সাম্প্রতিক সময়ে বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি বা বিএলএ পাকিস্তানের একটি যাত্রীবাহী ট্রেন জিম্মি করার ঘটনার মাধ্যমে আলোচনায় আসে। তারা ট্রেনের প্রায় চারশো যাত্রীকে আটকে রাখে এবং মুক্তিপণ হিসেবে পাকিস্তান সরকারের হাতে বন্দী বেলুচিস্তানের স্বাধীনতকামী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের মুক্তি দাবি করে। পাকিস্তান সরকার সেই দাবি মেনে না নিয়ে সামরিক অপারেশনের মাধ্যমে ট্রেনের যাত্রীদের মুক্ত করে। তবে এতে বিএলএ সদস্যদের পাশাপাশি প্রায় বিশজন বেসামরিক যাত্রীও নিহত হন। এই ঘটনার মাধ্যমে বেলুচিস্তানের সাথে পাকিস্তান মূল ভূখণ্ডের জটিল সম্পর্ক, বেলুচিস্তানিদের স্বাধীন হওয়ার বাসনা ও উপমহাদেশের স্বাধীনতাবাদী আন্দোলনের আরেক রূপ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের দ্বারা মূলধারায় চলে আসে।
উপরোক্ত ঘটনায় বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মিকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার সুযোগ আছে। পাকিস্তানিদের কাছে বিএলএ হচ্ছে ভারতের সমর্থনপুষ্ট একটি সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী, যারা পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বে আঘাত হানতে চায়। একাত্তরের সময় আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা যেমন তাদের কাছে ছিল ‘ভৌগোলিক অখন্ডতা বিনষ্টকারী ভারতীয় চর’, এখনকার বেলুচিস্তানি যোদ্ধারাও তাদের কাছে ঠিক তেমনই। আবার বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মির প্রবল জনপ্রিয়তা রয়েছে বেলুচিস্তানে। সেই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে তারা অনেক সম্মানিত চরিত্র। পাকিস্তানিদের শোষণ ও নিপীড়নের হাত থেকে বাঁচতে এই যোদ্ধারা বেলুচিস্তানের নাগরিকদের স্বপ্নের পালে হাওয়া দেন। কিন্তু কেন বেলুচিস্তান অঞ্চলটি পাকিস্তানের থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেতে চায়?
ব্রিটিশ শাসনামলে যে দুটো জাতিকে শাসন করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি বাধার সম্মুখীন হয়েছিল ব্রিটিশ, তার মধ্যে একটি হলো বেলুচ, আরেকটি হলো পশতু। ‘ভাগ করো, শাসন করো’ নীতির মাধ্যমে এই দুটো অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে ব্রিটিশরা সফল হলেও তখনও এই জাতিসত্ত্বার বেশ বড় অংশের নেতারা ব্রিটিশদের পরোয়া করতেন না। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার সময় অনেক ‘প্রিন্সলি স্টেট’ এর মতো বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত বেলুচ রাজ্যকেও ভারত বা পাকিস্তান– দুটোর একটি বেছে নিতে বলা হয়। তৎকালীন বেলুচিস্তানের কালাত রাজ্যের খান স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও পরবর্তীতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তোপের মুখে তিনি পাকিস্তানে যোগ দিতে বাধ্য হন। বেলুচিস্তানের নাগরিকরা এটাকে মোটেও ভালোভাবে নেননি। মজার ব্যাপার হচ্ছে, পাকিস্তানের স্বপ্নদ্রষ্টা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ শুরুতে বেলুচিস্তানকে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করতে তেমন আগ্রহী ছিলেন না।
