Skip to main content

Ridge Bangla

চুইংগাম থেকে মৃত মানুষকে বিয়ে: পৃথিবীর অদ্ভুত কিছু আইন!

weird laws

আইন বলতে সাধারণত আমাদের মাথায় আসে হত্যা, চুরি, সম্পত্তি, কর কিংবা ট্রাফিকের মতো গুরুগম্ভীর বিষয়। কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আইনের বই খুললে এমন কিছু বিধানও চোখে পড়ে, যেগুলো আধুনিক মানুষের কাছে প্রথমে কৌতুকের মতো শোনায়। কোথাও একা গিনিপিগ রাখা যাবে না, কোথাও আবার সন্তানের নাম ‘কিং’ রাখলেও তা নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ ফিরিয়ে দিতে পারে! একটি দেশে জনসমক্ষে ব্যবহারের পর টয়লেট ফ্লাশ করা কেবল ভদ্রতাই না, আইনি বাধ্যবাধকতা!

এসব আইনের বড় অংশ অবশ্য কোনো উদ্ভট আইনপ্রণেতার খেয়াল থেকে জন্ম নেয়নি। কোনোটি উনিশ শতকের ঘনবসতিপূর্ণ শহরের সমস্যা সামলাতে তৈরি, কোনোটি পরিবেশ রক্ষায়, কোনোটি আবার প্রাণীর কল্যাণ কিংবা সামাজিক শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে। সময় বদলেছে, কিন্তু অনেক বিধান রয়ে গেছে। সেই জায়গাতেই আইন আর ইতিহাসের মেলবন্ধনটি সবচেয়ে আকর্ষণীয়।

ভিক্টোরিয়ান লন্ডনের আইন এখনো কেন এত অদ্ভুত শোনায়?

সন্দেহজনক পরিস্থিতিতে মাছ হাতে নেওয়া বিপদ ডেকে আনতে পারে! যুক্তরাজ্যের বহুল আলোচিত Salmon Act 1986-এর ৩২ ধারায় অবৈধভাবে ধরা মাছ জেনেশুনে গ্রহণ, রাখা বা সরানোর সঙ্গে যুক্ত হওয়াকে অপরাধ করা হয়েছে। বিখ্যাত কথাটি তাই “সন্দেহজনক স্যামন হাতে নেওয়া নিষেধ” হিসেবে ছড়িয়ে পড়েছে। ২০০৯ সালের সংশোধনে বিধানটির আওতা স্যামনের বাইরে আরও কয়েক ধরনের মাছে বিস্তৃত হয়। এই আইনের উদ্দেশ্য আসলে মৎস্য চোরাচালান ও অবৈধ মাছ ধরা ঠেকানো।

Image courtesy: benbassettfishing.home.blog
Image courtesy: benbassettfishing.home.blog

লন্ডনের ক্ষেত্রে আরও বিস্ময় অপেক্ষা করছে। উনিশ শতকের Metropolitan Police Act 1839 এমন এক সময়ের আইন, যখন রাস্তা একইসঙ্গে যানবাহনের পথ, ব্যবসার জায়গা ও জনজীবনের কেন্দ্র ছিল। সেই প্রেক্ষাপট থেকেই এসেছে আজকের দিনে অদ্ভুত শোনানো কয়েকটি আইন।

ফুটপাথে কাঠের লম্বা তক্তা বহন করা, মানুষকে বিরক্ত করে ঘুড়ি ওড়ানো বা রাস্তায় খেলায় মেতে ওঠা, এবং বৈধ কারণ ছাড়াই কারও দরজার ঘণ্টা বাজিয়ে বিরক্ত করা- এসব আচরণ ওই আইনের পুরনো জন-উপদ্রবসংক্রান্ত বিধানের মধ্যে পড়ে।

আরও বিচিত্র আইন হলো রাস্তায় কার্পেট, রাগ বা ম্যাট ঝাড়া। আইনের ৬০ নং ধারায় রাস্তায় এগুলো ঝাড়া নিষিদ্ধ, অথচ দরজার ছোট ম্যাট সকাল আটটার আগে ঝাড়ার জন্য আলাদা ব্যতিক্রম রাখা হয়েছিল!

