Ridge Bangla

রূপপুরে ভয়াবহ নিয়োগ কেলেঙ্কারি: ঘুষ-দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির মহোৎসবে নীরব কর্তৃপক্ষ

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় মেগা প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভয়াবহ নিয়োগ অনিয়ম ও দুর্নীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। ঘুষ, জালিয়াতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে প্রকল্পটি এখন তীব্র বিতর্কের মুখে। অথচ এসব অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে নীরব ভূমিকা পালন করছে কর্তৃপক্ষ।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে গঠিত নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (এনপিসিবিএল)-এ ভয়াবহ নিয়োগ বাণিজ্য, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও স্বজনপ্রীতির চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। প্রকল্পের স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ পদে অযোগ্য ব্যক্তিদের ঘুষ ও তদবিরের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ ব্যবহার করা হয়েছে। সবকিছু জেনেও কর্তৃপক্ষের নীরবতা পরিস্থিতিকে আরও রহস্যময় ও উদ্বেগজনক করে তুলেছে।

২০১৯ সালের জানুয়ারিতে প্রথমবারের মতো ব্যবস্থাপক (গ্রেড-৫), উপ-ব্যবস্থাপক (গ্রেড-৬) এবং ঊর্ধ্বতন সহকারী ব্যবস্থাপক (গ্রেড-৭) পদে জনবল নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে এনপিসিবিএল। বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে প্রার্থীদের বিদ্যুৎকেন্দ্র বা পারমাণবিক স্থাপনায় দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কিন্তু পরে দেখা যায়, অধিকাংশ নিয়োগপ্রাপ্তের অভিজ্ঞতা শর্তানুযায়ী ছিল না। অভিজ্ঞতার ঘাটতি মেটাতে ভুয়া সনদ দাখিল করেও অনেকে গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। তাদের অনেককেই পরে স্থায়ীকরণও করা হয়েছে।

যেমন- মেকানিক্যাল বিভাগের ব্যবস্থাপক আল মামুন স্নাতক সম্পন্ন করেন ২০১০ সালের এপ্রিলে। কিন্তু ২০১৯ সালের নিয়োগে ৯ বছরের অভিজ্ঞতা থাকার শর্ত পূরণে তার প্রায় তিন মাস ঘাটতি ছিল। পরে ভুয়া সনদ দিয়ে অভিজ্ঞতা পূরণ দেখানো হয়। বিষয়টি ধরা পড়লেও মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তাকে বহাল রাখা হয়। একইভাবে তার ব্যাচমেট নাজমুল হাসানও অভিজ্ঞতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও পদ পান।

আরও বিস্ময়কর অনিয়ম দেখা গেছে কেমিক্যাল অ্যান্ড রেডিওঅ্যাকটিভ ওয়েস্ট বিভাগের মুশফিকা আহমেদের নিয়োগে। তার কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা ছিল না এবং বিজ্ঞপ্তির শর্ত পূরণও করেননি। অভিযোগ আছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব ও নিয়োগ কমিটির সদস্য মইনুল ইসলাম তিতাসের শ্যালিকা হওয়ায় তাকে এই সুযোগ দেওয়া হয়। এমনকি সম্প্রতি তাকে প্রকল্পের সর্বোচ্চ কারিগরি দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে।

গৌতম চন্দ্র রায় নামের আরেক কর্মকর্তা শর্ত পূরণ ছাড়াই পদোন্নতি পান। অভিযোগ রয়েছে, ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও রুশ প্রকৌশলীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব সৃষ্টিতেও তিনি জড়িত। এছাড়া ভবিষ্যৎ সুরক্ষা ব্যবস্থাপনায় নিয়োগ পাওয়া মো. আবু কায়সারকেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে অভিজ্ঞতা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়, যা নজিরবিহীন।

সবচেয়ে গুরুতর জালিয়াতির উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে ঊর্ধ্বতন সহকারী ব্যবস্থাপক (গ্রেড-৭) রবিউল আলমের নাম। তিনি খুলনা পাওয়ার কোম্পানিতে ভুয়া চাকরির সনদ দাখিল করে নিয়োগ পান। অথচ সেই সময় তিনি ঠাকুরগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