বেলুচিস্তান যে পাকিস্তান থেকে আলাদা হতে চায়, এর অন্যতম প্রধান একটি কারণ হচ্ছে অর্থনৈতিক শোষণ। অঞ্চলটি অনুর্বর ও কৃষিকাজের জন্য তেমন উপযোগী না হলেও বিভিন্ন মূল্যবান খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ। তেল, গ্যাস, কয়লা কিংবা বিভিন্ন ধাতব খনিজেরও বিপুল মজুদ রয়েছে এই অঞ্চলে। কিন্তু এতসব খনিজ থাকার পরও সেসব উত্তোলনের পর অতি অল্প অংশই এই অঞ্চলটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যয় হয়৷ ১৯৫২ সালে এই অঞ্চলে প্রাকৃতিক গ্যাসের সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গিয়েছে এই গ্যাসের সুফল ভোগ করছে পাঞ্জাব ও অন্যান্য রাজ্য। একই চিত্র দেখা যায় কয়লার ক্ষেত্রেও। ব্রিটিশ আমল থেকে কয়লা উত্তোলন শুরু হলেও তার সুফল বেলুচিস্তানবাসী পায় না৷ যেহেতু এই অঞ্চল বরাবরই অবহেলিত থেকেছে, তাই এখানে উন্নতিরও ছোঁয়া লাগেনি। সামগ্রিকভাবে এই অঞ্চলে বেকারত্ব অনেক বেশি।
বেলুচিস্তানিদের ক্ষোভের আরেকটি বড় কারণ হলো পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতিতে বেলুচিস্তানের রাজনীতিবিদদের কোণঠাসা করে রাখা ও সঠিক মূল্যায়ন না করা। পাকিস্তানের রাজনীতিতে পাঞ্জাবিদের আধিক্য স্বাধীনতার পর থেকেই। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বাকিদের আড়ালে থেকে যেতে হয়। আবার দেশটির রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর অযাচিত প্রভাবের কথা কারও অজানা নয়। সেনাবাহিনীর কারণে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের দাবি জানানোরও উপায় নেই বেলুচিস্তানিদের। বেসামরিক সরকারের কাছে দাবিদাওয়া জানানোর তার কিছুটা জায়গা থাকে। কিন্তু সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ববাদী শাসনের মুখে দাবিদাওয়া জানানোর চেষ্টা করলেই বিভিন্ন নিপীড়নের শিকার হতে হয়। আবার সাংস্কৃতিকভাবেও নিপীড়নের শিকার হয়েছে বেলুচিস্তানিরা। পাকিস্তানের মূলধারার সংস্কৃতির সাথে বেলুচদের সংস্কৃতি অনেকখানি আলাদা। এটাকেও দমন করার চেষ্টা করা হয়েছে নানাভাবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই বেলুচিস্তানিরা কখনই পাকিস্তানকে নিজেদের দেশ হিসেবে ভাবতে পারেনি।
বেলুচিস্তানিদের যে স্বাধীনতাকামী আন্দোলন তার মূলে রয়েছে অর্থনৈতিক নিপীড়ন, পাকিস্তানের জাতীয় রাজনীতিতে তাদের কোণঠাসা করা ও সাংস্কৃতিক দমন-পীড়ন। সাধারণত কোনো দেশে স্বাধীনতাকামী আন্দোলন তখনই জনপ্রিয়তা লাভ করে, যখন স্বাধীনতাকামী অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মানুষেরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বছরের পর বছর ধরে বৈষম্য ও অবহেলার শিকার হয়ে থাকেন। বেলুচিস্তানিদের ক্ষেত্রেও চিত্রটি একই। সম্প্রতি বেলুচিস্তানের একটি জাতীয় সংগঠন স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও বাইরের বিশ্বের দ্বারা তারা তেমন স্বীকৃতি পায়নি। বেলুচিস্তানের ন্যায্য অধিকারকে স্বীকৃতি না দিলে, দমন-পীড়ন বন্ধ না করলে একদিন হয়তো আসলেই পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যেতে পারে খনিজ সম্পদে পরিপূর্ণ এই অঞ্চলটি।
তথ্যসূত্র:
১) The Balochistan Story: Jinnah Betrayal, Armed Rebellion, Bangladesh Impact
৩) Why Balochistan want independence from Pakistan? Written by: Dedig Khomari