Skip to main content

Ridge Bangla

সার্গন: মেসোপোটেমিয়ার প্রথম সম্রাট

মেসোপোটেমিয়াকে বলা হয় সভ্যতার সূতিকাগার। সেখানেই সম্ভবত প্রথম গড়ে উঠেছিল সংগঠিত নগররাষ্ট্র । প্রাচীন মেসোপোটেমিয়ান শাসকেরা ইতিহাসে তাই বেশ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছেন। তাদের মধ্যে আলাদা করে উল্লেখ করতে হয় সার্গনের (Sargon of Akkad) কথা। সমরবিদ্যায় তিনি ছিলেন অগ্রদূত। তাঁর হাতেই প্রতিষ্ঠিত হয় মেসোপোটেমিয়ার প্রথম সাম্রাজ্য। সার্গনের উত্তরসূরিরা ছিলেন প্রথম সেমেটিক ভাষাভাষী রাজবংশ।

পরিচয়

উনবিংশ শতক পর্যন্ত সার্গন আমাদের কাছে ছিলেন একদম অপরিচিত। সেই সময় একসময়ের আসিরিয় সাম্রাজ্যের প্রধান শহর নিনেভেহ’তে আবিষ্কৃত হয় সম্রাট আশুরবানিপালের গ্রন্থাগার সেখান থেকে উদ্ধার করা নানা লিপি থেকে জানা যায় মেসোপোটেমিয়ার সুপ্রাচীন প্রতাশালী এই সম্রাটের নাম। মজার ব্যাপার হলো- সার্গন তাঁর বাবা-মা’য়ের দেয়া নাম নয়। সেই নাম হারিয়ে গেছে কালের গর্ভে। রয়ে গেছে তাঁর রাজকীয় নাম, সার্গন বা বৈধ রাজা (Legitimate King)।

সার্গন সম্পর্কে জানার জন্য আমাদের নির্ভর করতে হয় প্রাচীন কিংবদন্তী এবং জনশ্রুতির ওপর। এর অন্যতম কারণ তাঁর সাম্রাজ্যের রাজধানী আগাদ (Agade/Akkad) আজ অবধি খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাঁর উত্তরাধিকারীদের অবক্ষয়ের সাথে সাথে ধ্বংস হয়ে যায় এই শহর। পুনরায় সেখানে জনবসতি গড়ে উঠেছিল কিনা সেটা জানা যায় না।

কতদিন শাসন করেছিলেন সার্গন? নিশ্চিতভাবে বলার উপায় নেই। নানা সূত্র একত্রিত করে ঐতিহাসিকরা মনে করেন ২৩৩৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সিংহাসনে বসেন তিনি, এবং সুমেরিয়ান রাজতালিকা ঠিক হলে শাসনকাল ছিল ৫৬ বছর।

শিশু সার্গনকে নিয়ে প্রচলিত গল্প লিপিবদ্ধ হয়েছে সুমেরিয় লিপি-সার্গন কিংবদন্তীতে (Sargon Legend)। তাঁর বাবার পরিচয় অজানা, তবে মা নাকি ফোরাতের তীরবর্তী এক শহরের পুরোহিত ছিলেন। ছেলের জন্মের পর তাকে ঝুড়িতে করে নদীতে ভাসিয়ে দেন তিনি। তাকে খুঁজে পায় আকি (Akki) নামে এক মালি। তাঁর সন্তান হিসেবেই পালিত হন ভবিষ্যৎ সম্রাট।