২০১৯ সালের নিয়োগে আরও অনেক অযোগ্য ব্যক্তিও সুযোগ পান। যেমন- মেরাজ আল মামুন, ইরতিয়াজ মাহমুদ, ওয়াযিহুর রহমান প্রমুখের অভিজ্ঞতাও যথাযথ ছিল না। কেউ কেউ বিদেশে পড়াশোনার সময়কেও চাকরির অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখিয়েছেন। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, ঘুষ ও তদবিরের কারণে ২০১৯ সালের বিজ্ঞপ্তিতে অন্য বছরের মতো ন্যূনতম সিজিপিএ ৩.০০ শর্তও বাদ দেওয়া হয়েছিল। নিয়োগ-পর্যালোচনা কমিটি তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, যোগ্য প্রার্থী থাকতে অযোগ্যদের নিয়োগ দেওয়া হলে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভবিষ্যৎ পরিচালনা চরম হুমকির মুখে পড়বে।

সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, যেসব কর্মকর্তা অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন, তারা এখনও বহাল তবিয়তে গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ এই ভয়াবহ অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খোলা প্রকৌশলী মো. হাসমত আলীসহ ১৮ জন কর্মকর্তাকে কোনো কারণ না দেখিয়েই চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

সম্প্রতি রূপপুর প্রকল্পে প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খোলা চিফ সুপারিন্টেনডেন্ট প্রকৌশলী মো. হাসমত আলীসহ মোট ১৮ জন কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। অথচ যেসব কর্মকর্তা জালিয়াতি, ঘুষ ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছেন, তারা এখনও বহাল আছেন। এতে প্রকল্পের সুষ্ঠু পরিচালনা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশের প্রথম পারমাণবিক স্থাপনা। এখানে অনভিজ্ঞ ও অযোগ্য জনবল নিযুক্ত থাকলে দেশের নিরাপত্তা, জনগণের জান-মালের নিরাপত্তা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের সুষ্ঠু কার্যক্রম ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়তে পারে। এমনকি একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের অপারেশন ও রক্ষণাবেক্ষণে সামান্য গাফিলতিও মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, এরকম স্পর্শকাতর ও জটিল প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানে অযোগ্য ও অনভিজ্ঞ জনবল থাকা মানেই বিপদকে নিজ হাতে ডেকে আনা। কিন্তু নিয়োগের নামে ঘুষ, তদবির ও স্বজনপ্রীতির মহোৎসবে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয় হলো, এতসব গুরুতর অভিযোগ ও অনিয়ম সত্ত্বেও প্রকল্প কর্তৃপক্ষ নীরব। কোনো স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হয়নি। বরং যেসব প্রকৌশলী সাহস করে অনিয়মের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন, তাদেরকেই চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

অনিয়মের শিকার হয়ে বহিষ্কৃত একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা প্রকল্পের ভবিষ্যৎ ও দেশের নিরাপত্তার কথা ভেবে অনিয়মের প্রতিবাদ করেছি। অথচ আমাদেরই চাকরি কেড়ে নেওয়া হলো। আর যারা অনিয়ম করেছে তারা বহাল তবিয়তে আছে।” তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই রূপপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অযোগ্যদের বদলে অভিজ্ঞ, যোগ্য ও দক্ষ জনবল রাখা হোক। দেশের মানুষের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে অবিলম্বে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত হওয়া উচিত।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করার জন্য শুধু সাধারণ বিদ্যুৎ প্রকল্পের অভিজ্ঞতা নয়, পারমাণবিক নিরাপত্তা, বিকিরণ ঝুঁকি মোকাবিলা ও জটিল কারিগরি দক্ষতা প্রয়োজন। কিন্তু যাদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকেরই এসব বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা নেই। এতে ভবিষ্যতে ভয়াবহ বিপর্যয়ের ঝুঁকি রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, রুশ ও ভারতীয় বিভিন্ন পক্ষের লবিং এবং মন্ত্রণালয় ও প্রকল্পের প্রভাবশালীদের ঘনিষ্ঠ স্বজনদের এই নিয়োগে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

রূপপুর প্রকল্পের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এখানে ন্যূনতম যোগ্যতা মেনে নিয়োগ হলে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল একটি প্রকল্প হতে পারত রূপপুর। কিন্তু নিয়োগের নামে যে বাণিজ্য হয়েছে, তাতে আমরা সবাই শঙ্কিত।”

This post was viewed: 33

আরো পড়ুন