Skip to main content

Ridge Bangla

বাংলাদেশে বেকারত্বের প্রকৃত চিত্র: ডিগ্রি আছে, চাকরি নেই কেন?

বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষাও শেষ হয়েছে বছরখানেক আগে। সমাবর্তনের ছবি ফেসবুকের মেমোরিতে আসে এখন। কিন্তু চাকরির খবর এখনো আসেনি। সকাল শুরু হয় পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে আর অনলাইনে জব সার্চ করে, দুপুরে আবেদনপত্র পাঠিয়ে, সন্ধ্যায় বিসিএস, ব্যাংক কিংবা অন্যান্য সরকারি চাকরির প্রিপারেশনের বই নিয়ে। মাঝেমধ্যে সাক্ষাৎকারের ডাক আসে। কোথাও অভিজ্ঞতা চাওয়া হয়, কোথাও বেতন এত কম যে ঢাকায় বাসাভাড়া আর যাতায়াত খরচ মেলানোই কঠিন। পরিচিত কেউ জিজ্ঞেস করলে উত্তর একটাই, “চেষ্টা করতেছি!”

বাংলাদেশের বহু শিক্ষিত তরুণ-তরুণীর জীবন এখন এই ‘চেষ্টা করতেছি’ কথার মধ্যেই আটকে আছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ প্রকাশিত শ্রমশক্তির তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নতুন মানদণ্ড অনুযায়ী দেশে বেকারত্বের হার ছিল ৪.৬৩ শতাংশ। সংখ্যায় তা ২৭ লাখের কাছাকাছি। কিন্তু এই ৪.৬৩ শতাংশ কি সত্যিই বাংলাদেশের চাকরির বাজারের পুরো গল্প বলে? একেবারেই না!

বরং বাংলাদেশের বেকারত্বের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য এখানেই। সংজ্ঞানুযায়ী বেকারের সংখ্যা খুব বেশি নয়, কিন্তু কাজের অভাব, ভালো কাজের অভাব, শিক্ষার সঙ্গে কাজের অমিল এবং দীর্ঘদিন চাকরির অপেক্ষায় থাকা তরুণের সংখ্যা অনেক বড়।

২৭ লাখ বেকার, কিন্তু সংকট শুধু ২৭ লাখ মানুষের না…

বেকারত্বের পরিসংখ্যান বুঝতে হলে আগে জানতে হবে, কাকে ‘বেকার’ বলা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের প্রচলিত সংজ্ঞায় একজন মানুষ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কোনো কাজ না করলে, কাজ করার জন্য প্রস্তুত থাকলে এবং সক্রিয়ভাবে কাজ খুঁজলে তাঁকে বেকার হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু কোনো ব্যক্তি খুব অল্প সময়ও আয়মূলক কাজ করলে তিনি আর সরাসরি ‘বেকার’ শ্রেণিতে থাকেন না।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখানেই দেখা দিয়েছে জটিলতা। প্রথম আলো ২০২২ সালের শ্রমশক্তি জরিপ বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিল, সরকারি হিসাবে তখন বেকার ছিল প্রায় ২৭ লাখ। কিন্তু এর বাইরে প্রায় ৯৬ লাখ ৪০ হাজার তরুণ ছিলেন যারা পড়াশোনা, চাকরি বা প্রশিক্ষণ, কোনো কিছুর মধ্যেই ছিলেন না! অর্থনীতিতে এই গোষ্ঠীকে সাধারণত শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা তরুণ হিসেবে দেখা হয়।

তাঁদের সবাইকে পরিসংখ্যানগত অর্থে বেকার বলা যায় না। কেউ হয়তো কাজ খোঁজাই ছেড়ে দিয়েছেন। কেউ পরিবারে অবৈতনিক কাজ করছেন। কেউ অনিয়মিতভাবে সামান্য আয় করছেন। কিন্তু একটি দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর এত বড় অংশ যখন শিক্ষা, প্রশিক্ষণ কিংবা নিয়মিত কর্মসংস্থানের বাইরে থাকে, তখন শুধু সরকারি বেকারত্বের হার দেখলে শ্রমবাজারের চাপ বোঝা যায় না।