ক্ষমতা দখল 

সুমেরিয় নগর-রাষ্ট্র কিশের রাজা উর-জুবাবা। তাঁর পাত্রবাহক (cupbearer) হিসেবে দায়িত্ব পান যুবক সার্গন।  নাম শুনে তুচ্ছ মনে হলেও প্রাচীনকালে পাত্রবাহকদের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। গবেষক সুসান বাউয়ারের (Susan Wise Bauer) লেখা থেকে জানা যায় প্রাচীন আসিরিয়াতে পাত্রবাহক রাজার ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করতেন। রাজকীয় কোনো তথ্যই তাঁর অগোচরে থাকত না। যদিও সুমেরিয় পাত্রবাহকদের কর্মপরিধি নিয়ে বিশদ তথ্য আমাদের হাতে নেই, তবে সুসান বাউয়ারের মতে সেটা আসিরিয়দের থেকে কোনো অংশে কম হবে না।

বিচক্ষণ সার্গন খুব দ্রুতই রাজার আস্থাভাজন হয়ে ওঠেন, ফলে অন্যান্য উপদেষ্টাদের চক্ষুশূলে পরিণত হন তিনি। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে একপর্যায়ে কিশ থেকে সরে যেতে বাধ্য হন সার্গন। রাজার কাছে মনে হয়েছিল তাঁর পাত্রবাহক সিংহাসন দখলের ছক কষছেন, ফলে সার্গনকে একেবারে মেরে ফেলতে মনস্থ করেন তিনি। মুশকিল হলো- ততদিনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন তিনি, তাঁকে খুন করলে উর-জুবাবার গদিতে টান পড়তে পারে!

কিশের রাজা নতুন ফন্দি আঁটলেন। প্রতিবেশী রাজ্য উম্মার শাসক লুগালজাগেসি (Lugalzagesi) তখন রাজ্যবিস্তারে ব্যস্ত। সুমেরের অনেক নগররাষ্ট্র পদানত করেছেন তিনি। উরুক নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পর তাঁর চোখ পড়েছে কিশের ওপর। শত্রুর সাথে আলোচনার জন্য সার্গনকে প্রেরণ করলেন উর-জুবাবা, অন্যদিকে গোপনে খবর পাঠিয়ে দিলেন লুগালজাগেসির কাছে যাতে সার্গনকে দেখামাত্র হত্যা করা হয়।

লুগালজাগেসি কিন্তু সেই অনুরোধ রক্ষা করেননি, বরং সার্গনের প্রতি মিত্রতার হাত প্রসারিত করেন তিনি। দুজন মিলে কিশ দখল করে নেন, পালিয়ে প্রাণ রক্ষা করেন উর-জুবাবা। এরপর অবশ্য মনোমালিন্য তৈরি হয় লুগালজাগেসি আর সার্গনের মধ্যে। বলা হয়, এর কারণ ছিল উম্মার রানীর সাথে সার্গনের ঘনিষ্ঠতা।

সংঘাত অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। যুদ্ধে পরাজিত ও ধৃত হন লুগালজাগেসি। কুকুরের মতো গলায় দড়ি বেঁধে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় নিপ্পুর শহরে এনলিলের মন্দিরে, কারণ লুগালজাগেসি ছিলেন দেবতা এনলিলের সাধক।

রাজ্যবিস্তার

সার্গন প্রকাশ্যে নিজেকে দেবী ইশতারের (Ishtar/Inanna) প্রতি নৈবেদ্য দান করেন। এরপর নিজেকে ঘোষণা করেন কিশের রাজা হিসেবে। লুগালজাগেসি ততদিনে দক্ষিণ মেসোপোটেমিয়ার পুরোটাই একীভূত করে ফেলেছিলেন, সেটাও সার্গনের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

নতুন সম্রাট ফোরাতের কোনো এক জায়গায় তৈরি করেন জমকালো এক নগরী, আগাদ বা আক্কাদ, যার নামানুসারে তাঁর রাজবংশ আক্কাদিয়ান নামে পরিচিত। প্রাচীনকালে এমন জৌলুষপূর্ণ শহর নাকি আর একটিও ছিল না। এখানে রাজধানী বানিয়ে সৈন্যবাহিনী নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন সার্গন। লক্ষ্য পুরো মেসোপোটেমিয়ার ওপর প্রভুত্ব স্থাপন। তাঁর সেনাদল সুশৃঙ্খল, তাদের কাছে ব্রোঞ্জের তৈরি মারণাস্ত্র আর অগণিত রথ। উর, লাগাশ, উম্মা, উরুক সব একে একে তাঁর করতলগত হয়।

