজেদের বৈধতা প্রমাণের জন্য পুরুষের রূপ ধারণ করতেন। তাঁরা পেতেন রাজমুকুট, পুরুষালি পোশাক ও দাড়ির প্রতীক। ফারাও হাতশেপসুতের ক্ষেত্রে দেখা যায়, শাসনকালের শেষদিকে তাঁর মূর্তি ও চিত্রাবলিতে পুরুষের চেহারা ও পোশাকের ছাপ স্পষ্ট। শুধু মুখমণ্ডলের সূক্ষ্মতা নারী পরিচয় দেয়। নারীদেরকে ‘ফারাও’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে, এমন নজির খুবই কম। মূলত তাঁদের পদবি, শাসনকাল ও পরিচয়ের অস্পষ্টতা এবং পুরুষতান্ত্রিক ঐতিহ্যের জাঁতাকলে তাঁদের অনেকেই হারিয়ে গেছেন ইতিহাসের পাতায়।

মিশরীয় রাজনীতিতে এক ধরনের বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে নারী শাসকদের পদবি। অনেক নারী প্রকৃতপক্ষে দেশের সর্বময় ক্ষমতা হাতে নিলেও, তাঁদের পরিচিতি ছিল ‘রানি’ বা ‘রাজামাতা’ হিসেবে। এই পদবিগুলোর ধর্মীয় তাৎপর্য ছিল গভীর। যেমন, রানীকে দেবী আইসিসের প্রতিরূপ ভাবা হতো। ফলে এসব উপাধি ফেলে দিয়ে নিজেকে ফারাও ঘোষণা করা শুধু দুঃসাহসিক পদক্ষেপ নয়, ছিল রাজতন্ত্রের শুদ্ধতা রক্ষারও প্রশ্ন।

হাতশেপসুটের ক্ষেত্রটি এখানে প্রাসঙ্গিক। তিনি প্রথমে ছিলেন তাঁর সৎপুত্রের (থুথমোস তৃতীয়) রিজেন্ট বা প্রতিনিধি। থুথমোস তৃতীয় তখন সবেমাত্র দুই বছরের শিশু। রাজনৈতিক অস্থিরতা ঠেকাতে হাতশেপসুত শাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে দেবতা আমুনের কন্যা ও পত্নী বলে দাবির মাধ্যমে নিজেকে সরাসরি ফারাও হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। পুরোনো চিত্র ও শিলালিপিতে নিজের রানীরূপ মুছে ফেলে নতুন করে পুরুষ ফারাওয়ের রূপে নির্মাণ করেন নিজ প্রতিকৃতি।

সংকটকালীন দায়িত্বে নারী শাসক

প্রশ্ন আসতে পারে, নারী ফারাও কি শুধু সংকট নিরসনের হাতিয়ার ছিলেন? ইতিহাস বলছে, এমনটা বহুবার ঘটেছে। শাসক পুরুষ উত্তরাধিকারীর অনুপস্থিতি বা অকাল মৃত্যুর ফলে, রাজবংশের একমাত্র উত্তরসূরি হিসেবে নারীকেই দায়িত্ব নিতে হয়েছে। কারণ, মিশরে রাজশক্তি ছিল দেবতাদের দান। ফারাও ছিলেন ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে সংযোগসেতু। সুতরাং, তাঁর রক্তসম্পর্ক থাকাটাই ছিল প্রধান। মিশরীয়দের বিশ্বাস ছিল, যদি সঠিক উত্তরাধিকারী না আসে, তবে দেবতা মাত রুষ্ট হবেন এবং রাজ্যে নেমে আসবে বিশৃঙ্খলা।

এ কারণে অনেক সময় একজন রাণীকেও ফারাও হিসেবে মান্য করা হয়েছে। কিন্তু তাঁকে প্রকাশ্যে ‘রাজা’ বলা হয়নি। তাঁর উপাধি ছিল ‘রাজামাতা’, ‘রিজেন্ট’ বা ‘রানি’। তাঁরা সত্যিকার অর্থে রাজ্যের দায়িত্বে থাকলেও, পরবর্তীকালে তাঁদের ফারাও হিসেবে না চিহ্নিত করায় ইতিহাসে তাঁদের অবস্থান আজও অস্পষ্ট।

ইতিহাসের আড়ালে নারী শাসকদের পরিচয়

কেবল নারী বলেই নয়, প্রাচীন মিশরের অনেক ফারাওয়ের নাম ও কীর্তি হারিয়ে গেছে ইতিহাসের গর্ভে। সমাধিচুরি, রাজ্যবিপ্লব, বা রাজনৈতিক চক্রান্তে তাঁদের অবদান মুছে ফেলা হয়েছে। তার উপর, নারী ফারাওদের অনেকেই পুরুষবেশে শাসন করেছেন। ফলে, পুরুষ ফারাওদের ভাস্কর্য আর নারী ফারাওদের চিত্র মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। অনুমান করা হয়, আজ যেসব চিত্র বা প্রতিমা আমরা পুরুষ ভেবে রেখেছি, তার অনেকগুলিই হতে পারে নারীদের।

হাতশেপসুতের পরে যারা ক্ষমতা এসেছেন, তাঁদের মধ্যে সাবেকনেফেরু, তাওসারেত, কিংবা নিতিক্রিস উল্লেখযোগ্য। তাঁদের নাম কখনো কখনো পুরুষরূপে লেখা হয়েছে, বা পুরুষ উত্তরাধিকারীর ছায়ায় তাঁরা হারিয়ে গেছেন।

নারী ফারাওদের ইতিহাস নিছক কৌতূহলের বিষয় নয়। এটি রাজনীতি, সমাজ ও ধর্মের গতিপথ বুঝতে সাহায্য করে। তাঁদের অধিকাংশই এসেছিলেন ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে; যখন সংকট ঘনিয়ে এসেছিল, রাজবংশ বিপন্ন হয়েছিল, কিংবা দেবতাদের রোষ আশঙ্কিত হয়েছিল দেশমাতৃকা। তাঁরা সেই মুহূর্তে এগিয়ে এসেছেন দায়িত্ব নিতে। তাঁদের নাম, মুখ ও পদবি সময়ের ধুলোয় ঝাপসা হলেও, তাঁদের ভূমিকা ছিল গভীর ও সুস্পষ্ট।

তথ্যসূত্র

১। Why Are Most Female Pharaohs Unrecorded in History?

২। The forgotten female pharaohs of ancient Egypt

৩। Hatshepsut: The Female Pharaoh Almost Lost to History

৪। The truth behind Egypt’s female pharaohs and their power

৫। Women in Ancient Egypt

This post was viewed: 59

আরো পড়ুন