শিক্ষিত হলেই চাকরি পাওয়া যাবে- এই ধারণার দিন ফুরিয়েছে

একসময় মধ্যবিত্ত পরিবারের খুব পরিচিত একটি বিশ্বাস ছিল, ভালো করে পড়াশোনা করলে চাকরি পাওয়া যাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি মানেই তুলনামূলক নিরাপদ ভবিষ্যৎ। সেই সমীকরণ এখন আর ঠিকমতো কাজ করছে না।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ২০২৬ সালের বাংলাদেশ বিষয়ক প্রতিবেদনে ২০২৪ সালের শ্রমশক্তির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সামগ্রিক বেকারত্বের হার যেখানে ৩.৬৯ শতাংশের মতো, সেখানে যুবকদের বেকারত্ব ছিল ৮.৪৯ শতাংশ। শহরের তরুণদের ক্ষেত্রে এই হার উঠে যায় ১৩.২৭ শতাংশে। আরও উদ্বেগজনক হলো, উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব প্রায় ২৫ শতাংশ। অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করা প্রতি চারজন তরুণের প্রায় একজন বেকার ছিলেন!

শিক্ষার স্তর বাড়ার পরও কেন চাকরির সম্ভাবনা কমছে, তার উত্তর বাংলাদেশের অর্থনীতির ভেতরেই আছে। এ দেশে কাজের অভাব যেমন আছে, তেমনি তার চেয়েও বড় ঘাটতি আছে শিক্ষিত মানুষের উপযোগী কাজের। একজন বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক সাধারণত কৃষিশ্রমিক, দিনমজুর কিংবা অনিশ্চিত পার্টটাইম কাজে যেতে চান না। তিনি এমন কাজ চান যেখানে তার ডিগ্রি, দক্ষতা এবং কয়েক বছরের শিক্ষার মূল্য আছে। নিয়মিত বেতন আছে। ভবিষ্যৎ আছে। পেশাগত উন্নতির সুযোগ আছে। কিন্তু অর্থনীতি সেই ধরনের চাকরি যথেষ্ট তৈরি করতে পারছে না।

শ্রমবাজারে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ, নতুন চাকরি ৮৭ লাখ

এই সংকটের সবচেয়ে বড় ব্যাখ্যাটি দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।

২০২৬ সালের মার্চে বাংলাদেশ সফর শেষে বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জোহানেস জাট জানান, গত এক দশকের প্রাসঙ্গিক সময়ে বাংলাদেশের শ্রমবাজারে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ প্রবেশ করেছেন, কিন্তু নতুন চাকরি তৈরি হয়েছে মাত্র ৮৭ লাখ। সংখ্যার ব্যবধান প্রায় ৫৩ লাখ।

সংখ্যাটি বাংলাদেশের চাকরির বাজারের সবচেয়ে বড় দুর্বলতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়: কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা যে গতিতে বাড়ছে, চাকরি সেই গতিতে বাড়ছে না।

বিশ্বব্যাংকের আরও বিশ্লেষণ বলছে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে যারা কাজ পেয়েছেন, তাদের প্রায় ৭০ শতাংশই কম উৎপাদনশীল কৃষিতে যুক্ত হয়েছেন। একই সময়ে উৎপাদনশীল শিল্প বেড়েছে, কিন্তু শিল্পখাতে কর্মসংস্থান বরং প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে।

এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত। অর্থনীতি বড় হলেই যে প্রচুর ভালো চাকরি তৈরি হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

প্রবৃদ্ধি হয়েছে, কিন্তু চাকরি কোথায়?

গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি দ্রুত বড় হয়েছে। তৈরি পোশাক রপ্তানি বেড়েছে, অবকাঠামো হয়েছে, শহর বড় হয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে। কিন্তু অর্থনীতির এই অগ্রগতির একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থানে রূপ নেয়নি।

নতুন যন্ত্র ব্যবহার করে, কিন্তু শ্রমিকসংখ্যা দ্বিগুণ না করেও একটি কারখানার উৎপাদন দ্বিগুণ হতে পারে। কোনো ব্যাংক কিংবা সেবা প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল ব্যবস্থায় আগের চেয়ে বেশি গ্রাহক সামলাতে পারে কম কর্মী নিয়ে। প্রযুক্তি উৎপাদনশীলতা বাড়ায়, কিন্তু নতুন চাকরি তৈরির গতি সবসময় একইভাবে বাড়ায় না।

বাংলাদেশে সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে কারণ উচ্চ উৎপাদনশীলতার শিল্প এবং আধুনিক সেবা খাতের বিস্তার প্রয়োজনের তুলনায় ধীর। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর যে বিপুল সংখ্যক তরুণ বের হচ্ছেন, তাঁদের জন্য একই গতিতে পেশাদার চাকরি তৈরি হচ্ছে না।

বিশ্ববিদ্যালয় যে ‘গ্র্যাজুয়েট’ তৈরি করছে, চাকরির বাজার কি তাকেই চাইছে?

বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারত্ব নিয়ে কথা উঠলেই একটি শব্দ প্রায় অবধারিতভাবে আসে, ‘দক্ষতার ঘাটতি’। এই কথার মধ্যে সত্য আছে, কিন্তু পুরো সত্য নেই। অনেক নিয়োগদাতার অভিযোগ, স্নাতকদের বড় একটি অংশ ডিগ্রি নিয়ে বের হলেও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ দক্ষতা, ইংরেজি, তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার, বিশ্লেষণ, সমস্যা সমাধান কিংবা দলগতভাবে কাজ করার সক্ষমতায় দুর্বল।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএসের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের নিয়ে করা এক গবেষণায়ও এমন চিত্র পাওয়া যায়। সেই গবেষণায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোর স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্বের হার পাওয়া যায় ২৮.২৪ শতাংশ। নিয়োগদাতারা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন তথ্যপ্রযুক্তি, ইংরেজি, যোগাযোগ, সমস্যা সমাধান এবং দলগতভাবে কাজ করার দক্ষতায়।

কিন্তু ‘শিক্ষার্থীরা দক্ষ নয়’ বলে দায় শেষ করা যায় না। একজন তরুণ যখন চার বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েও চাকরিতে ব্যবহারের মতো দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পান না, তখন প্রশ্ন উঠবে শিক্ষাব্যবস্থা নিয়েও। পাঠ্যক্রম কতটা হালনাগাদ করা হয়েছে? শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ কতটা? ইন্টার্নশিপের সুযোগ আছে কি? একজন শিক্ষার্থী স্নাতক হওয়ার আগে কোনো রিয়েল লাইফ প্রজেক্টে কাজ করছেন কি?

চাকরির অভিজ্ঞতা চাই, কিন্তু অভিজ্ঞতা হবে কোথা থেকে?

চাকরিপ্রার্থীদের আরেকটি অতি পরিচিত হতাশার বিষয় হলো, প্রবেশ পর্যায়ের চাকরিতেও অভিজ্ঞতা চাওয়া। বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করা একজন তরুণ একটি প্রতিষ্ঠানে আবেদন করলেন। বিজ্ঞপ্তিতে লেখা, ১-২ বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। কিন্তু সদ্য স্নাতক একজন তরুণ সেই অভিজ্ঞতা পাবেন কোথায়?

এ একটি অদ্ভুত চক্র। অভিজ্ঞতা ছাড়া চাকরি মিলছে না, আবার চাকরি ছাড়া অভিজ্ঞতাও হচ্ছে না!

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যদি কার্যকর ইন্টার্নশিপ, শিল্পপ্রতিষ্ঠানে কাজ শেখার সুযোগ, প্রকল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ থাকত, তাহলে এই ব্যবধান কিছুটা কমত। বাস্তবে অনেক শিক্ষার্থী ক্লাস ও পরীক্ষার গণ্ডি পার করেই সরাসরি নিয়োগ পরীক্ষার বাজারে ঢুকে পড়েন।

সরকারি চাকরির লাইনে কেন এত ভিড়?

বাংলাদেশের শিক্ষিত চাকরিপ্রার্থীদের একটি বড় অংশের স্বপ্ন সরকারি চাকরি। এর কারণ বোঝাও কঠিন না। চাকরির নিরাপত্তা, নিয়মিত বেতন, সামাজিক মর্যাদা, অবসরকালীন সুবিধা এবং তুলনামূলক স্থিতিশীল কর্মজীবন- সব মিলিয়ে সরকারি চাকরি অনেক পরিবারের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয় পেশা। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করার পর কেউ কেউ তিন, চার, এমনকি পাঁচ বছর পর্যন্ত বিসিএস, ব্যাংক কিংবা অন্যান্য সরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে ব্যয় করেন।

সমস্যা হলো, সরকারি চাকরির পদসংখ্যা সীমিত। ফলে কয়েকশ পদের বিপরীতে লাখো আবেদন জমা পড়ে। তরুণ-তরুণীদের জীবনের সবচেয়ে কর্মক্ষম কয়েকটি বছর কেটে যায় পরীক্ষার প্রস্তুতি, প্রিলিমিনারি, লিখিত পরীক্ষা, ভাইভা এবং আবার নতুন বিজ্ঞপ্তির অপেক্ষায়।

বেসরকারি চাকরি আছে, কিন্তু সবাই সেখানে যেতে চায় না কেন?

