Skip to main content

Ridge Bangla

টাইলেনল হত্যাকাণ্ড: এক অমীমাংসিত রহস্য

১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বরের শেষদিকের কথা। শিকাগোর উপকণ্ঠে এল্ক গ্রোভ (Elk Grove) গ্রামের এক শিশু মেরি কেলারম্যানের (Mary Kellerman) পরিবারে উঠেছে কান্নার রোল। খুশখুশে কাশির জন্য মেয়েকে আগেরদিন টাইলেনল ট্যাবলেট দিয়েছিলেন বাবা-মা। একদিনের মধ্যেই মারা যায় মেরি।

সেদিনই প্রায় দুশো মাইল দূরে ইলিনয় রাজ্যের এক ডাকঘর কর্মচারি অ্যাডাম জ্যানাস (Adam Janus) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ২৭ বছরের এই যুবকের মৃত্যুর কারণ হিসেবে প্রথমে জানানো হয় হার্ট অ্যাটাকের কথা। এই ব্যক্তিও টাইলেনল গ্রহণ করেছিলেন, যদিও তখন এর সাথে তার মৃত্যুর সম্পর্ক ছিল অজানা।

অ্যাডামের শেষকৃত্যে উপস্থিত হন ভাই ও ভাবী। খানিকটা মাথাব্যথা অনুভব করায় তার রেখে যাওয়া ওষুধ থেকে দুটো ট্যাবলেট খেয়ে নেন তারা। দিনকয়েকের ব্যবধানে মারা যান উভয়েই। পরবর্তীতে শিকাগোতে আরো তিনজন নারী মারা যান টাইলেনলের কারণে। এদের মধ্যে ছিলেন সদ্য মা হওয়া এক যুবতী, আরেকজন দুই বাচ্চার মা। শেষেরজন বিমানের কেবিন ক্রু।

টাইলেনল কী? আমাদের দেশে যে নাপা পাওয়া যায়, একই ওষুধ উত্তর আমেরিকায় টাইলেনল নামে বহুল বিক্রিত। এই ওষুধ মুড়ি-মুড়কির মতো দোকানে বিক্রি হয়, চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র লাগে না। এর কারণে এমন মৃত্যুর ঘটনা একেবারেই অস্বাভাবিক।

বেশ কয়েকটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় সক্রিয় হয়ে ওঠেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। শীঘ্রই বের হয়ে আসে- প্রত্যেক মৃত ব্যক্তিই কাছাকাছি সময়ে টাইলেনল গ্রহণ করেছেন। তাদের বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় ওষুধের বোতল। পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। বোতলে সাধারণ টাইলেনল নেই, বরং পটাশিয়াম সায়ানাইডযুক্ত বিষাক্ত ট্যাবলেট দিয়ে সেগুলো প্রতিস্থাপন করা।

শিকাগোর মেয়র জেন বাইর্নের (Jane Margaret Byrne) নেতৃত্বে ৪৮ ঘন্টার মধ্যে শহরের সমস্ত দোকান থেকে তুলে নেয়া হয় টাইলেনল। সব বাক্সবন্দি হয়ে চলে যায় পরীক্ষাগারে। নাগরিকদের অনুরোধ করা হয় বাসায় থাকা সমস্ত টাইলেনল জমা দেয়ার জন্য। ওষুধের মূল প্রস্তুতকারক, জনসন অ্যান্ড জনসন কোম্পানির অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ম্যাকনেইল প্রোডাক্টস (McNeil Consumer Products) তড়িৎ কার্যকর পদক্ষেপ নেয়। বিভিন্ন মিডিয়াতে সতর্কতামূলক বার্তা প্রচার করে তারা, সারা দেশ থেকে ফিরিয়ে আনে ৩১ মিলিয়ন টাইলেনলের বোতল।

কেউ যদি ওষুধ কোম্পানিকে দুষতে চান তাহলে ভুল পথে পা বাড়াবেন। কারণ তদন্তকারীরা আলামত বিশ্লেষণ করে দেখতে পান সায়ানাইড ট্যাবলেট রাখা হয়েছে ওষুধ কারখানা থেকে দোকানে যাবার পর। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধারণা করে শিকাগোর বেশ কিছু দোকান থেকে টাইলেনলের বোতল সরিয়ে সেখানে বিষাক্ত ট্যাবলেট ভরে অপরাধী, এরপর সেটা আবার জায়গামতো রেখে আসে।

