Skip to main content

Ridge Bangla

পশ্চিমবঙ্গ ও দক্ষিণ ভারত: বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি যে দুই জায়গায় হোঁচট খেয়েছে

বর্তমানে ভারতের ক্ষমতাসীন দল হলো ভারতীয় জনতা পার্টি বা (বিজেপি)। দলটি পুরো ভারতের বেশিরভাগ অঞ্চলে এত বেশি প্রভাব বিস্তার ও মানুষের সমর্থন লাভ করতে সক্ষম হয়েছে যে এটি একসময় অকল্পনীয় বলে বিবেচিত হতো।

তবে ভারতের অনেক অঞ্চলের মতো পশ্চিমবঙ্গ এবং দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলোতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। সমগ্র ভারতে বিজেপির জয়জয়কার চললেও, এই দুই ভৌগোলিক অঞ্চলে তাদের কৌশল কেন বারবার হোঁচট খাচ্ছে, এটি নিয়ে দেশটির রাজনৈতিক পরিমন্ডলে বেশ আলোচনা রয়েছে।

বিজেপির উত্থান মূলত তাদের শক্তিশালী হিন্দুত্ববাদী ভাবাদর্শ এবং জাতীয়তাবাদী স্লোগানকে কেন্দ্র করে। উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে এই ভাবাদর্শ প্রবল জনসমর্থন লাভ করেছে। রাম মন্দির নির্মাণ থেকে শুরু করে অভিন্ন দেওয়ানি বিধির মতো বিষয়গুলো বিজেপির মূল রাজনৈতিক হাতিয়ার। বর্তমানে নাগরিকত্ব আইনের কথা বলে মুসলমানদের রাষ্ট্রহীন করার মতো ঘৃণ্য পদক্ষেপও হিন্দুত্ববাদীদের কাছে খুবই সমাদৃত হচ্ছে। কিন্তু এসবের পরও তারা পশ্চিমবঙ্গ এবং দক্ষিণ ভারতের মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসাধারণের সমর্থন লাভ করতে পারছে না। কারণ এই দুই অঞ্চলের সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট এই ভাবাদর্শের জন্য অনুকূল নয়।

পশ্চিমবঙ্গ ভারতের এমন একটি রাজ্য যেখানে ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে বাঙালি সংস্কৃতি ও ভাষার গুরুত্ব অনেক বেশি। এখানে ধর্মীয় বিভাজন অতীতেও সেভাবে বড় আকারের রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারেনি। বরং এখানে শ্রেণিসংগ্রাম এবং বামপন্থী আদর্শের একটি শক্তিশালী ঐতিহ্য রয়েছে।

বামপন্থীরা দীর্ঘসময় পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসীন ছিল। বর্তমানে তারা ক্ষমতা থেকে দূরে থাকলেও তাদের বেশ প্রভাব রয়েছে। বিজেপি চেষ্টা করেছে পশ্চিমবঙ্গে মেরুকরণের রাজনীতি আমদানি করতে, বিশেষত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিতে। ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগানকে তারা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

তবে, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মনন এই মেরুকরণকে সহজে গ্রহণ করেনি। তৃণমূল কংগ্রেস, বিশেষত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, বিজেপির এই হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডাকে ‘বহিরাগত’ আখ্যা দিয়ে প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন।

তৃণমূলের রাজনীতি বাংলার সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে গুরুত্ব দিয়েছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা সাদরে গ্রহণ করেছে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে মুসলমানরা একটা বড় ভোটব্যাংক। তৃণমূল তাদের অসাম্প্রদায়িক দলীয় চরিত্রের কারণে মুসলমানদের ভোট পেয়ে থাকে। দুর্গাপূজা থেকে শুরু করে স্থানীয় উৎসবগুলোতে তৃণমূলের অংশগ্রহণ এবং ‘মা-মাটি-মানুষ’ স্লোগান বিজেপির ধর্মীয় স্লোগানের পাল্টা হিসেবে কাজ করেছে।

এছাড়াও, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে স্থানীয় ইস্যু, যেমন- উন্নয়ন এবং সামাজিক প্রকল্প, ধর্মীয় আবেগের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পায়। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেলেও, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তারা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। এটিই প্রমাণ করে যে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলো, যেমন তামিলনাড়ু, কেরালা, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা এবং কর্ণাটক ভাষার ভিত্তিতে গঠিত এবং এখানে দ্রাবিড় সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক পরিচয়ের একটি দৃঢ় ঐতিহ্য রয়েছে। এই রাজ্যগুলোতে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের ধারণা ধর্মীয় পরিচিতির চেয়ে বেশি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করে।

তামিলনাড়ুতে দ্রাবিড় আন্দোলন এবং এর থেকে উদ্ভূত দলগুলো, যেমন ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে, ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী এবং আঞ্চলিক আত্মমর্যাদার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এখানে হিন্দি ভাষার আধিপত্য বিস্তারের বিরুদ্ধেও তীব্র প্রতিরোধ রয়েছে। বিজেপি উত্তর ভারতে হিন্দি ভাষার আধিপত্যভিত্তিক যে মডেল অনুসরণ করে সফল হয়েছে, সেই একই মডেল দক্ষিণ ভারতে প্রয়োগ করতে গিয়ে তারা বার বার ব্যর্থ হয়েছে।

তামিলনাড়ুতে বিজেপি কখনোই উল্লেখযোগ্য শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারেনি। কেরালার একটি শক্তিশালী বামপন্থা এবং ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহ্য রয়েছে, সেখানে বিজেপি হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা নিয়ে প্রবেশ করতে পারেনি। বিভিন্ন ইস্যুতে বিজেপি মেরুকরণের চেষ্টা করলেও, তা উল্টো ফল দিয়েছে এবং বামপন্থী সরকারের বিরুদ্ধে জনরোষ তৈরি করতে পারেনি। অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানায় স্থানীয় দলগুলোর প্রভাব এতটাই বেশি যে বিজেপি সেখানে নিজেদের পায়ের তলার মাটিও শক্ত করতে পারেনি। এই রাজ্যগুলোতে জাতিভিত্তিক রাজনীতি এবং স্থানীয় উন্নয়নের ইস্যুগুলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

পশ্চিমবঙ্গ এবং দক্ষিণ ভারতে বিজেপির হোঁচট খাওয়ার পেছনে বেশ কিছু কৌশলগত ব্যর্থতা দেখা যায়। প্রথমত, এই অঞ্চলগুলোর স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ভাষাগত বৈচিত্র্যকে তারা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেনি। একমুখী হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডা প্রয়োগের চেষ্টা প্রায়শই স্থানীয় মানুষের আঞ্চলিক আবেগকে আঘাত করেছে।

আবার স্থানীয় শক্তিশালী নেতৃত্ব এবং আঞ্চলিক দলগুলোর বিরুদ্ধে তারা কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, এম. কে. স্টালিন, পিনারাই বিজয়ন এবং কে. চন্দ্রশেখর রাওয়ের মতো নেতারা নিজ নিজ রাজ্যে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছেন। মূলত এই দুই অঞ্চলের স্বতন্ত্র সামাজিক-সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য, ভাষাগত বৈচিত্র্য এবং শক্তিশালী আঞ্চলিক পরিচিতি বিজেপির একমুখী হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডাকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে।

তথ্যসূত্র:

১) BJP’s Bengal debacle: Trapped by narrative, leadership crisis and minority consolidation 

২) The matriarch who keeps winning: Why the BJP failed in Bengal 

৩) Why Modi’s Hindu nationalism is a harder sell in India’s south

This post was viewed: 36

আরো পড়ুন