আরেকটি বাস্তবতাও অস্বীকার করার উপায় নেই। কিছু চাকরি বাজারে থাকে, কিন্তু শিক্ষিত চাকরিপ্রার্থীরা সেগুলোতে যুক্ত হতে চান না। এর পেছনে সবসময় অহংকার বা ‘চাকরি বাছাই’ কাজ করে না।

ঢাকায় একজন নতুন স্নাতকের চাকরির বেতন যদি হয় ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা, তার মধ্য থেকে বাসাভাড়া, খাবার, যাতায়াত এবং দৈনন্দিন খরচ মেটানো কঠিন। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিশ্চিত চাকরি এবং ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্টের সীমিত সুযোগ থাকে।

তাই তখন একজন স্নাতক ভাবেন, এত বছর পড়াশোনার পর এমন চাকরিতে ঢুকে ভবিষ্যৎ কোথায়? অন্যদিকে নিয়োগদাতা বলেন, নতুন একজন কর্মীর পেছনে বেশি খরচ করার সামর্থ্য প্রতিষ্ঠানের নেই। এই দ্বন্দ্বও শিক্ষিত বেকারত্ব বাড়ায়।

নারীদের জন্য পথ আরও কঠিন

বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত নারীদের চাকরি পাওয়ার সমস্যা আরও তীব্র। আইএমএফের ২০২৬ সালের বিশ্লেষণে দেখা যায়, উচ্চশিক্ষিত পুরুষদের বেকারত্ব প্রায় ৬.৩৭ শতাংশ, কিন্তু উচ্চশিক্ষিত নারীদের ক্ষেত্রে তা ১৬.৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ একই শিক্ষাগত স্তরেও একজন নারীর বেকার থাকার আশঙ্কা পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি।

কারণ শুধু চাকরির ঘাটতি না। কর্মস্থল কত দূরে, রাত পর্যন্ত কাজ করতে হবে কি না, নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা আছে কি না, বিয়ের পর পরিবার চাকরিতে উৎসাহ দেবে কি না, সন্তান হওয়ার পর কাজে ফেরা সম্ভব হবে কি না- এসব প্রশ্নও নারীর কর্মজীবন নির্ধারণ করে।

সমস্যার আরেক নাম ‘ভালো চাকরির অভাব’

বাংলাদেশে কেউ যদি সামান্য দোকান চালান, পরিবারের ব্যবসায় কাজ করেন, অনিয়মিত দিনমজুরি করেন কিংবা খুব কম আয়ের কোনো কাজে যুক্ত থাকেন, তাহলে তিনি সরকারি পরিসংখ্যানে বেকার নন। কিন্তু তার কাজ কি স্থায়ী? আয় কি যথেষ্ট? সামাজিক নিরাপত্তা আছে? দক্ষতার ব্যবহার হচ্ছে?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না জানলে শুধু ‘বেকারত্বের হার’ দিয়ে শ্রমবাজার বোঝা অসম্ভব। এ কারণেই বাংলাদেশের সংকটকে শুধু ‘বেকারত্ব’ না বলে ‘মানসম্মত কর্মসংস্থানের সংকট’ বলা বেশি যথাযথ। একজন বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক যদি শেষ পর্যন্ত এমন একটি কাজে ঢোকেন যেখানে তার ডিগ্রির কোনো ব্যবহার নেই, পরিসংখ্যানের দৃষ্টিতে সেটাও কর্মসংস্থান। কিন্তু অর্থনীতির দৃষ্টিতে এটি মানবসম্পদের অপব্যবহারও হতে পারে।

সমাধান শুধু আরেকটি প্রশিক্ষণ কোর্স না

চাকরির সংকট দেখা দিলেই বাংলাদেশে খুব পরিচিত একটি পরামর্শ আসে- তরুণদের আরও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অবশ্যই দক্ষতা দরকার। কিন্তু শুধু দক্ষতা তৈরি করলেই চাকরি তৈরি হয় না। একটি দেশে যদি বছরে ১০ লাখ মানসম্মত চাকরি প্রয়োজন হয়, অথচ তৈরি হয় ৫ লাখ, তাহলে বাকি ৫ লাখ মানুষকে যত প্রশিক্ষণই দেওয়া হোক না কেন, সবার জন্য চাকরি থাকবে না। তাই সমাধানের প্রথম শর্ত হলো বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানো।

তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হালকা প্রকৌশল, ইলেকট্রনিকস, স্বাস্থ্যসেবা, গবেষণা, আধুনিক আর্থিক সেবা এবং নতুন রপ্তানিমুখী শিল্পে বড় আকারে কাজ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমকে চাকরির বাজারের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। কোন শিল্পে কী দক্ষতা দরকার, কী ধরনের পেশার চাহিদা বাড়ছে, আগামী পাঁচ বছরে কোথায় নতুন চাকরি তৈরি হবে- এসব তথ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হাতে নিয়মিত পৌঁছানো দরকার।

এই কারণেই বিবিএস ও আইএলও ২০২৫ সালে বাংলাদেশের শ্রমচাহিদা জরিপ এবং মজুরি জরিপ শুরু করেছে। এর লক্ষ্য শুধু কত মানুষ কাজ চান তা জানা না, বরং প্রতিষ্ঠানগুলো আসলে কেমন কর্মী খুঁজছে, কোন দক্ষতা দরকার এবং ভবিষ্যতে কোথায় শ্রমের চাহিদা তৈরি হবে সেটি বোঝা।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদই কি সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে?

বাংলাদেশ বহু বছর ধরে তার তরুণ জনগোষ্ঠীকে ‘জনমিতিক সুবিধা’ হিসেবে দেখে এসেছে। কারণ কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেশি হলে তারা উৎপাদন করবে, আয় করবে, কর দেবে, সঞ্চয় করবে এবং অর্থনীতিকে এগিয়ে নেবে। কিন্তু জনমিতিক সুবিধা স্বয়ংক্রিয় কিছু না। তরুণদের হাতে কাজ না থাকলে, কিংবা বছরের পর বছর তার শিক্ষা ও দক্ষতা কাজে না লাগলে, একই জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের কারণ হয়ে উঠতে পারে। বিশ্বব্যাংকও সতর্ক করছে, বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী আরও কিছু সময় বাড়তে থাকবে, কিন্তু এই সুযোগ অনন্তকাল থাকবে না।

তাই বাংলাদেশের বেকারত্বের প্রকৃত গল্প আসলে ৪.৬৩ শতাংশে শেষ হয় না। এ গল্পে আছে ২৭ লাখ সরকারি সংজ্ঞার বেকার। আছে শিক্ষা, কাজ ও প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা বিপুল সংখ্যক তরুণ-তরুণী। আছে উচ্চশিক্ষিতদের অস্বাভাবিক বেকারত্ব। আছে চাকরির বাজারে প্রবেশকারী ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণের বিপরীতে ৮৭ লাখ নতুন চাকরির হিসাব। আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকদের মধ্যে উচ্চ বেকারত্ব। আছে এমন অসংখ্য মানুষ, যারা কাজ করছেন ঠিকই, কিন্তু সেই কাজ তাঁদের শিক্ষা, দক্ষতা কিংবা ন্যূনতম জীবনের চাহিদার সঙ্গে মানানসই নয়। এই সবগুলো ছবি একসঙ্গে রাখলেই বাংলাদেশের চাকরির বাজারের বাস্তবতা পরিষ্কার হয়।

সমস্যা শুধু এটা না যে দেশে চাকরি নেই। সমস্যা হলো, যে ধরনের শিক্ষা আমরা দিচ্ছি, যে ধরনের চাকরি তরুণেরা চাইছেন এবং যে ধরনের কাজ অর্থনীতি তৈরি করছে, এই তিনটির মধ্যে বড় গ্যাপ তৈরি হয়েছে। সেই গ্যাপ যত দিন থাকবে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নতুন সনদধারীরা বের হবে, চাকরির আবেদন জমবে, পরীক্ষার হল ভরবে, আর অসংখ্য তরুণ-তরুণী পরিবার ও পরিচিতজনের “চাকরির কী খবর?” প্রশ্নের একই উত্তর দিতে থাকবে, “চেষ্টা করছি।”

ফিচার ইমেজ: The Federal

তথ্যসূত্র

লেখার ভেতর হাইপারলিঙ্ক রূপে সংযুক্ত

This post was viewed: 2

আরো পড়ুন