আরব সাগরের নীল জলরাশি পেরিয়ে কোনো এক সকালে সোকোত্রায় পৌঁছালে প্রথম ধাক্কাটা আসে দ্বীপটির গাছপালা দেখে। পাথুরে পাহাড়ের ওপর ছড়িয়ে আছে এমন সব গাছ, যাদের ছাতা-আকৃতির মাথা যেন ইচ্ছাকৃতভাবে একই উচ্চতায় কেটে দেওয়া হয়েছে! কোথাও আবার মোটা, ফুলে ওঠা কাণ্ড থেকে বেরিয়েছে কয়েকটি ছোট ডাল; দূর থেকে গাছ না বলে বিশাল কোনো অচেনা জীব মনে হওয়াই স্বাভাবিক। চারদিকে খাড়া চুনাপাথরের পাহাড়, সাদা বালুর সৈকত, নীলচে লেগুন আর শুষ্ক ভূমির মাঝখানে এই অস্বাভাবিক সব উদ্ভিদ মিলিয়ে সোকোত্রার চেহারা সত্যিই পৃথিবীর পরিচিত ভূপ্রাকৃতিক দৃশ্যের সঙ্গে সহজে মেলে না।
এই কারণেই ইয়েমেনের সোকোত্রা দ্বীপপুঞ্জকে প্রায়ই বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে ‘এলিয়েন-লুকিং’ বা ভিনগ্রহসদৃশ স্থানগুলোর একটি। কিন্তু সোকোত্রার অদ্ভুত এই চেহারার পেছনে কোনো রহস্যময় শক্তি নেই। আছে কোটি বছরের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাস, দীর্ঘ ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা এবং এমন এক বিবর্তনপ্রক্রিয়া, যা পৃথিবীর খুব কম জায়গাতেই দেখা যায়।
সমুদ্রের মাঝখানে বিচ্ছিন্ন এক জীবন্ত জগৎ
সোকোত্রা আসলে একটি দ্বীপ না, বরং চারটি দ্বীপ ও দুটি পাথুরে ক্ষুদ্র দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি দ্বীপপুঞ্জ। এটি ইয়েমেনের অংশ হলেও অবস্থান আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের কাছাকাছি, উত্তর-পশ্চিম ভারত মহাসাগরে। ইউনেস্কোর হিসাবে দ্বীপপুঞ্জটি প্রায় ২৫০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিস্তৃত। সোকোত্রার প্রধান দ্বীপটির আয়তন প্রায় ৩,৮০০ বর্গ কিলোমিটার।

ভূতাত্ত্বিক গবেষণা বলছে, অলিগোসিন যুগে আরবীয় ও আফ্রিকান ভূখণ্ডের মধ্যে গালফ অব এডেন তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে সোকোত্রার দীর্ঘমেয়াদি বিচ্ছিন্নতা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। জীববৈচিত্র্যবিষয়ক গবেষণাতেও দেখা গেছে, এখানকার কয়েকটি প্রাণীগোষ্ঠীর বিবর্তনীয় ইতিহাস কয়েক কোটি বছর আগের সেই বিচ্ছিন্নতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ফলে বাইরে থেকে নতুন উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রবেশ সীমিত ছিল, আবার দ্বীপের নিজস্ব প্রজাতিগুলো দীর্ঘ সময় ধরে আলাদাভাবে বিবর্তিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। গ্যালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়া বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত, সোকোত্রাতেও তার একটি অসাধারণ উদাহরণ দেখা যায়। তাই ইউনেস্কো একে ‘গ্যালাপাগোস অব দ্য ইন্ডিয়ান ওশান’ বলেও উল্লেখ করেছে।
সোকোত্রায় নথিভুক্ত ৮২৫ প্রজাতির উদ্ভিদের মধ্যে ৩০৭টি (প্রায় ৩৭ শতাংশ) পৃথিবীর আর কোথাও প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া যায় না। এখানকার সরীসৃপের প্রায় ৯০ শতাংশ এবং স্থলজ শামুকের ৯৫ শতাংশও স্থানীয় বা এন্ডেমিক। দ্বীপপুঞ্জের সমুদ্রেও রয়েছে ২৫৩ প্রজাতির রিফ-গঠনকারী প্রবাল এবং ৭৩০ প্রজাতির উপকূলীয় মাছ। এই অসাধারণ জীববৈচিত্র্যের স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৮ সালে সোকোত্রাকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা দেওয়া হয়।
যে গাছের ছায়াতেই তৈরি হয়েছে সোকোত্রার পরিচয়
সোকোত্রাকে পৃথিবীর অন্য সব দ্বীপ থেকে আলাদা করে চিনতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা সম্ভবত ড্রাগনস ব্লাড ট্রি বা ড্রাসিনা সিনাবারির। উঁচু কাণ্ডের মাথায় ঘন শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে তৈরি হয় প্রায় নিখুঁত ছাতার মতো একটি মুকুট। শত শত এমন গাছ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকলে দৃশ্যটি এত অস্বাভাবিক লাগে যে সোকোত্রার ‘ভিনগ্রহসদৃশ’ খ্যাতি অনেকটাই এই গাছগুলোর কারণে।