আজ হাস্যকর শোনালেও ঘোড়ার গাড়ি, ধুলো, আবর্জনা ও সংকীর্ণ রাস্তার উনিশ শতকের লন্ডনে এর পেছনে পরিচ্ছন্নতার যুক্তি খুঁজে পাওয়া কঠিন কিছু না।

সিঙ্গাপুর: পরিচ্ছন্ন শহরের পেছনে আইনের দীর্ঘ হাত

সিঙ্গাপুরকে ঘিরে সবচেয়ে প্রচলিত গল্প হলো সেখানে চুইংগাম খাওয়াই নাকি নিষিদ্ধ। বাস্তবতা অবশ্য কিছুটা আলাদা। সাধারণ চুইংগাম সিঙ্গাপুরে আমদানি করা নিষিদ্ধ, যদিও অনুমোদিত চিকিৎসা ও দাঁতের যত্নে ব্যবহৃত কিছু গামের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে। বর্তমান সিঙ্গাপুর কাস্টমসও এই নিষেধাজ্ঞা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে।

পরিচ্ছন্নতার প্রশ্নে দেশটির আইন আরও নির্দিষ্ট। পাবলিক টয়লেটের ফ্লাশিং টয়লেট ব্যবহারের পর সেটি সঙ্গে সঙ্গে ফ্লাশ করার আইনি বাধ্যবাধকতা আছে। একই Environmental Public Health Regulations-এ রাস্তা, জনসমাগমস্থল বা গণপরিবহনের মেঝেতে থুতু ফেলা বা নাকের সর্দি ফেলার ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

Image courtesy: Pexels / Gratisography
Image courtesy: Pexels / Gratisography

শুধু ব্যবহারকারীই না, টয়লেটের মালিক বা ভবন পরিচালনাকারীর জন্যও বিধান আছে। জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত টয়লেটে যথেষ্ট টয়লেট পেপার, সাবান, ময়লার ঝুড়ি এবং পরিষ্কার তোয়ালে বা হ্যান্ড ড্রায়ার রাখতে হয়। পরিচ্ছন্নতার সংস্কৃতিকে কীভাবে আইনের ভাষায় নামিয়ে আনা যায়, এটি তার চমৎকার উদাহরণ।

কবুতরকে কয়েক মুঠো খাবার দেওয়ার ক্ষেত্রেও আইন ঢুকে পড়েছে সিঙ্গাপুরে। দেশটিতে বন্য প্রাণীকে খাবার দেওয়া নিষিদ্ধ; এর মধ্যে শহুরে কবুতরও পড়ে। কর্তৃপক্ষের যুক্তি, মানুষের খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়লে কবুতরের অস্বাভাবিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ময়লা ও বাস্তুতান্ত্রিক সমস্যা তৈরি হতে পারে।

পোষা প্রাণী নিয়েও আইন যখন কঠোর

অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ডে দোকানের কাচের ওপাশে কোনো মিষ্টি খরগোশ দেখে পোষার ইচ্ছা হলে আইনের দিকে একবার তাকানো দরকার। কুইন্সল্যান্ডে খরগোশ পোষা অবৈধ। ইউরোপীয় খরগোশ সেখানে গুরুতর আগ্রাসী প্রজাতি; কৃষি ও স্থানীয় পরিবেশে এর ক্ষতির দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। তবে গবেষণা বা প্রদর্শনের মতো সীমিত উদ্দেশ্যে অনুমতি পাওয়া যায়। একই পরিবেশগত দর্শনের কারণে সেখানে হ্যামস্টার এবং ফেরেটও সাধারণ পোষা প্রাণী হিসেবে রাখা যায় না।

Image Courtesy: Wikimedia Commons
Image Courtesy: Wikimedia Commons

অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের উদ্বেগ আবার উল্টো- প্রাণী যাতে একাকিত্বে না ভোগে! সেখানে গিনিপিগ একা রাখা যায় না; অন্তত দুটি গিনিপিগের সামাজিক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হয়। দেশটির ফেডারেল ফুড সেফটি অ্যান্ড ভেটেরিনারি অফিস স্পষ্ট করে বলছে, মানুষ কিংবা খরগোশও একটি গিনিপিগের নিজ প্রজাতির সঙ্গীর বিকল্প হতে পারে না।

নিজের সন্তানের নামও সব সময় নিজের ইচ্ছেমতো হতে পারবে না!

নিউজিল্যান্ডে সন্তানের নাম নিয়ে সৃজনশীলতার যথেষ্ট সুযোগ আছে, তবে সীমাও আছে। ‘কিং’, ‘প্রিন্স’, ‘প্রিন্সেস’ বা ‘জাস্টিস’-এর মতো সরকারি পদবি বা র‌্যাঙ্কের সঙ্গে মিলে যায় এমন নাম রেজিস্ট্রার-জেনারেল প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। দেশটির ২০২১ সালের আইনে আপত্তিকর, অযৌক্তিকভাবে দীর্ঘ কিংবা সরকারি উপাধির অনুরূপ নাম প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