ফোরাত আর দিলজার তীরবর্তী সমস্ত এলাকা সার্গন ছিনিয়ে নেন। সিরিয়ার মারি এবং এবলা শহর অবধি বিস্তৃত হয় তাঁর নিয়ন্ত্রণ। পশ্চিম ইরানের জাগ্রোস পর্বতশ্রেণীর ধারে এলাম রাজ্যের রাজধানী সুসাও রেহাই পায়নি সার্গনের হাত থাকে। রাজকীয় নথিপত্রে লেখা ছিল পারস্য উপসাগর থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত যত এলাকা সবই আক্কাদের সম্রাটের অধীনে।

কেবল দখল করেই ক্ষান্ত দেননি সার্গন, বরং শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন নিজ শাসন। বিশ্বস্ত লোকেরা পরিচালনা করতো প্রশাসন। স্থানীয় শাসকেরা কেবল পূর্ণ আনুগত্যের শপথের বিনিময়ে পদ ধরে রাখার অনুমতি পেতেন। সাম্রাজ্য জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বহু দুর্গে সবসময় মজুত থাকত সেনাদল। যেকোনো বিদ্রোহ নিষ্ঠুরভাবে দমন করতো তারা। সেনাদের দ্রুত চলাচলের জন্যবহু রাস্তাঘাট নির্মাণ করা হয়েছিল পুরো সাম্রাজ্যে।

অবদান

ইতিহাসের প্রথম সাম্রাজ্যের নির্মাতা ছিলেন সার্গন। বহু জাত ও ভাষার সহাবস্থানের জন্য সুসংগঠিত আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করেছিলেন তিনি। বেশ কিছু প্রদেশে ভাগ করা ছিল সাম্রাজ্য, প্রতিটি প্রদেশ পরিচালনা করতেন গভর্নররা (governor/ensi/šakkanakku)। প্রদেশগুলো থেকে কর উঠিয়ে তারা পাঠাতেন রাজধানীতে।

সার্গন তৈরি করেছিলেন পেশাদার সেনাদল। রাষ্ট্রীয় বেতনে বিভিন্ন দুর্গে ছড়িয়ে থাকত তারা, পালন করতো সম্রাটের প্রতিটি নির্দেশ।

দাপ্তরিক ভাষাতেও পরিবর্তন আনেন সার্গন। তাঁর আগে সুমেরিয় লিপি ব্যবহৃত হতো নথিপত্রে, সেখানে সার্গন নিয়ে আসেন তাঁর মাতৃভাষা, আক্কাদিয়ান। তাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় আক্কাদিয়ান শিল্প-সংস্কৃতি চর্চার প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে।

কৃষিকাজের জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা করেন সম্রাট। সেচ পদ্ধতির উন্নতির সুফল পায় কৃষকেরা। উর্বর মাটিতে ফলতে থাকে নানা রকম শস্য। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়ে ওঠে তারা।

ব্যবসা-বাণিজ্যেও এই সময় অসাধারণ সমৃদ্ধির মুখ দেখে মেসোপোটেমিয়া। ভারত উপমহাদেশ থেকে শুরু করে ইজিয়ান সাগর এমনকি গ্রীস পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল তাদের বাণিজ্যপথ। ব্যবসার সুবিধার্থে বহু জলাভূমি ভরাট করে প্রশস্ত পথ তৈরি করেন সার্গন। আনাতোলিয়া, ভারত, পারস্য আর আরব উপসাগরের সাথে স্থাপিত হয় সংযোগ। হু হু করে মেসোপোটেমিয়ার বাজারে আসতে থাকে মূল্যবান পাথর, ধাতু, কাঠ আর বিলাসব্যসনের নানা সামগ্রী। চাঙ্গা হয় স্থানীয় অর্থনীতি, আর ফুলেফেঁপে ওঠে রাজকীয় কোষাগার।