বাকল কাটলে গাছটি থেকে গাঢ় লাল রঙের রেজিন বের হয়। ইতিহাসে এই ‘ড্রাগনস ব্লাড’ রেজিন রং, বার্নিশ এবং ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়েছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, বর্তমান ড্রাগনস ব্লাড ট্রি বনগুলো আরও প্রাচীন এক ধরনের সাবট্রপিক্যাল বনজগতের অবশিষ্ট নিদর্শন।
সোকোত্রান ডেজার্ট রোজ তার অস্বাভাবিকভাবে ফুলে ওঠা কাণ্ডে পানি ধরে রাখে। কিউকাম্বার ট্রি দেখতে অনেকটা বিশাল মোটা কাণ্ডের বনসাইয়ের মতো। আছে ফ্র্যাঙ্কিনসেন্স গাছ, বুনো ডালিমসহ বহু স্থানীয় প্রজাতি। শুষ্ক পরিবেশে টিকে থাকার জন্য দীর্ঘ বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসব গাছের যে আকৃতি তৈরি হয়েছে, সেটিই মানুষের চোখে তাদের প্রায় কল্পবিজ্ঞানের জীবের মতো করে তুলেছে।
কিন্তু ‘এলিয়েন দ্বীপ’ বললে সোকোত্রার গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ চাপা পড়ে যায়। এটি মানুষেরও বহু পুরনো আবাসভূমি। এখানকার স্থানীয়দের নিজস্ব সোকোতরি ভাষা রয়েছে, যা আধুনিক দক্ষিণ আরবীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। বহুদিন প্রধানত মৌখিকভাবে টিকে থাকা এই ভাষাকে সংরক্ষণের জন্য ২০২৪ সালে ইউনেস্কোর সহায়তায় একটি অভিন্ন লিখনপদ্ধতি তৈরির উদ্যোগও নেওয়া হয়।
প্রকৃতির সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সম্পর্কও দীর্ঘদিন ঘনিষ্ঠ ছিল। পশুপালন, মাছ ধরা, উদ্ভিদের ব্যবহার এবং মৌসুমি সম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দ্বীপের পরিবেশের সঙ্গে এক ধরনের সহাবস্থান গড়ে উঠেছিল। ইউনেস্কোর ভাষায়, সোকোত্রার প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পুরোপুরি আলাদা করে দেখা কঠিন।
যে ‘ভিনগ্রহ’ এখন পৃথিবীর সমস্যায় আক্রান্ত
সোকোত্রার সবচেয়ে অস্বাভাবিক দিক হয়তো এটাই যে কয়েক কোটি বছরের বিচ্ছিন্নতা যে প্রকৃতিকে রক্ষা করেছে, আধুনিক পৃথিবীর চাপ থেকে সেই বিচ্ছিন্নতা এখন আর যথেষ্ট নয়।
ড্রাগনস ব্লাড ট্রি বর্তমানে আইইউসিএন মূল্যায়নে ভালনারেবল বা ঝুঁকিপূর্ণ প্রজাতি। অনেক এলাকায় পুরনো গাছ রয়ে গেলেও নতুন চারা পর্যাপ্ত সংখ্যায় বড় হতে পারছে না। অতিরিক্ত ছাগল চরানোয় চারাগাছ নষ্ট হচ্ছে; জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুষ্কতা ও চরম আবহাওয়ার চাপও বাড়ছে। ২০১৫ সালের দুটি শক্তিশালী সাইক্লোন এবং ২০১৮ সালের সাইক্লোন মেকুনু দ্বীপের অবকাঠামোর পাশাপাশি বহু গাছেরও ক্ষতি করেছিল।

২০২৬ সালেও পরিস্থিতির তেমন উন্নতি ঘটেনি। ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কমিটি সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে জানিয়েছে, সোকোত্রার অসাধারণ জীববৈচিত্র্য এখনো টিকে আছে, কিন্তু স্থল ও সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে অবক্ষয়ের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। উন্নয়নচাপ, বহিরাগত আগ্রাসী প্রজাতি, দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অস্থিতিশীলভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের সম্মিলিত প্রভাবকে তারা প্রধান হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সোকোত্রার প্রতি দ্রুত বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক আগ্রহ। একসময় যেখানে পৌঁছানোই কঠিন ছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ছবিতে সেই দ্বীপ এখন অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যস্থল। পর্যটন স্থানীয় অর্থনীতির জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন হলে একই সঙ্গে চাপ বাড়াতে পারে বিশ্বের অন্যতম ভঙ্গুর দ্বীপ-বাস্তুতন্ত্রের ওপর। তাই সোকোত্রার ভবিষ্যৎ শুধু পর্যটক আসবে কি না- সেই প্রশ্নে আটকে নেই; মূল প্রশ্ন হলো, দ্বীপটির ব্যতিক্রমী প্রকৃতি অক্ষুণ্ন রেখে সেই যোগাযোগ কীভাবে পরিচালিত হবে।
ফিচার ইমেজ: Stringer (REUTERS)
রেফারেন্স
- Socotra Archipelago – UNESCO World Heritage Centre
- Examination of nomination of natural, mixed and cultural properties to the World Heritage List – Socotra Archipelago (YEMEN) – UNESCO World Heritage Centre
- Nature and People in the Socotra Archipelago – 1 January 2022 – UNESCO
- Safeguarding the Soqotri Language: The First Workshop on a Unified Alphabet – 13 October 2024 – UNESCO