Skip to main content

Ridge Bangla

কে এই জোহরান মামদানি?

ছয় মাস আগেও নিউ ইয়র্কের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তাকে চিনতো না। কিন্তু এখন নিউ ইয়র্কের গন্ডি পেরিয়ে তার সাফল্যগাঁথা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো বিশ্বে। বলা হচ্ছে জোহরান মামদানির কথা। আমেরিকার রাজনৈতিক দৃশ্যপটে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত নামগুলির মধ্যে একটি হলো জোহরান মামদানি।

সম্প্রতি নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচনের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে অভাবনীয় জয়লাভ করে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন তিনি। শুধু নিউ ইয়র্ক নয়, তার এই সাফল্য পুরো আমেরিকায় ডেমোক্রেটিক দলের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। জোহরান মামদানি যেমন একদিকে চিরাচরিত রাজনৈতিক ধারাকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছেন, তেমনই অন্যদিকে নতুন প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করছেন তিনি।

মজার ব্যাপার হলো, মার্কিন রাজনীতিতে তোলপাড় ওঠানো এই তরুণ রাজনীতিবিদের জন্ম উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায়। সাত বছর বয়সে তার পরিবারের সাথে তিনি নিউ ইয়র্কে চলে আসেন। তার পরিবারের সদস্যরা বেশ নামকরা ব্যক্তিত্ব। তার মা হলেন প্রখ্যাত ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার। তার বাবা উগান্ডার প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ মাহমুদ মামদানি।

মীরা নায়ার বেশ দুর্দান্ত কিছু ছবি পরিচালনা করেছেন। আর মাহমুদ মামদানি আফ্রিকার ইতিহাস, রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে তার ক্ষেত্রের বিশ্বনন্দিত লেখকদের একজন। নিউ ইয়র্কের ব্রংক্স হাই স্কুল অফ সায়েন্স এবং মেইনের বোওডুইন কলেজে পড়াশোনা শেষ করার পর জোহরান মামদানি প্রাথমিকভাবে একজন ‘হাউজিং কাউন্সেলর’ এবং ‘হিপ-হপ মিউজিশিয়ান’ হিসেবে কাজ করেন। মূলত এই সময়েই সরাসরি রাজনীতির সংস্পর্শে আসেন তিনি। নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে সরকারি উচ্ছেদ থেকে রক্ষা করার তাগিদ থেকেই তিনি রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নেয়ার প্রাথমিক অনুপ্রেরণা লাভ করেন। সমাজের নিম্ন স্তরের মানুষের দুঃখ-দুর্দশা তার রাজনৈতিক দর্শনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।

জোহরান মামদানির আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় খাদের এল-ইয়াতিম এবং রস বার্কানের নির্বাচনী প্রচারণার ‘ম্যানেজার’ হিসেবে। ২০২০ সালে তিনি নিউ ইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হন। তার রাজনৈতিক জীবনে এটি ছিল একটি দিকপরিবর্তনকারী ঘটনা। তিনি চার মেয়াদে দায়িত্ব পালন করা আরাভেলা সিমোটাসকে পরাজিত করে চমক সৃষ্টি করেন সেবার।

২০২২ এবং ২০২৪ সালেও তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনরায় নির্বাচিত হন। এটি অ্যাসেম্বলিতে তার ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং প্রভাবের ইঙ্গিত বহন করে। অ্যাসেম্বলির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হিসেবে তিনি আবাসন এবং পরিবহন সংস্কারের উপর বিশেষ জোর দেন। তিনি নিউ ইয়র্ক সিটির পাঁচটি বাস রুটে এক বছরের জন্য ভাড়া-মুক্ত পাইলট প্রোগ্রাম চালু কন, যা জনপরিবহনকে আরও সহজলভ্য করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

তবে জোহরান মামদানির রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় মোড় দেখা গিয়েছে ২০২৫ সালে, নিউ ইয়র্ক সিটি মেয়র নির্বাচনের ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে। এই প্রাইমারিতে তিনি সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুওমোকে পরাজিত করেন এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। সামনের সাধারণ নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দল থেকে তিনিই নির্বাচনে অংশ নেবেন। প্রাইমারি নির্বাচনের জরিপগুলোতে কুওমো উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকলেও সবাইকে অবাক করে দিয়ে মামদানি বিজয়ী হয়ে সাড়া ফেলে দিয়েছেন।

তারুণ্যের উদ্দীপনাকে কাজে লাগিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি যেভাবে প্রচারণা চালিয়েছেন, সেটি তার সাফল্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ডেমোক্রেটিক প্রাইমারিতে তার নির্বাচন স্লোগান ছিল ‘সাশ্রয়ী জীবনযাত্রা। দৈনন্দিন জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের কারণে নিউ ইয়র্কের মানুষের মাঝে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। এরকম বাস্তবতায় তার স্লোগান ও রাজনৈতিক রূপরেখা স্বাভাবিকভাবেই মানুষকে আকৃষ্ট করেছে।