মেসোপোটেমিয়ায় যে প্রশাসনিক পদ্ধতি সার্গন চালু করেছিলেন তাঁর উত্তরসূরি সাম্রাজ্যগুলো সেটা ধরে রেখেছিল। একক সম্রাটের অধীনে নানা জাত ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন সার্গনই প্রথম করে দেখিয়েছিলেন, পরবর্তীতে ব্যবিলন আর আসিরিয় সাম্রাজ্যে যেটা জারি ছিল। সম্রাটের একচ্ছত্র ক্ষমতার ধারণার প্রয়োগও সার্গনের মতো কার্যকরভাবে আগে কেউ করে দেখাতে পারেনি।

অবক্ষয়

সার্গনের রাজবংশ শাসন করেছিল এক শতাব্দীর কিছুটা বেশি সময়। তাঁর ছেলে রিমুশের  (Rimush) নয় বছরের শাসনকালের বেশিরভাগটাই কেটে যায় বিদ্রোহ দমনে। এরপর সার্গনেরই আরেক ছেলে মানিশতুসু (Manishtusu) ক্ষমতা নেন। পিতার সাম্রাজ্য ধরে রেখেছিলেন তারা। সার্গনের নাতি নারাম-সিন প্রসারিত করেন সীমানা, চূড়ান্ত উৎকর্ষতার যুগে প্রবেশ করে আক্কাদিয়ান সাম্রাজ্য। নারাম-সিনই সর্বপ্রথম নিজেকে পৃথিবীর রাজা (King of the Four Quarters of the World) ঘোষণা করেন, তাঁর সময় থেকেই চালু হয় সম্রাটদের দেবত্ব ধারণের নিয়ম।

অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকে কখনোই মুক্ত ছিলনা আক্কাদিয়ানরা। বিশাল সাম্রাজ্যে বিদ্রোহ, অসন্তোষ ইত্যাদি ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। এর সাথে যুক্ত হয়েছিল জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সংঘটিত খরা আর দুর্ভিক্ষ। নারাম-সিন সবকিছু সামলে চললেও তাঁর ছেলে কালি-শারি এতোটা সৌভাগ্যবান ছিলেন না। এলাম আর অ্যামোরাইট জাতির সাথে প্রায় নিত্য সংঘাতে জড়িয়ে ছিলেন তিনি। ফলশ্রুতিতে নিজ সাম্রাজ্যের ভেতরেই আলগা হয়ে যায় লাগাম, অনেক নগরী স্বাধীন রাজ্য হিসেবে আলাদা হয়ে যায়।

২২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সার্গনের একীভূত সাম্রাজ্য ভেঙে যায়। মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসেবে দেখা দেয় দূরপ্রাচ্য থেকে আগত গুতিয়ান (Gutian) জাতি। তাদের আক্রমণে ছত্রখান হয়ে যায় আক্কাদিয়ান প্রতিরক্ষা। প্রায় এক শতক আগে ঘাম আর রক্তে যে সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সার্গন তা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়।

References
  • Sargon, ruler of Mesopotamia, Encyclopedia Britannica.
  • Bottéro, Jean. Mesopotamia: Writing, Reasoning, and the Gods. University of Chicago Press, 1992.
  • Jacobsen, Thorkild. The Waters of Ur. Yale University Press, 1976.
  • Michalowski, Piotr. “Sargon of Akkad.” In: Leick, Gwendolyn (ed.), The Babylonian World, Routledge, 2007.
  • Van De Mieroop, Marc. A History of the Ancient Near East ca. 3000–323 BC. Wiley-Blackwell, 2016.
  • Roaf, Michael. Cultural Atlas of Mesopotamia and the Ancient Near East. Facts on File, 1990.
This post was viewed: 41

আরো পড়ুন