কিন্তু এ কাজ কেন করবে কেউ? মোটিভ খুঁজতে গিয়ে তদন্তকারীদের পাগল হওয়ার দশা। রজার আর্নল্ড নামে এক জাহাজশ্রমিককে সন্দেহ করেছিল পুলিশ। তাদের কাছে খবর এসেছিল- ছয় মাস আগে প্রচুর পরিমাণে সায়ানাইড কিনেছিল এই লোক। ইদানীং তার আচার-ব্যবহারেও নাকি দেখা দিয়েছে অসংলগ্নতা। রজারের বাসায় তল্লাশি করে বন্দুক, বিস্ফোরক আর বিষের ওপর লেখা বই ইত্যাদি বাজেয়াপ্ত করা হয়।

রজার অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ অস্বীকার করে। তার বিরুদ্ধে শক্ত কোনো প্রমাণও জোগাড় করতে পারেনি পুলিশ। এই ঘটনার কয়েক মাস পর শিকাগোর এক রেস্টুরেন্টে গুলি করে একজনকে হত্যা করে সে। তার ধারণা ছিল, সেই লোকই ভুয়া খবর দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছে তাকে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সে খুন করেছিল ভুল লোককে। বিচারে ত্রিশ বছরের সাজা দেয়া হয় তাকে। পনের বছর জেল খেটে ২০০৮ সালে মারা যায় রজার।

তবে হাল ছেড়ে না দিয়ে তদন্ত চালিয়ে যেতে থাকেন গোয়েন্দারা। এমন সময় জনসন অ্যান্ড জনসনের অফিসে পাঠানো হয় উড়োচিঠি। এক মিলিয়ন ডলার পণ না দিলে টাইলেনলজনিত আরো মৃত্যুর ঘটনা ঘটবে বলে হুঁশিয়ারি দেয় লেখক। সংবাদপত্রের কাছেও অনুরূপ চিঠি যায়।

পুলিশ দ্রুতই বের করে ফেলে এই লোকের নাম জেমস লুইস। মিসৌরির বাসিন্দা হলেও টাইলেনল হত্যাকাণ্ডের সময় শিকাগোতে ছিল সে। নিউ ইয়র্ক থেকে গ্রেফতার করা হয় তাকে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে লুইসের পাঁচ বছরের মেয়ে টরি অ্যানের মৃত্যুর কথা। হৃদযন্ত্রের সমস্যায় ভুগছিল সে। মৃত্যুর সময় জনসন অ্যান্ড জনসনের ওষুধ সেবন করছিল টরি অ্যান, এবং তদন্তকারীরা ধারণা করছিলেন ওষুধের কারণে মেয়ে মারা গেছে এমন বিশ্বাস শেকড় গেড়েছিল লুইসের মধ্যে। প্রতিশোধ নিতে তাই নিরীহ কয়েকজন মানুষকে মেরে ফেলে সে, যাতে সবাই ক্ষেপে ওঠে ওষুধ কোম্পানির ওপর।

তবে লুইসই যে হত্যাকাণ্ডের হোতা সেটা প্রমাণ করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত তার বিচার হয় চাঁদাবাজির জন্য। ১৩ বছর কারাভোগের পর মুক্তি পেয়েছিল লুইস। ২০২৩ সালে মারা যায় সে। টাইলেনল হত্যাকাণ্ডের জন্য সে-ই দায়ী ছিল কিনা সেটা কখনোই জানা সম্ভব হয়নি।

এই ঘটনার ফলে বড় পরিবর্তন আসে ওষুধ নিয়ন্ত্রণে। এতদিন সাধারণ বোতলে বাজারজাত করা হতো টাইলেনল। জনসন অ্যান্ড জনসন এবং এফডিএ যৌথভাবে এরপর প্রচলন করে বিশেষ ধরনের বোতল (tamper-proof packaging)। এর মুখ খুললেই বোঝা যেত, সুতরাং কেউ ওষুধ বদল করে দিলে টের পাওয়া যেত সহজেই। প্রথমে টাইলেনল দিয়ে শুরু হলেও পরে সব ওষুধই এই পদ্ধতি গ্রহণ করে। ১৯৮৯ সালে এফডিএ এটা বাধ্যতামূলক করে দেয়। এখন পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় ওষুধ বাজারজাতকরণ করা হয় এই প্রক্রিয়াতেই। হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় ১৯৮৩ সালে মার্কিন কংগ্রেস বিশেষ আইন পাস করে (the Tylenol bill)। এর আওতায় এমন যেকোনো ঘটনার জন্য শাস্তির পরিমাণ বৃদ্ধি করা হয়।

References

This post was viewed: 57

আরো পড়ুন