মামদানির নির্বাচনী ইশতেহার এবং নীতিগত অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি নিউ ইয়র্কের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর দিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব আরোপ করেছেন। ডেমোক্রেটিক দলের রাজনীতির অন্যতম প্রধান বিষয় হলো মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা। বর্তমানে নিউ ইয়র্কের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে আবাসন সমস্যা। তার উল্লেখযোগ্য প্রস্তাবনাগুলোর মধ্যে রয়েছে অ্যাপার্টমেন্টের ভাড়া বৃদ্ধি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা, দ্রুতগতিতে সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ এবং অসৎ বাড়ি মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ। এছাড়াও তিনি ‘ডিপার্টমেন্ট অফ কমিউনিটি সেফটি’ নামের একটি বিভাগ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করেছেন, যা আবাসন সংক্রান্ত সমস্যাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও সমাধান করবে।

পরিবহন, সাশ্রয়ী জীবনযাত্রা ও শিক্ষা ও করারোপ সম্পর্কেও জোহরান মামদানির পরিষ্কার পরিকল্পনা রয়েছে। নিউ ইয়র্কের সমস্ত বাসে ভাড়া মওকুফ করা এবং দ্রুত, বিনামূল্যে বাস পরিষেবা নিশ্চিত করে শহরের পরিবহন ব্যবস্থাকে গণমুখী করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি। এছাড়া সরকারি উদ্যোগে মুদির দোকান স্থাপন করে কম মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ করা এবং কর্পোরেট একচেটিয়া কারবার প্রতিরোধ করার কথাও বলেন তিনি, যাতে করে সাধারণ মানুষ ন্যায্য মূল্যে খাদ্য ও অন্যান্য সামগ্রী পেতে পারে। বিভিন্ন উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থায়নের জন্য কর্পোরেশন এবং ধনীদের উপর ১০ বিলিয়ন ডলার কর বৃদ্ধির প্রস্তাব করেছেন। তিনি কর্পোরেট করের হার ৯% থেকে বাড়িয়ে ১১.৫% করার এবং এক মিলিয়ন ডলারের বেশি আয়ের উপর ২% অতিরিক্ত কর আরোপের পক্ষপাতী। এছাড়া তার অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বনিম্ন মজুরি ‘ত্রিশ ডলার প্রতি ঘন্টায়’ উন্নীত করা এবং অন্যান্য পেশাজীবী মানুষের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা, যাতে তারা ন্যায্য মজুরি ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ পান।

জোহরান মামদানি যে কেবল একজন নির্বাচিত প্রতিনিধি, সেটি ভাবলে ভুল হবে। তিনি বিভিন্ন বিষয়ে এক্টিভিজমও করে থাকেন। ট্যাক্সি ড্রাইভারদের ঋণ মুক্তির দাবিতে ১৫ দিনের অনশন কর্মসূচীতে অংশ নিয়েছিলেন একবার। তার অনশনের ফলে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি ঋণ মওকুফ করতে কর্তৃপক্ষ বাধ্য হয়েছিল। তার পদক্ষেপটি ছিল সাধারণ মানুষের প্রতি তার অঙ্গীকারের একটি উল্লেখযোগ্য প্রমাণ।

ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রতি তার দৃঢ় এবং স্পষ্ট সমর্থন তাকে প্রগতিশীল মহলে আরও জনপ্রিয়তা এনে দিয়েছে। নিউ ইয়র্কে পা রাখলে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে তিনি গ্রেফতার করবেন– এরকমটা তিনি সরাসরিই বলে থাকেন। বার্নি স্যান্ডার্স এবং আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের মতো জাতীয় পর্যায়ের প্রগতিশীল নেতারা তাকে সরাসরি সমর্থন করেন। নিউ ইয়র্কের শিক্ষক ইউনিয়ন সহ বিভিন্ন প্রভাবশালী শ্রমিক সংগঠনের সমর্থন মামদানির বিজয়কে আরও সুসংহত করেছে– এ কথা মোটেও অতিশয়োক্তি নয়।

জোহরান মামদানির উত্থান নিউ ইয়র্কের রাজনীতিতে একটি নতুন প্রজন্মের আগমনী বার্তা দিচ্ছে। তার সাহসী এবং প্রগতিশীল নীতিগুলো যদি সফল হয়, তবে সামনের দিনগুলোতে এর প্রভাব পড়তে পুরো বিশ্বরাজনীতিতে। তার রাজনৈতিক যাত্রায় যেভাবে নিউ ইয়র্কের সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হচ্ছে, তাতে তার জনসমর্থন ক্রমাগতভাবে বৃদ্ধি পাওয়াই স্বাভাবিক। নিউ ইয়র্কের অধিবাসীরা একটি সাশ্রয়ী, নিরাপদ এবং সকলের জন্য সমান সুযোগের শহর দেখতে চায় অনেক দিন ধরেই। ট্রাম্প ও রিপাবলিকান দলের উগ্র জাতীয়তাবাদী রক্ষণশীল রাজনীতির বিভিন্ন নীতির ফলে তারা বিভিন্ন দিল থেকে ভোগান্তির মধ্যে রয়েছে। তার এই উত্থান কেবল একটি নিছক নির্বাচনী বিজয় নয়,  বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিতবাহী ঘটনা।

তথ্যসূত্র:

১) Zohran Mamdani’s meteoric rise in New York signals a widespread desire for change among Democrats

২) Who is Zohran Mamdani?

৩) Who is Zohran Mamdani, New York’s mayor-elect?

This post was viewed: 47

আরো পড়ুন