Image courtesy: Unsplash
Image courtesy: Unsplash

সরকারি নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে- ৭০ অক্ষরের বেশি দীর্ঘ নাম কিংবা সংখ্যার ও বিশেষ চিহ্নের ব্যবহারযুক্ত নাম সাধারণত গ্রহণ করা হয় না। যেমন ‘V8’ ধরনের নাম সমস্যায় পড়তে পারে।

ডেনমার্কে বিষয়টি আরও সুনির্দিষ্ট। শিশুর প্রথম নাম সাধারণত সরকারের অনুমোদিত নামের তালিকা থেকে নিতে হয়; তালিকায় না থাকলে আলাদাভাবে অনুমোদন চাইতে হয়।

বিয়ে, কয়েন আর বিলবোর্ড- আইনের অন্যরকম সীমানা

ফ্রান্সের সিভিল কোডে রয়েছে এই তালিকার সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বিধান। বিশেষ গুরুতর পরিস্থিতিতে মৃত ব্যক্তির সঙ্গে মরণোত্তর বিয়ে অনুমোদন করতে পারেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট, যদি প্রমাণ করা যায় যে মৃত্যুর আগে মৃত ব্যক্তি বিয়েতে সম্মতি দিয়েছিলেন! তবে এ বিয়ের ফলে জীবিত সঙ্গী স্বয়ংক্রিয় উত্তরাধিকার অধিকার পান না।

Posthumous wedding between Magali Jaskiewicz married the late Jonathan George  in France
Image Courtesy: Franck Lallemand/Photoshot

কানাডায় নগদ টাকা থাকলেই যে দোকানদার অসীম সংখ্যক কয়েন নিতে বাধ্য- তা না। দেশটির কারেন্সি অ্যাক্ট নির্দিষ্ট মূল্যমানের কয়েন দিয়ে কত টাকা পর্যন্ত পরিশোধকে ‘লিগ্যাল টেন্ডার’ হিসেবে গণ্য করা হবে, তার সীমা বেঁধে দিয়েছে। যেমন- ১ ডলারের কয়েনের ক্ষেত্রে সীমা ২৫ কানাডীয় ডলার, ৫ সেন্টের কয়েনে পাঁচ ডলার। এই আইনের উদ্দেশ্য বস্তাভর্তি খুচরা কয়েন দিয়ে বড় অঙ্কের ঋণ শোধের মতো পরিস্থিতি ঠেকানো।

শেষ উদাহরণটি যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইকে ঘিরে। আমেরিকার অধিকাংশ জায়গায় মহাসড়কের পাশে বিশাল বিজ্ঞাপনচিত্র পরিচিত দৃশ্য, কিন্তু হাওয়াইয়ে বিলবোর্ড ও আউটডোর বিজ্ঞাপন সাধারণভাবে নিষিদ্ধ, আইন-নির্ধারিত কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া। হাওয়াইয়ের আইন কোন কোন ধরনের সাইন রাখা যাবে, তার আলাদা তালিকাই তৈরি করেছে। ফলে দ্বীপগুলোর প্রাকৃতিক দৃশ্য বিজ্ঞাপনের দেয়ালে ঢেকে যাওয়ার সুযোগ তুলনামূলক কম।

অদ্ভুত, নাকি অন্য সময়ের যুক্তি?

এই ২০টি বিধান পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—‘অদ্ভুত আইন’ কথাটি অনেক সময় আমাদের বর্তমান জীবনযাত্রার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৈরি হয়। ১৮৩৯ সালের লন্ডনের রাস্তায় তক্তা, কার্পেট কিংবা ঘুড়ি নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন যে বাস্তবতা থেকে এসেছিল, সেই শহর আর নেই। কিন্তু আইনটির ভাষা রয়ে গেছে। আবার কুইন্সল্যান্ডে খরগোশ নিষিদ্ধ হওয়া কিংবা সুইজারল্যান্ডে গিনিপিগকে সঙ্গী দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বর্তমান পরিবেশ ও প্রাণিকল্যাণনীতির সঙ্গেই সরাসরি যুক্ত।

তাই ইন্টারনেটে পাওয়া ‘বিশ্বের অদ্ভুত আইন’-এর তালিকা পড়ার সময় সবচেয়ে জরুরি প্রশ্নটি হলো—আইনটি সত্যিই আছে কি না, এখনো কার্যকর কি না এবং আসলে সেটি কী বলছে। কারণ বাস্তব আইন অনেক সময় মিথের চেয়েও বিচিত্র; পার্থক্য শুধু এই যে, বাস্তব অদ্ভুততার পেছনে প্রায় সব সময়ই কোনো না কোনো সময়ের বাস্তব সমস্যা, সামাজিক মূল্যবোধ বা নীতিগত যুক্তি লুকিয়ে থাকে।

ফিচার ইমেজ: Stock Photo/Canva

This post was viewed: 3

আরো পড়ুন